ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

রূপবৈচিত্র্যে দশভুজার আরাধনা

ড. সনজিত পাল

প্রকাশিত: ২৩:৩১, ২ অক্টোবর ২০২২

রূপবৈচিত্র্যে দশভুজার আরাধনা

,

শক্তির উপাসকদের বিশ্বস, সৃষ্টির আদ্যা মহাশক্তি দুর্গা দেহদুর্গের মূলশক্তি। মানুষের দেহও একটি দুর্গ বিশেষ। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম- এই পঞ্চভূতে দেহ নির্মিত। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য- এই ষড়রিপু আক্রমণ করে দেহের মূলশক্তি-প্রাণশক্তিকে। শুধু দেহভান্ডে নয়, সমগ্র বিশ্বব্রহ্মান্ডে প্রাণই শ্রেষ্ঠ। উপনিষদে এই প্রাণেরই জয়গান। প্রাণ ব্রহ্ম সনাতন। প্রাণ তার স্বরূপে বিকশিত হয় সাধনায়। প্রাণশক্তির উদ্বোধনে, উপলব্ধিতে সাধক হন মহাশক্তিধর। প্রাণশক্তি-সাধনশক্তি বোধগম্য করার জন্য ঋষিরা ব্রহ্মের বিভিন্ন রূপ পরিকল্পনা করে গেছেন। সনাতন ধর্মের পূজা অনুষ্ঠানসমূহে এবং বিভিন্ন প্রতিমার রূপকল্পনায় মূলশক্তি আত্মশক্তি, প্রাণশক্তিকে অনুভব করার ঋষিপরিকল্পনা, আত্মজিজ্ঞাসু মানুষের জন্য অধ্যাত্ম পথনির্দেশ। উপনিষদের মহাবাণী-‘আত্মানং বিদ্ধি’। অর্থাৎ, আত্মাকে জানো। আত্মাকে বা শ্রেষ্ঠকে জানার জন্য তথা লাভ করার জন্য যাবতীয় পূজা এবং প্রতিমার গঠন। দুর্গাপূজায়ও একই উদ্দেশ্য- মহাশক্তির আত্মসাক্ষাৎকার। যুগে যুগে কালে কালে দুর্গার রূপের পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিমার গঠন পরিবর্তন হয়েছে। দেবীর মূর্তিতে ভাবের পরিবর্তনও হয়েছে অনেক। তবু বাঙালীর কাছে দেবী দুর্গা যেন মায়ের রূপে স্নেহময়ী, অসুরের বিরুদ্ধে পরাক্রমশালী কিংবা উভয়ের মিশ্রণে দেখা এক শক্তির আধার।
প্রাচীনকালে ভারতবর্ষকে কুমারী দ্বীপ বলা হতো। কিন্তু গবেষকদের ধারণা, এই নাম থেকেই দুর্গার কুমারী নামের উৎপত্তি। আসমুদ্র ভারতে দেবী দুর্গার বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রকাশ যেমন ব্যাপক, তেমনি বিস্তৃত। শৈলসুতা, কৈলাসবাসিনী, মন্দরবাসিনী, বিন্ধ্যবাসিনী, পার্বতীদেবী, উমা, সিংহবাহিনী এমন আরও কত নামে তাঁর পরিচয়। বৈদিক যুগের শেষভাগে দুর্গাকে ভবানী, অম্বিকা, ভদ্রকালী, গৌরী প্রভৃতি নামেও চিহ্নিত করা হয়েছে বলে ঐতিহাসিকরা জানিয়েছেন। বৈদিক সাহিত্যে যেমন দুর্গা প্রসঙ্গ উল্লিখিত হয়েছে, তেমনি পুরাণ থেকেও জানা যায় দুর্গাপূজার নানা কথা।
দুর্গা, যাঁকে দুঃখে জানা যায়। কিংবা যিনি দুর্গ অর্থাৎ, সঙ্কট থেকে ত্রাণ করেন। যিনি দৈত্যনাশসূচক, বিঘ্ননাশসূচক, পাপ, রোগ, ভয় থেকে মুক্ত করেন, শত্রুনাশ করেন, আপদ-বিপদে রক্ষা করেন এবং অন্যায় অসত্যকে হনন করেন বলেই তিনি দুর্গা। তিনিই শিবপতন্ডী, পরমা প্রকৃতি, বিশ্বের আদি কারণ। তিনিই মহাশক্তি, শত্রুবিনাশিনী মহামায়া।
দেবী দুর্গার পূজা ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বহু জায়গাতেই হয়ে থাকে। তবে অঞ্চলভেদে দেবীর নামে এবং রূপে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। এই বৈচিত্র্যের বিস্তার প্রাচীনকাল থেকেই। শক্তিই সবকিছুর আধার। এই নিখিল বিশ্ব চরাচরে তাঁর উপস্থিতি সর্বত্র। সর্বশক্তিময়ী মহামায়ার সবকিছু গতিশীল, চঞ্চল। তিনিই সবকিছুর অধীশ্বরী। তাঁর অস্তিত্ব স্থলে জলে অন্তরীক্ষে, প্রতি অণু-পরমাণুতে। তাঁর উপাসনা সারা ভারতবর্ষজুড়ে। তবে এক এক জায়গায় তাঁর এক এক নাম, এক এক রূপ। যেমন- বাংলাদেশে দুর্গা, উত্তর প্রদেশে বিন্ধ্যবাসিনী, গুজরাটে কল্যাণী, মহারষ্ট্রে ভবানী, তামিলনাড়ুতে মীনাক্ষী, কেরলে ভগবতী, কর্ণাটকে চামুন্ডেশ্বরী।
ব্রহ্মার বরে অমর মহিষাসুরকে বধ করার জন্য দেবতাদের শরীর থেকে নির্গত সম্মিলিত তেজপুঞ্জ থেকে জন্ম হয় সুন্দরী শক্তিময়ী এক দেবীর। তিনিই মহিষাসুরকে যুদ্ধে পরাজিত করে মহিষাসুরমর্দিনী নামে পরিচিত হন। এই মহিষাসুরমর্দিনী দেবীই দুর্গা নামে মানুষের দুর্গতি নাশ করেন। ত্রিশূল বিদ্ধ করে মহিষাসুরকে বধ করার মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়কে কেন্দ্র করেই চামুন্ডশ্বরীর মূর্তি কল্পনা। মহা ধুমধাম করে দেবী চামুন্ডশ্বরী মায়ের পূজা করা হয় নবরাত্রির দিন। এক হাতে খড়্গ ও অন্য হাতে সাপ নিয়ে দেবী অসুর বধ করেন। কন্যাকুমারীর মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত কুমারী ভগবতীর অসামান্য শক্তি থেকেই বিশ্বব্রহ্মান্ডের জন্ম। এই শক্তিই প্রকৃতি।

সবকিছু প্রজননের উৎপত্তিকেন্দ্র। সমস্ত অস্তিত্বের মধ্যে তাঁর স্থিতি। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর আর আরব সাগরের সঙ্গমে অবস্থিত কন্যাকুমারী। কাশী বিশ্বনাথের (শিবের) অবস্থান বারাণসী। প্রকৃতির (ভগবতী দেবীর) বাসস্থান কন্যাকুমারী। হিন্দুদের কাছে এই দুটি স্থান পরম পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। মাদ্রাজ শহর থেকে ত্রিশ মাইল দক্ষিণে সমুদ্রতীরবর্তী পাহাড়ের গায়ে মন্দির ও ভাস্কর্য পল্লব রাজাদের শিল্পগৌরবের সাক্ষ্য বহন করছে। এই স্থানটি ‘মমল্লপুরম’ বা ‘মহাবল্লিপুরম’ নামে পরিচিত। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত সময়সীমায় পল্লব রাজাদের ভাস্কর্য ও স্থাপত্যর্কীতিগুলো রচিত হয়েছে। পঞ্চপা-বের নামানুসারে রথমন্দির, শ্রীকৃষ্ণের গোদাহন, গঙ্গাবতরণের দৃশ্য, অর্জুনের প্রায়শ্চিত্ত প্রভৃতি শিল্পকীর্তিগুলোর মধ্যে মহিষাসুরমর্দিনীর ভাস্কর্য কালজয়ী হয়ে আছে। এখানে অষ্টভুজা সিংহবাহিনীর বীরত্বব্যঞ্জক ভঙ্গি। বিশালাকার গদাধারী মহিষাসুর আক্রমণে উদ্যত। দেবসেনা ও অসুরসেনার মূর্তিমালাও অপূর্ব গতিছন্দে মন্ডিত। যুদ্ধ উন্মাদনার আবহ ও গতিবেগ অতি সুন্দরভাবে সঞ্চারিত হয়েছে এখানে। এ যেন শক্তি ও সুষমার এক অপূর্ব সমন্বয়। গুপ্তযুগে স্থাপত্য ও ভাস্কর্যকলার মূল্য অপরিসীম। মহীশূর রাজ্যের বিজাপুর জেলায় ষষ্ঠ শতাব্দীতে তৈরি আইহোলীর দুর্গা মন্দিরটি স্থাপত্য নির্মাণ-কৌশলের দিক থেকে যেমন অপূবর্, তেমনি অপূর্ব দুর্গার মূর্তিটিও। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে মধ্যভারতের  উদয়গিরি থেকে প্রস্তরনির্মিত মহিষাসুরমর্দিনীর যে মূর্তির নির্দশন পাওয়া গেছে তা অসাধারণ। দক্ষিণ ভারতে চিদাম্বরম মন্দিরের পশ্চিম দিকের গোপুরমে আঠারোভুজা দেবীর অসুর সংহাররত মূর্তিটি ব্যতিক্রম। খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকে কেরল থেকে প্রাপ্ত তীরধনুক হাতে দন্ডায়মান শান্ত সমাহিত দুর্গামূর্তি অন্য কোথাও চোখে পড়ে না।
আনুমানিক একাদশ শতকে দিকে তৈরি অসমের কাহিলিপাড়ার বৃত্তাকার ব্রোঞ্জ মূর্তিতে মহিষ ও মর্দিনীর কেবল মুখের অবতারণায় দুর্গা-অসুরের সংগ্রামকে বোঝানো হয়েছে প্রতীকী দ্যোতনায়। চিরাচরিত ঐতিহ্যসম্পন্ন দেবীকল্পনা বহির্ভূত একটি শিল্পনিদর্শন রয়েছে মধ্যপ্রদেশের ভাদো অঞ্চলে গদারমল মন্দিরে। খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এই দেবীমূর্তি ভাব ও ভঙ্গি দুই দিক থেকেই একেবারে চিরাচরিত রীতি-পদ্ধতির বাইরে। সিংহের ওপর উপবিষ্ট দুর্গার পায়ে মল বা নূপুর জাতীয় পদাভরণ। চতুর্ভুজা দেবীর ডান দিকের এক হাত ফুল, আর এক হাত ব্যস্ত কপালের প্রসাধনে। বাঁ দিকের এক হাতে দর্পণ, অন্য হাত কানের লতিতে। সম্ভবত কানে দুল পরছেন। প্রসন্নচিত্ত সৌম্যভাবের এই মূর্তিকে শিল্পবেত্তারা ‘শৃঙ্গার দুর্গা’ নামে অভিহিত করেছেন।
ভারতীয় চিত্রকলায় অণুচিত্র এক অমূল্য সম্পদ, যার জগৎজোড়া খ্যাতি ‘ইন্ডিয়ান মিনিয়েচার পেইন্টিং’ নামে। আয়তনে ক্ষুদ্র বলে এই রকম নাম। ১৬২৫ সালে আঁকা জনপ্রিয় মুঘল পদ্ধতির একটি অণুচিত্রে দেখা যায় দ্রুতচারী অশ্বরূঢ়া দেবী গদাধারী অসুর নিধনে উদ্যত। অণুচিত্রের বিভিন্ন শৈলীতে অসুর নিধনের প্রসঙ্গ আঁকা হয়েছে। আঠারো শতকের কাংড়া শিল্পরীতিতে অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধরতা দেবীর ছবিটি অতুলনীয়। যুদ্ধরতা দেবীদুর্গা বাঘের পিঠে ধাবমান। অস্ত্রশস্ত্রে তিনি সুসজ্জিতা। অসুরদের মধ্যে কেউ বা ভূলুণ্ঠিত, কেউ বা আক্রমণ রচনায় উদ্যত।
শিল্পকলার নানা শাখা-প্রশাখায় দেবী দুর্গার বৈচিত্র্যবিস্তার সীমাহীন। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে সব দারু বিগ্রহ তৈরি হয়েছে, তাতেও দুর্গা, ভবানী, কালী, চন্ডী, সিংবাহিনী প্রভৃতি মূর্তি রয়েছে। দেবী দুর্গার এই রূপ হোক সাবেকী আমলের কিংবা আধুনিক কালের- মায়ের ভক্তরা কিন্তু সেখানে সন্তান বৎসল মাকেই খুঁজে পান। জগৎজননীর অসংখ্য রূপ জগতের মানুষকে বিমোহিত করেছে যুগে যুগে। ভিন্ন ভিন্ন রূপ হলেও অভিন্নসত্তাধারী আদ্যাশক্তির কাছ থেকে মায়ের ভক্তরা পেয়েছে অসুর নিধনে কিংবা অশুভ শক্তির নিবারণে অপরিসীম সাহস ও প্রতিকূলতাকে জয় করার প্রেরণা। এবারের দুর্গাপূজাও আমাদের মাঝে সেই ভাবাবেগ ও শক্তির আবেশ জাগিয়ে তুলবে, এই প্রত্যাশা দেবীর রাতুল শ্রীচরণে।

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল এ্যান্ড কলেজ

 

monarchmart
monarchmart