ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ৩০ মে ২০২৩, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০

অশান্ত বান্দরবান

-

প্রকাশিত: ২০:৩৫, ২০ মার্চ ২০২৩

অশান্ত বান্দরবান

সম্পাদকীয়

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষ করে বান্দরবানের কয়েকটি দুর্গম ও প্রত্যন্ত উপজেলা আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি সেখানে গড়ে উঠেছে নতুন জঙ্গি সংগঠন কুকি চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট নামের নতুন একটি জঙ্গিগোষ্ঠী। মূলত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বম সম্প্রদায়ের জঙ্গি সংগঠনটি পার্বত্য চট্টগ্রামের ৯টি উপজেলা নিয়ে তথাকথিত অর্থে একটি স্বাধীন অঞ্চল প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠেছে।

তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে দেশীয় হরকাতুল জেহাদ (হুজি) ও জেএমবির সমন্বয়ে গঠিত নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া। এটি মূলত জামায়াতে ইসলামীর অর্থায়ন ও সমর্থনে পরিপুষ্ট।  কেএনএফের সহযোগিতা নিয়ে জঙ্গি সংগঠনটি বান্দরবানের গহীন জঙ্গলে সশস্ত্র হামলার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। গত বছরের ৩ অক্টোবর থেকে বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত জঙ্গিবিরোধী অভিযান শুরু হয়। দেশীয় জঙ্গিসহ কেএনএফের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। 
কয়েকদিন আগে রোয়াংছড়িতে সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর কেএনএফের হঠাৎ গুলিবর্ষণে একজন মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নিহত এবং দুজন গুলিবিদ্ধ হন। ১১ মার্চ কেএনএফ বান্দরবানের রুমায় নির্মাণাধীন সড়ক থেকে ঠিকাদার অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা সার্জেন্টসহ তিনজনকে অপহরণ করে। মুক্তিপণ আদায়ই তাদের উদ্দেশ্য বলে জানা গেলেও মূল লক্ষ্য হলো সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন কাজকে বাধাগ্রস্ত করা।

কেননা, সড়ক নির্মাণসহ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সুবিস্তৃত হলে নতুন নতুন বর্ডার চেকপোস্ট স্থাপনসহ সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সুরক্ষিত হবে। তাতে জঙ্গি তৎপরতা দমনসহ জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ প্রদান সম্ভব হবে না। এই অবস্থায় তিন পার্বত্য অঞ্চলে সাঁড়াশি অভিযান অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। ১৫ মার্চ থেকে তিন উপজেলায় আবারও অনির্দিষ্টকালের জন্য আরোপ করা হয়েছে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চিরুনি অভিযানও চলমান। পাহাড়ে দেশবিরোধী জঙ্গি তৎপরতা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো সমূলে ধ্বংস করা এখন সময়ের দাবি। 
বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যটনের এখন ভরা মৌসুম। দেশে যে কয়েকটি অন্যতম আকর্ষণীয় এবং অফুরন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম তিন পার্বত্য জেলাÑ রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি। উঁচু-নিচু পাহাড়-টিলা, নিবিড় অরণ্যানী, অগণিত ঝরনা ও ছড়া সুশোভিত তিন পার্বত্য জেলায় পর্যটনের ভরা মৌসুমে এবার দেখা দিয়েছে শঙ্কা। জঙ্গি হুমকি বা হামলার কালো অপচ্ছায়া। চিরুনি অভিযানে এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক তরুণকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে, যারা মূলত পর্যটকের ছদ্মবেশে ঢুকেছিল পার্বত্য অঞ্চলটিতে।

সঙ্গত কারণেই সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা ও নিরাপত্তার নিমিত্ত সেখানে বহিরাগতসহ পর্যটকদের প্রবেশে আরোপ করা হয়েছে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা। ফলে তিন পার্বত্য জেলায় যেসব পর্যটনকেন্দ্র ও স্পট রয়েছে সেসব স্থানে ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। স্বভাবতই বিপুল লোকসানের সম্মুখীন হতে হচ্ছে পর্যটনসংশ্লিষ্টদের। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদিও বলেছে এই নিষেধাজ্ঞা সাময়িক, তবে কবে নাগাদ তা তুলে নেওয়া হবে তা স্পষ্ট নয়। কেননা, সেখানে আরও জঙ্গি আস্তানা ও জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব থাকা অস্বাভাবিক নয়। ফলে দেশীয় ট্যুরিস্ট অপারেটর, পর্যটন কেন্দ্রের মালিক ও কর্মচারীরা রয়েছেন চরম এক অনিশ্চিত অবস্থায়। জনজীবনেও বিরাজ করছে শঙ্কা।