ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০

জলবায়ু সম্মেলনোত্তর বাংলাদেশের করণীয়

সাবিহা হোসেন

প্রকাশিত: ২১:০১, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩

জলবায়ু সম্মেলনোত্তর বাংলাদেশের করণীয়

বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ও কপ-২৭ সম্মেলনকে ফলপ্রসূূ করতে একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা অত্যাবশ্যক।

উন্নত রাষ্ট্রগুলোর কার্বন নিঃসরণের হার উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও বাংলাদেশের মতো দেশে এর প্রভাব সর্বোচ্চ পরিমাণে পরিলক্ষিত হয়। ২০২১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ গড়ে ০.৫ মেট্রিক টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে থাকে। সেখানে আমেরিকার প্রতিটি মানুষ গড়ে নিঃসরণ করছে প্রায় ১৫.২ মেট্রিক টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড।

বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করা হলে এটি প্রায় ৩০ গুণের বেশি। ১৯৯৫ সাল থেকে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক কপ সম্মেলনে জলবায়ুর এ বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিবছর প্রায় ২০০ টির মতো দেশ মিলিত হয়। সেখানে পূর্ব নির্ধারিত আলোচ্যসূচি অনুযায়ী সকলের মতামত গ্রহণ করা হয় এবং তার প্রেক্ষিতে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এসব লক্ষ্যের মূল উদ্দেশ্য থাকে আসন্ন জলবায়ু পরিস্থিতি মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি এবং সতর্কতা গ্রহণ করা। 
গ্লাসগোতে কোপ-২৬ এর পর মিসরে গত ৬-২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত কপ-২৭ সম্মেলনে ১৯০টি দেশ থেকে আগত প্রায় ৩৫০০০ প্রতিনিধি এবং ৯২টি দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান উপস্থিত ছিলেন। মিসরের শারেম আল শেখে আয়োজিত কপ-২৭ এর এবারের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ‘ডেলিভারিং ফর দ্য পিপল এন্ড দ্য প্লানেট’। এ বিষয়বস্তুকে সামনে রেখে সম্মেলন ৬টি মূল উদ্দেশ্য তৈরি করে।

এর মধ্যে রয়েছে সর্বজনীন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও নিজ নিজ ক্ষমতার উপলব্ধি, ন্যায্যতা ও পক্ষপাতহীন অংশ নিশ্চিতকরণ, পারস্পরিক নির্ভরযোগ্যতা, বহুপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলবায়ু অর্থায়ন ও অন্যান্য সহযোগিতার বাস্তবসম্মত বণ্টন, অভিযোজন কৌশল শক্তিশালী করা, জলবায়ু প্রবর্তিত ক্ষয়ক্ষতি লক্ষ্য ও বিবেচনা ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্ব পরিস্থিতির মূল্যায়ন (গ্লোবাল স্টক টেকিং) বৃদ্ধি ও অন্যান্য। প্রধানত, অংশ নেওয়া দেশগুলোর লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল প্যারিসে অনুষ্ঠিত কপ-২১ এর ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে।

এর মধ্যে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো এবং নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা। তাপমাত্রা বেশি বৃদ্ধিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা; সেই সঙ্গে তা জাতীয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করে অঙ্গীকার পূরণে তহবিল নিশ্চিতকরণের বিষয়টি ছিল উল্লেখযোগ্য।
২০২১ সালে বিশ্ব জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে প্রকাশিত সমীক্ষা অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনে ২০০০ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশসহ স্বল্প উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো। জিসিআরআই-এর (২০২১) সমীক্ষায় আরও বলা হয়, ২০১৯ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বন্যা, ঝড়-তুফান, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিধ্বস ইত্যাদি) ছিল ক্ষয়ক্ষতির প্রধান কারণ। সমুদ্র সমতলের উচ্চতা ০.৫ মিটার বাড়লে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও কক্সবাজারের অনেক উপজেলায় প্রতিবছর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলারে যেয়ে দাঁড়াতে পারে।

সেই সঙ্গে আগামী ১০ বছরে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে যে, ৬.৪ শতাংশ উপকূলবর্তী লোক আগামী ১০ বছরে এই দুর্যোগের সম্মুখীন হবে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে সেই সংখ্যা বেড়ে হতে পারে ১০.২ শতাংশ। এসব পরিসংখ্যান সামনে রেখে এ বছর আয়োজিত সম্মেলনের প্রধান লক্ষ্য অনেকটাই বিতর্কের মুখে ছিল।

একদিকে উন্নত দেশগুলো যেমন চেয়েছিল জ্বালানির চাহিদা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে পরিবর্তন করতে, অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলো চলমান ও আসন্ন জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় জলবায়ু তহবিল গঠনে জোর দিচ্ছিল। যদিও কপ-২৬ এর জলবায়ু চুক্তির উদ্দেশ্য পূরণে চুক্তিবদ্ধ ২০০টি দেশের মধ্যে এক-অষ্টমাংশ দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম হয়েছিল। তবু এবার নতুন লক্ষ্যকে মাথায় রেখে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও কিছু পরিকল্পনা ও আলোচ্য বিষয় পূর্বনির্ধারণ করে রেখেছিল। এ ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশের বিশিষ্ট জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. সলিমুল হককে এ বছর বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল ন্যাচার বিশ্বের শীর্ষ ১০ জলবায়ু বিজ্ঞানীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম। এ প্রসঙ্গে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিভিন্ন ধরনের জলবায়ু কর্ম পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশের ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন প্রয়োজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বৃদ্ধি পেলেও আশার কথা হলো জলবায়ু প্রতিকূলতা মোকাবিলায় ক্ষয়ক্ষতির হার কমানো থেকে শুরু করে বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা হ্রাস পর্যন্ত বাংলাদেশের অবদান ইতিবাচক। 

প্রতিকূল জলবায়ু পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য উন্নতি অব্যাহত রাখতে হলে জলবায়ু তহবিল পাওয়া খুব জরুরি। কারণ, বাংলাদেশের নিজস্ব তহবিল থেকে এই কঠিন সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব নয়। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ও আরও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য কপ-২৭ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

নির্দিষ্ট কিছু উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনার প্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত কপ-২৭ এর প্রধান প্রস্তাবনা ছিল ২টি। প্রথমটি হলো, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল প্রতিষ্ঠা করা এবং অন্যটি হলো অর্থনৈতিক ভিত্তি সংশোধনের আহ্বান। কপ-২৬ এর করা প্রতিশ্রুতিতে কার্বন নিঃসরণের হার হ্রাসে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোর অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করা এর অন্যতম প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল। এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশের প্রতিনিধিগণ একত্রিত হয়ে এর আর্থিক বোঝা লাঘবে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

যদিও এ সম্মেলনে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা উপস্থাপন এবং বাতিল হয়েছে, কিন্তু কার্বন নিঃসরণের হার হ্রাসে কোনো রকম লক্ষণীয় কৌশল গ্রহণ করা হয়নি। নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতকরণে ঐকমত্যের পাশাপাশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতির হ্রাসে তহবিল। অনেকের মতে, এ পদক্ষেপ তখনই সফলতা পাবে যখন জলবায়ু পরিকল্পনার (ক্লাইমেট একশন) অন্য তিনটি স্তম্ভের সঙ্গে (জলবায়ুর প্রভাব লঘুকরণ, অভিযোজন ও অর্থনীতির) চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে তহবিল প্রতিষ্ঠা করা যাবে। 
কপ-২৭ এর আলোচনা ও ফলাফল অনেকটাই ফলপ্রসূ হলেও প্রয়োগগত সময়সীমা খুব স্বল্প (কপ-২৮ পর্যন্ত)। বিধায় প্রশ্ন থেকে যায়, কারা তহবিল প্রদান করবে এবং কারা সেই তহবিলের প্রকৃত দাবিদার। এই আলোচনায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের বিভাজনের চিরাচরিত সংজ্ঞায় নতুন সমস্যা দেখা দেয়। যেখানে কিছু দেশ বিশেষ করে ভারত এবং চীন একদিকে তেল ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে জলবায়ু তহবিল গ্রহণ করাতেও আগ্রহ ব্যক্ত করেছে।

এসব অসংগতির সমাধান করে জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি তহবিল প্রতিষ্ঠা, তহবিলদাতা ও তহবিলগ্রহীতা দেশগুলোর মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা পরবর্তী বছরের জন্য একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। যেহেতু বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের ভুক্তভোগী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম, সেহেতু জলবায়ু তহবিল গ্রহীতা হওয়ার প্রধান ভাগীদার। যদি উন্নত দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ জলবায়ু তহবিল নিশ্চিত করতে পারে, তবে পরবর্তী কপ সম্মেলন থেকে বাংলাদেশ আরও বেশি লাভবান হবে।

গত ১৫ বছর ধরেই জলবায়ু পরিবর্তনোত্তর অভিযোজনে দেশের বার্ষিক বাজেটের ৬-৭ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এই বাজেটে সরকারি সংস্থাগুলোর জরুরি অবস্থায় দ্রুত সাড়া দেওয়া, সম্প্রদায়ের সহনশীলতা বৃদ্ধি (কমিউনিটি রেসিলিয়েন্স) ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এই বিষয়ে বিআইএসআর-এর চেয়ারম্যান ড. খুরশিদ আলম তার এক গবেষণা প্রবন্ধে (২০১৭) সম্প্রদায়ভিত্তিক জলবায়ু অভিযোজন কৌশল (কমিনিউটি ক্লাইমেট এডাপ্টেশান) নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সর্বমোট প্রায় ৬০৮ মিলিয়ন ডলার (২০২২ পর্যন্ত) জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে গ্লোবাল ক্লাইমেট ফাইন্যান্সের সহযোগিতা ছিল ৩৭৪ মিলিয়ন ডলার। সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি এন্ড একশন প্ল্যানে ছয়টি থিম্যাটিক এলাকা থেকে বৃদ্ধি করে এগারোটি থিম্যাটিক এলাকা করা হয়েছে। জলবায়ু অভিযোজন, নিরসনের  সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনাসহ নগরজীবনে পরিবর্তনের মাত্রা যোগ করা হয়েছে। 
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ও কপ-২৭ সম্মেলনকে ফলপ্রসূূ করতে একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা অত্যাবশ্যক। এ বিষয়ে যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তা হচ্ছেÑ ১. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে দেশী ও বিদেশী গবেষকদের নিয়ে গভীর পর্যালোচনা ও চাহিদা নিরূপণ করা; ২. লিঙ্গভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতি ও অভিবাসীর সংখ্যা নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা; ৩. বিভিন্ন সম্প্রদায়ভিত্তিক জলবায়ু অভিযোজন কৌশল (কমিউনিটি ক্লাইমেট এডাপ্টেশান) নিয়ে বিশ্লেষণ ও উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া; ৪. বাংলাদেশের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ আন্তর্জাতিক পরিম-লে নিয়মিতভাবে তুলে ধরা; ৫. জলবায়ু তহবিল নিবন্ধনে আন্তর্জাতিকভাবে লবিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা; এবং ৬. জলবায়ু সংক্রান্ত নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং ব্যয়ের মনিটরিং জোরদার করা।

লেখক : গবেষক (পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগ), বাংলাদেশ ইন্সস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট, [email protected]

×