তামাক
বর্তমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে সকল পাবলিক প্লেস এবং পরিবহনে শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার সুযোগ না থাকায় পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে অধূমপায়ীরা। অধূমপায়ীদের সুরক্ষায় বর্তমান আইনটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব বলছে, পরোক্ষ ধূমপানের কারণে পৃথিবীতে বছরে ১২ লক্ষ মানুষ অকালে প্রাণ হারায়। গ্লোব্যাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আচ্ছাদিত কর্মস্থলে কাজ করেন এমন প্রাপ্ত বয়স্ক জনগোষ্ঠির ৪২.৭ শতাংশ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। অর্থাৎ নিজেরা ধূমপান না করেও অন্যের ধূমপানের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
আমেরিকার জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ এবং গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) যৌথভাবে ঢাকার ১১৮টি আবাসিক হোটেল ও ৩৫৫টি রেস্টুরেন্ট, ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া ৫৩টি ট্রেনের ওপর একটি গবেষণা চালায়। গবেষণায় মোট ৫২৬টি নমুনার মধ্যে মাত্র ৪১টিতে (৮ শতাংশ) ধূমপানের জন্য নির্ধারিত এলাকা পাওয়া গেছে, যার একটিও পরিপূর্ণভাবে আইন মেনে করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি থেকে অধূমপায়ীদের সুরক্ষায় আইন সংশোধন করে ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত এলাকা’ বা ডিএসএ বিলুপ্ত করে শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। থাইল্যান্ড, নেপাল, তুরস্ক, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের ৬৭টি দেশ ‘ধূমপানের জন নির্ধারিত স্থান’ রাখার বিধান বাতিলসহ পূর্ণাঙ্গ ধূমপানমুক্ত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের সমন্বয়কারী (অতিরিক্ত সচিব) হোসেন আলী খোন্দকার বলেন, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। সংশোধনীতে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ রাখার বিধান বিলুপ্ত করা, বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্য বা প্যাকেট প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা, ই-সিগারেট এবং ভ্যাপিং ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করা সহ বেশ কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সংশোধিত আইনে।
সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের মধ্যে ক্ষতিকর ইলেকট্রনিক সিগারেটের ব্যবহার বেশ চোখে পড়ছে। বিভিন্ন ফ্লেভার এবং আকর্ষণীয় ডিজাইনের কারণে কিশোর এবং তরুণদের মাঝে এসব পণ্যের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিমধ্যে ভারতসহ কমপক্ষে ৩২টি দেশ এসব পণ্য বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছে। যুক্তরাজ্যসহ বহুদেশ এসব পণ্য নিষিদ্ধের জন্য কাজ করছে।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এসএম মোস্তফা জামান বলেন, ই-সিগারেট সিগারেটের মতই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আইন করে এটি বন্ধ করা হয়েছে। ভবিষ্যত প্রজন্মের সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে দেশকে তামাকমুক্ত করার কোন বিকল্প নেই।
সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠির প্রায় ৪৮ শতাংশই তরুণ, যাদের বয়স ২৪ বছর বা তার নিচে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট সময়কাল অতিবাহিত করছে যেখানে, নির্ভরশীল জনগোষ্ঠির তুলনায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠির সংখ্যা বেশি। এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার জন্য খসড়া সংশোধনীতে বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন নিষিদ্ধের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে নেপাল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ ৫০টি দেশ বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্যের প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, তামাকপণ্য প্রদর্শনের কারণে বর্তমান তামাক ব্যবহারকারীদের অনেকেই তামাক ছাড়ার বিষয়ে আগ্রহী হয়না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী তরুণদের নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড এ আকৃষ্ট করতে পৃথিবীব্যাপি বছরে ৯০০ কোটি ডলার ব্যয় করে তামাক কোম্পানিগুলো।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশের ৩৫.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠির তামাক ব্যবহার করে। তামাকের ভয়াবহতা রোধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং এলক্ষ্যে তিনি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন যুগোপযোগী করার নির্দেশ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ বর্তমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে শক্তিশালীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
আরএস








