ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১

জট নিরসনে সুফল আনতে পারে এডিআর পদ্ধতি

আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪২ লাখ

বিকাশ দত্ত

প্রকাশিত: ২৩:৩৯, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

আদালতে বিচারাধীন  মামলার সংখ্যা  প্রায় ৪২ লাখ

.

উচ্চ আদালতে মামলা নিষ্পত্তির পাশাপাশি মামলার সংখ্যাও বাড়ছে। মামলা দায়েরের চেয়ে নিষ্পত্তির হার অনেকাংশে কম। ফলে প্রতিদিন নতুন করে মামলাজটে যুক্ত হচ্ছে সিংহভাগ মামলা। বর্তমানে উচ্চ আদালতসহ বিচারিক আদালতে মামলার সংখ্যা প্রায় ৪২ লাখ। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে বিচারকের স্বল্পতা, সাক্ষীদের গরহাজির, বারবার সময় প্রার্থনা কিছু আইনজীবীর ভূমিকার কারণে দেশের উচ্চ নিম্ন আদালতে প্রতিদিন মামলার সংখ্যা বাড়ছে। আইন মন্ত্রণালয় সুপ্রিমকোর্ট সূত্রে খবর জানা গেছে। আইনজীবীদের অভিমত মামলাজট নিরসনে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতি অনুসরণ করলেই সুফল পাওয়া যাবে। উভয় পক্ষকে যদি  বোঝানো যায় মামলা করলে ১০ বছর ক্ষতি হয়ে যাবেসেক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে এগিয়ে এলে দুই পক্ষই লাভবান হবেন। দশের আদালতসমূহের মামলাজট কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর জোর দিতে হবে। এদিকে আদালতগুলোতে মামলাজট থাকলেও জনস্বার্থে মামলার সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে আদালত তার স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে।

জনস্বার্থ রক্ষায় মানবাধিকার পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস পিস ফর বাংলাদেশ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), আইন শালিস কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিসহ (বেলা) অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনগুলো কয়েক হাজার মামলা  করেছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ মামলাতেই আদালত রুল জারি করেছে। জনস্বার্থমূলক মামলার ধারণা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিকাশমান একটি ধারা। বাংলাদেশে ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে পর্যন্ত সংখ্যার হিসাবে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার অগ্রগতি খারাপ নয়। জনস্বার্থ মামলার ক্ষেত্রে আদালত অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করছে। আদালতের স্বপ্রণোদিত এখতিয়ার জনস্বার্থমূলক মামলার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। 

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ সাল থেকে পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছরে সাড়ে ৮৬ হাজার বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। ৬৪ জেলার লিগ্যাল এইড এই মামলা নিষ্পত্তি করেছে। যদিও এই সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম বলে জানিয়েছেন আইনজীবীগণ। আইনজীবীদের মতে, দেওয়ানী মামলা দুই পক্ষের সম্মতিতে নিষ্পত্তি সহজ। কিন্তু  ফৌজদারি মামলা তত সহজ নয়।

প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক জনকণ্ঠকে বলেছেন, আগের তুলনায় মামলা জট কমতে শুরু করেছে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি করা গেলে মামলার জট অনেকাংশে কমে যাবে। মানুষ মরে যায়, অথচ  দেওয়ানি মামলা চলে কয়েক পুরুষ ধরে। ব্যবস্থা  থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিতেই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইন। বিচার প্রার্থীরা বিচারের আশায় লাখ লাখ টাকা খরচ করে, কিন্তু তার পরও কাক্সিক্ষত বিচার তারা পায় না। দিনের পর দিন সময় প্রার্থনার নামে সুপরিকল্পিতভাব ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করা হয়।

প্রসঙ্গে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহম্মেদ জনকণ্ঠকে বলেছেন, সুয়োমটো পাবলিক ইন্টারেস্টে দিচ্ছে। বিচার বিভাগের ক্ষমতা আছে। গ্রামেগঞ্জে সালিশ হচ্ছে  সেখানে মহিলাদের  পেটানো হচ্ছে। সালিশের নামে নির্যাতন, ঘর থেকে বের করে দেওয়াসহ নানা ধরনের কর্মকান্ড হয়ে থাকে। সালিশের নামে সেখানে ইচ্ছা করে আইন ভঙ্গ করা হয়। সেগুলো আদালত নজরে নিতে পারে। এটার কারণে মামলার ডিলে (বিলম্বিত) হচ্ছে না। মামলাজট নিরসনে বিকল্প বিরোধ নিষ্পক্তি (এডিআর) পদ্ধতি অনুসরণ করলেই সুফল পাওয়া যাবে। উভয়পক্ষকে যদি  বোঝানো যায় মামলা করলে ১০ বছর ক্ষতি হয়ে যাবে।  সেক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে এগিয়ে এলে দুই পক্ষই লাভবান হবেন। দেশের আদালতসমূহের মামলাজট কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর জোর দিতে হবে।

দৈনন্দিন বিচারিক কাজের পাশাপাশি আদালত পাবলিক ইন্টারেস্টে সুয়োমটো রুল (স্বপ্রণোদিত আদেশ) জারি করছেন। আদালতের নজরে এনে আদেশ প্রদান করছেন। এতে ভুক্তভোগীরা দ্রুত ফল পাচ্ছেন। ফলে একদিকে সুয়োমটো রুল অন্যদিকে জনস্বার্থের মামলাগুলো এখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। গুলোর জনপ্রিয়তার পাশাপাশি মামলা জট কমাতে হলে বিকল্প রিরোধ নিষ্পত্তির দিকে নজর দিতে হবে।

এদিকে আদালতগুলোতে মামলাজট থাকলেও জনস্বার্থে মামলার সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে আদালত তার স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। জন-স্বার্থে  উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করা হচ্ছে,এর পর আদালতের  রুল ইস্যু করার পর সেই কাজগুলো তড়িৎ গতিতে সমাধা হচ্ছে। এতে করে আদালতের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। আইনজীবীদের অভিমত স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ দায়িত্বে তাদের কাজগুলো সারলে আদালতের ওপর চাপ কমবে, তেমনি জনগণও ওইসব প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখতে পারবে। তা না হলে জনগণও আদালতমুখী হয়ে পড়বে। ফলে আদালতের নির্দিষ্ট মামলাগুলোর শুনানিতে মারাত্মক ক্ষতি হবে। সত্ত্বেও জনস্বার্থে মামলাগুলো এখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। 

সুয়োমুটো রুল বছরে হাতেগোনা কয়েকটি দেওয়া হয়। সূত্রমতে, সুয়োমটো  রুলের ইতিবাচক দিক অবশ্যই আছে। কিছু বিষয় আছে সেখানে কোনো আইনজীবী যায় না। সেখানে আদালত নজরে এনে রুল জারি করেন। আদালত নজরে এনে রুল জারি করায় জনগণের অনেক উপকার হয়ে থাকে। তবে সুয়োমোটোর রুল খুবই অল্প হচ্ছে। স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করলে আইনজীবীদের  মামলা নিয়ে দৌড়াতে হতো না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠান তাদের দাযিত্ব পালন করছে না। জনগণ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে জনস্বার্থে মামলা হচ্ছে। উচ্চ আদালতের রায়ের পর জনগণ তাদের অধিকার ফিরে পাচ্ছে। কাজেই এখন জনস্বার্থে দায়েরকৃত মামলাগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

×