ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

নির্বাচন বর্জনের প্রচ্ছন্ন হুমকি

আসন সমঝোতা নিয়ে আওয়ামী লীগ-জাপা মনস্তাত্ত্বিক লড়াই

বিকাশ দত্ত

প্রকাশিত: ২২:১৭, ১০ ডিসেম্বর ২০২৩

আসন সমঝোতা নিয়ে  আওয়ামী লীগ-জাপা মনস্তাত্ত্বিক লড়াই

.

নির্বাচন বর্জনের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে আরও আসন বাগাতে চায় জাতীয় পার্টি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি নিয়ে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি নিজ নিজ অবস্থানে এখনো অনড়। জাপা ৪০টি আসন দাবি করলেও আওয়ামী লীগ জাপাকে ২০ থেকে ২৫টি আসন ছাড় দিতে চায়। নিয়ে দুই দলে শুরু হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। তবে শেষ ভাগে আসন ভাগাভাগি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৭ ডিসেম্বরের আগেই বিষয়টি খোলাসা হয়ে যাবে বলে জানা গেছে। আসন নিয়ে সমঝোতা না হলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছে জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টি নেতাদের কর্থাবার্তায় এমনইটাই ফুটে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে খবর জানা গেছে। জাতীয় পার্টির (জাপা) আসন ভাগাভাগির বিষয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা রেখে পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, যেখানে সংসদীয় পদ্ধতিতে সরকার আছে, সেখানে এমন আসন ভাগাভাগি হয়। অনেক দেশে এমনটি হয়, আমাদের দেশে হয়েছে। আমরা নিজেরাও আসন ভাগাভাগি করেছি। জাতীয় পার্টির আসন ভাগাভাগির বিষয়ে আপাতত কোনো আলোচনা নেই। আবারও যে আসন ভাগাভাগি হবে না এটা যেমন ঠিক না, আবার ভাগাভাগি হবে এটাও ঠিক না।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৭ ডিসেম্বর। এর দুয়েক দিন আগেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারে আওয়ামী লীগ। আসন ভাগাভাগি নিয়ে  দুদলই সমঝোতা চায়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে দুদলের মধ্যে বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়েছে। শনিবারও দু দলের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, জোটগতভাবে নির্বাচনে যাবে জাতীয় পার্টি। 

২০০৮ সাল থেকেই আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি তিনটি নির্বাচন করেছে সমঝোতা করেই। এর মধ্যে দুইবার মহাজোট করে এবং ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে জোট না থাকলেও আসন নিয়ে সমঝোতা ছিল দুই দলে। সেবার জাতীয় পার্টির আগ্রহ অনুযায়ী ৩৪ আসনে ছিল না নৌকার কেউ। লাঙ্গলের প্রার্থীরা জয় পান সেসব আসনেই। মহাজোটের সূচনা হয়েছিল ২০০৬ সালে জটিল এক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে। এরপর একটি নির্বাচন বর্জন তিনটি নির্বাচনে লড়াই হয় সমঝোতা করেই। এবারও বিএনপির ভোট বর্জনের আলোচনার মধ্যেও জাতীয় পার্টির সঙ্গে বেশ কিছু আসনে সমঝোতার বিষয়টি নিয়েই এগোচ্ছিল আওয়ামী লীগ। তবে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের নেতৃত্বের টানাপড়নে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ তার অনুসারীরা ভোট থেকে দূরে থাকার পর সমীকরণ পাল্টে যায়। বিএনপির বর্জনের ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনেও যখন ভোট নিয়ে নানামুখী তৎপরতা, সে সময় রওশনের অবস্থানের কারণেই জাতীয় পার্টির একটি অংশ শেষ পযন্ত  ভোটে যায়।

এবার দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়েও চলছে সমঝোতা। একাধিক বৈঠকে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের কাছে ৪০টি আসনে নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় দুটি বিষয় উঠে আসে। প্রথমটি যে আসনগুলোতে সমঝোতা হবে সেই আসনে শুধুমাত্র লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী থাকবে কোনো নৌকা প্রতীকের প্রার্থী থাকবে না। ওই আসনে যদি আওয়ামী লীগের কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী থাকে তাদেরও বসিয়ে দিতে হবে অথবা নিষ্ক্রিয় করতে হবে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় পার্টি এবং শরিকদের চাপে এখন আওয়ামী কিছুটা হলেও  উদ্বিগ্ন। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ব্যাপারে জাতীয় পার্টির অবস্থানের সঙ্গে একমত নন আওয়ামী লীগের নেতারা। তারা বলছেন যে, দুটি কারণে এটা সম্ভব নয়। প্রথমত, যারাস্বতন্ত্রতারাস্বতন্ত্রই। আওয়ামী লীগ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যদি না থাকে তাহলে নির্বাচনের যে ভোটার উপস্থিতি তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনে রাখাটা জরুরি।

সব কিছু মিলিয়ে শীঘ্রই চূড়ান্ত আসন ভাগাভাগি করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি। দু-এক দিনের মধ্যে সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে বলে জানা গেছে। বৈঠকে এর আগে জাপার দেয়া ৪০টি আসন নিয়ে চুলচেড়া বিশ্লেষণ করা হয়। কোন কোন আসন জাপাকে ছাড় দেওয়া হবে আর কোন আসন ছেড়ে দেওয়া যাবে না বিষয়ে দুদলের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় স্থান পায় বর্তমান জাপার ১৭টি আসনে  কোনো নৌকার প্রার্থী থাকবে না। ছাড়া আরও ২৭টি আসন নিয়ে তাদের মধ্যে কথা হয়েছে বলে জানা গেছে। থেকে ১০টি আসনে লাঙ্গল   নৌকা প্রতীক উন্মুক্ত থাকবে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্ষমতায় যেতে আওয়ামী লীগের যেমন প্রয়োজন জাতীয় পার্টিকে আর তেমনি জাতীয় পার্টিরও প্রয়োজন আসন বাড়ানো। তবে জিএম কাদেরের স্ত্রী শরিফা কাদেরের ঢাকা -১৮ ঢাকা-১৭ আসনে সালমা ইসলামের প্রার্থিতা নিয়ে কিছুটা জাটিলতা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে শীঘ্রই আসন চূড়ান্ত করার কথা জানানো হবে। এতে বলা হয়েছে আসন ভাগাভাগি করেই জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাবে। 

জাতীয় পার্টি ৩০ থেকে ৪০টি আসন চায় আওয়ামী লীগের কাছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ২৫ থেকে ৩০টির মতো আসনের বিষয়ে গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া হয়েছে। জাতীয় পার্টি আসন সংখ্যার পাশাপাশি শীর্ষ নেতাদের আসনও চূড়ান্ত করতে চায় আগে ভাগেই। জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, কো-চেয়ারম্যান সালমা ইসলাম এমপি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপির আসন নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। কাজী ফিরোজ রশীদ ২০১৪ ২০১৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা- আসন থেকে নির্বাচিত হন। বছর আর কাজী ফিরোজ রশীদকে আসনটি ছেড়ে দিতে নারাজ আওয়ামী লীগ। ওই আসনে আওয়ামী লীগ সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনকে প্রার্থী করতে চান। সামলা ইসলাম এমপির আসন ঢাকা- (দোহার-নবাবগঞ্জ) নিয়ে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচন থেকেই রশি-টানাটানি চলছে। ওই নির্বাচনে সালমা ইসলামকে হারিয়ে এমপি নির্বাচিত হন বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমান। পরে সংরক্ষিত কোটায় এমপি হয়ে আসেন সামলা ইসলাম। এবার আসনটি ছাড় দিতে নারাজ জাপা। অবশ্য সামলা ইসলাম ঢাকা- আসনের পাশাপাশি ঢাকা-১৭ আসনেও মনোনয়ন জমা দিয়ে রেখেছেন।

জাতীয় পার্টি সূত্র জানিয়েছে, আসন ভাগাভাগি নিয়ে জাতীয় পার্টির সঙ্গে সরকারি দলের মধ্যস্থতাকারীদের ইতোমধ্যে কয়েকদফা আলোচনা হয়েছে। জানা গেছে, ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে জাপা মহাজোটের হয়ে ২৯টি আসনে লড়েছে। এর বাইরে জাতীয় পার্টি ১৩২টি আসনে লড়াই করে। মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে ২৯টি আসনের মধ্যে ২২ আসনে জয়লাভ করে জাতীয় পার্টির প্রার্থী। পরে উপনির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে একজন জয়ী হলেও সমঝোতা হয়নি। ২০১৮ সালে জাতীয় পার্টি জানায়, মহাজোট থেকে ২৯টি আসন পেয়ে তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি।

সূত্র মতে, জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের ৪০ আসন থেকে ছাড় দিতে নারাজ। এর ব্যত্যয় হলে প্রয়োজনে জাপা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবে দলের প্রার্থী প্রেসিডিয়াম সদস্যদের তিনি এমন অভাস দিয়েছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। জাপার এক প্রেসিডিয়াম সদস্য দ্বাদশ নির্বাচনের প্রার্থী নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ৯৬ সালে জাতীয় পার্টির কাঁধে ভর করে ক্ষমতায় এসেছিল। এরপর ২০০৯ থেকে একটানা তিন বার জাপার ওপর ভর করে ক্ষমতায় রয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচনের বৈধতার জন্যও জাতীয় পার্টিকে প্রয়োজন।তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওই সময় চাহিদা অনুযায়ী আসন সমঝোতা হয়নি। বেগম রওশন এরশাদ সে সময় আওয়ামী লীগকে রক্ষা করেছেন। এবার রওশন এরশাদ নেই। ওই সময় এরশাদ সাহেব নানা জটিলতা মোকাবিলা করে রাজনীতি করেছেন। বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের কোনো জটিলতা নেই। কারণেই তিনি তার অবস্থানে অটল রয়েছেন।

জাপার অপর এক প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম গোপনর রাখার শর্তে বলেন, ১৭ তারিখের পর বোঝা যাবে ছায়া বড় হচ্ছে, না নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। তাই ১৭ তারিখেই জাপা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।এর মধ্যে রাজনীতি ভোটের পরিবেশ পরির্বতন হলে জাপাও নতুন কৌশল নিয়ে সামনে এগোবে বলে জানান তিনি।

সূত্র মতে, জাতীয় পার্টির বর্তমান ১৭ এমপির আসনে থাকছে না নৌকা প্রতীক। এসব আসনে লাঙ্গল প্রতীকে লড়বেন জাপার বর্তমান এমপিরা। ছাড়া ঢাকা- আসনে বহাল থাকছেন সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা ঢাকা- আসনে কাজী ফিরোজ রশীদ। দুই আসনেও কোনো ধরনের পরিবর্তন আসছে না। আর নারায়ণগঞ্জ- আসনেও বহাল থাকছেন লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি। ছাড়া নতুন করে ঢাকা-১৭ আসনে জিএম কাদের, সালমা ইসলাম ঢাকা-১৮ আসনে শেরিফা কাদের মহাজোটের মনোনয়ন পেতে লড়াই অব্যাহত রাখছেন।

এদিকে, আওয়ামী লীগ জাপার কয়েকজন শীর্ষ নেতা জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাপার ২৩ এমপির সঙ্গে নতুন করে আরও ২৭ জনের তালিকা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে হস্তান্তর করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, বিশেষ করে পুরনোদের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে পটুয়াখালী- সদর আসনে জাপার কো-চেয়ারম্যান এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, কুমিল্লা-১১ আসনে জাপার প্রার্থী মোস্তফা কামাল, কুষ্টিয়া- আসনে (দৌলতপুর উপজেলা) জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী শাহরিয়ার জামিলসহ প্রায় ২৭টি আসনে থাকছে জাপার নতুন মুখ। আর আসনে জাপা আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে- এমন তথ্যও জানান জাপার একজন শীর্ষ নেতা। 

অপরদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ নিজ সংসদীয় আসন থেকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে দলীয় মনোনয়ন পেলেও নির্বাচন থেকে সরে আসতে হচ্ছে দলীয় অনেক প্রার্থীকে। শেষ মুহূর্তে বড় ধরনের কোনো নাটকীয়তা সৃষ্টি না হলে কমপক্ষে ২৫-৩০টি আসন আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিতে পারে দলটির।

×