ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

অসংখ্য ‘মায়ের’ স্নেহধন্য

মো. জোবায়ের আলী জুয়েল

প্রকাশিত: ২২:২৫, ২৩ মে ২০২৪

অসংখ্য ‘মায়ের’ স্নেহধন্য

কাজী নজরুল

মায়ের সঙ্গে নজরুলের ঝগড়া এবং অভিমানের কারণ জানা না গেলেও অনুমান করা শক্ত নয় যে, মায়ের কোনো আচরণের নজরুল একটা প্রচন্ড মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন যার দরুন আর কোনো দিন চুরুলিয়া ফিরে যেতে রাজি হননি। এমন কি ১৯২৮ সালের ৩০ মে চুরুলিয়ায় মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়েও নজরুল গ্রামের বাড়িতে যাননি

কাজী নজরুল কিশোর বয়সে গৃহত্যাগ করার পর মায়ের সঙ্গে দেখা হয়  প্রায় দশ বছর পর। পল্টন থেকে ফিরে ১৯২০ সালে একবার চুরুলিয়ায় গেলে সেখানে সপ্তাহ কাল ধরে অবস্থান করেন তিনি। এই সময় মায়ের সঙ্গে তাঁর নানা বিষয়ে অনেক আলাপ হয়। শেষে কথায় কথায় ভীষণ ঝগড়া বেধে যায়। এই ঝগড়ার কারণ জানা যায়নি।

নজরুল ও পরবর্তীতে এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলেননি। ঝগড়ার পর তিনি বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন। এরপর তাঁর মা যতদিন জীবিত ছিলেন কত অনুরোধ করেছেন কত আব্দার ধরেছেন ছেলেকে এক নজর দেখার জন্য কিন্তু নজরুলের জেদ আর অভিমান এতটা তীব্র ছিল যে, মায়ের অনুরোধ তিনি রাখেননি। ইহকালে মায়েরও আর ছেলের মুখ দেখা হয়নি। 
শোনা যায় নজরুলের মা জাহেদা খাতুন ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী। সে সময় তাঁর বয়সও ছিল কম। একজন বয়স্কা সুন্দরী বিধবা রমণী সম্মানের সঙ্গে নিজের ইজ্জত আব্রু রক্ষা এবং নিজের ও সন্তানদের ভরণপোষণের নিশ্চয়তার জন্য যদি মৃতঃস্বামীর ভাইকে বিয়ে করেই থাকেন তাহলে অবস্থার প্রেক্ষাপটে সেটাকে কোন অন্যায় বলা চলে না।

তা ছাড়া ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের বিয়েকে বরং উৎসাহিতই করা হয়েছে। তবে একথা মিথ্যে নয় যে, উভয়বঙ্গের গ্রামীণ পরিবেশের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা এতটাই অনুদার যে, সম্পূর্ণ বৈধ হলেও এ ধরনের বিয়েকে অনেকে কিছুটা হেয় চোখেই দেখে থাকে। সম্ভবত নজরুল ও সেই মানসিকতার ঊর্ধ্বে উঠে মায়ের দ্বিতীয় বিয়েকে মেনে নিতে পারেন নি। এমন ও হতে পারে নজরুলকে তাঁর মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে কেউ হাসি-মসকরা করেছিলো যা তাঁর মনে গেঁথে গিয়েছিল এবং যা তিনিই কখনোই ভুলতে পারেননি। 
তবে মায়ের সঙ্গে নজরুলের ঝগড়া এবং অভিমানের কারণ জানা না গেলেও অনুমান করা শক্ত নয় যে, মায়ের কোনো আচরণের নজরুল একটা প্রচন্ড মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন যার দরুন আর কোনো দিন চুরুলিয়া ফিরে যেতে রাজি হননি। এমন কি ১৯২৮ সালের ৩০ মে চুরুলিয়ায় মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়েও নজরুল গ্রামের বাড়িতে যাননি।

শেষবারের মতো মায়ের মুখ খানি দেখেননি। অবশেষে এক বুক কষ্ট নিয়ে জাহেদা খাতুন এ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেছেন। মা জাহেদা খাতুন পুত্র নজরুলকে এক নজর দেখার জন্য অন্তিম বাসনা প্রকাশ করেছিলেন। জাহেদা খাতুনের মাতৃ হৃদয়ের এই অতৃপ্ত হাহাকার কি নজরুল জীবনে কোনই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি?

কে জানে নজরুলের ৩৪ বছরের জীবন্ত-মৃত অবস্থার জন্য তাঁর মায়ের অতৃপ্ত আত্মার অভিশাপই দায়ী কিনা। জীবদ্দশায় কবি কখনোই এ সম্পর্কে মুখ খোলেননি। ফলে নজরুলের জীবনে এটি আজও অমীমাংসিত অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গেছে।

অভিমান বশে মায়ের সঙ্গে নজরুল সম্পর্ক ছিন্ন করলেও পরবর্তী সময়ে নজরুলের বুভূক্ষু মন কিন্তু সর্বদা কাঙালের মতো কেঁদে ফিরেছে মাতৃস্নেহের সামান্যতম পরশ পাওয়ার জন্য। তাই আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন সময়ে কতিপয় মহীয়সী নারীকে তিনি প্রাণভরে মা বলে সম্বোধন করেছেন। তাঁদেরকে কবি যেমন মায়ের মতোই অন্তর দিয়ে ভক্তি শ্রদ্ধা করেছেন। তেমনি তাঁরাও তাঁকে পুত্রবৎ স্নেহ করেছেন।

নজরুলের মা সম্বোধনে যারা ধন্যা হয়েছিলেন তাদের মধ্যে দৌলতপুরের আলী আকবর খানের মেজো বোন নার্গিসের খালা আম¥া এখতারুন্নেসা খানম, বিপ্লবী হেমপ্রভা দেবী, হুগলীর মিসেস এম. রহমান, কুমিল্লার বিরজা সুন্দরী দেবী এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্ত্রী বাসন্তী দেবী অন্যতম, নজরুল নার্গিসের বিয়ের ব্যাপারে যখন খাঁ পরিবারের সকলেই ছিলেন গররাজি তখন এই এখতারুন্নেসাই সকলের ওপরে প্রভাব বিস্তার করে সেই বিয়েকে সম্ভব করে তুলেছিলেন।

১৯২১ সালের ১৭ জুন নজরুলের সঙ্গে নার্গিস আসার খানম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন (বিয়ে নিয়ে অনেক মতানৈক্য আছে)। এই সময় এখতারুন্নেসা খানম মায়ের মতোই নজরুলের সকল আব্দার পূরণ করতেন। এখতারুন্নেসা ছাড়া আর কাউকে কবি পাত্তাই দিতেন না। নজরুলকে তিনি এতটা আপন করে নিয়েছিলেন যে, ভাইদের কাছে প্রাপ্য তিনি তাঁর পৈত্রিক সম্পত্তি নজরুলের নামে লিখে দেওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান।
বহু নারীর মাতৃস্নেহ আদর, মমতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছেন কবি। এমনি ধরনের আরেক অগ্নিকন্যা হেমপ্রভাকে নজরুল ‘মা’ বলে ডাকতেন। এই হেমপ্রভাকে নিয়ে কবি রচনা করেন ‘হৈমপ্রভা’ কবিতাটি। ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ২৯ ফাল্গুন কবি মাদারীপুরে মৎস্যজীবী সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। প্রগতিশীল শান্তি আন্দোলন ও নারী জাগরণের অগ্রসেনানী হেমপ্রভাও ঐ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। কবি এই মহীয়সী নারীকে নিয়ে ১৯২৬ সালে রচনা করেন হৈমপ্রভা কবিতাটি।
 কোন অতীতের আঁধার ভেদিয়া
আসিলো আলোক জননী।
প্রভায় তোর উদিল প্রভাত
 হেম-প্রভ হলো ধরণী ॥
এসো বাংলার চাঁদ সুলতানা
বীর মাতা বীর জায়া গো।
 তোমাতে পড়েছে সকল কালের
বীর নারীদের ছায়াগো ॥
শিব সঙ্গে সতী শিবানী সাজিয়া
ফিরছি শ্মশানে জীবন মাগিয়া,
তব আগমনে নব বাঙালির
কাটুক আঁধার রজনী ॥
(সংক্ষেপিত)

প্রমিলা নজরুলের বিয়ে হয ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল, তাঁদের যখন বিয়ে হয় তখন প্রমীলার বয়স ১৪ আর নজরুলের ২৩। মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার ঐতিহ্যবাহী তেওতা গ্রামে প্রমীলা সেন গুপ্তার জন্ম। পিতার নাম বসন্ত কুমার সেন গুপ্ত। নজরুলের শাশুড়ীর নাম গিরিবালা দিবী। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণের মেয়ে। নজরুল তাঁর নিজের শাশুড়ীর গিরিবালাদেবীকে কোনো দিন মা বলে ডাকেননি। তাঁকে ডাকতেন মাসিমা বলে। তিনি নজরুলকে সম্বোধন করতেন নুরু বলে।

শ্রীযুক্ত গিরিরবালা দেবী তাঁর স্বামী বসন্ত কুমার সেন গুপ্তের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী ছিলেন এবং একটি মাত্র সন্তান প্রমীলা জন্মাবার পরেই তিনি বিধবা হয়েছিলেন। তাঁর স্বামী বসন্ত কুমার সেন গুপ্তের প্রথমা স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থাতেই তিনি গিরিবালা দেবীকে বিয়ে করেছিলেন। গিরিবালা দেবীর ‘জা’ ছিলেন বিরজা সুন্দরা দেবী।
প্রমীলার জেঠি বিরজা সুন্দরী দেবীকে যে নজরুল ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন সে কথা তো সকলেরই জানা। তিনিই নজরুলকে হুগলী জেলে নিজ হাতে লেবুর রস পান করিয়ে দীর্ঘ ৩৯ দিনের অনশন ভঙ্গ করিয়ে ছিলেন। সেদিন নজরুলের অনশন ভাঙ্গিয়ে জেল থেকে বাইরে এসে অপেক্ষমাণ জনতার উদ্দেশ্যে বিরজা সুন্দরী দেবী বলেছিলেন- ‘খাইয়েছি পাগলকে, কথা কি শোনে।

বলে না, অন্যায় আমি সইব না’ শেষ পর্যন্ত আমি হুকুম দিলাম, আমি ‘মা’। মার আদেশ সব ন্যায় অন্যায় বোধের ওপরে। লেবুর রস খাইয়ে এসেছি।’ ১৯২৬ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত হয় কবির বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সর্বহারা’। কবি এই গ্রন্থটি বিরজা সুন্দরী দেবীকে উৎসর্গ করেন। উৎসর্গ কবিতাটিতে নজরুল লিখেন-
‘মা (বিরজা সুন্দরী দেবী)র শ্রী চরণার বিন্দে’
সর্বসহা সর্বহারা জননী আমার।
তুমি কোন দিন কারো করনি বিচার।
কারেও দাওনি দোষ, ব্যথা বারিধির
কুলে বসে কাঁদো মৌনা কন্যা ধরণীর।
হয়তো ভুলেছো মাগো, কোন একদিন,
এমনি চলিতে পথে মরু-বেদুইন।
শিশু এক এসেছিল, শ্রান্ত কণ্ঠে তাঁর
বলেছিল গলা ধরে ‘মা হবে আমার?’
বিরজা সুন্দরী দেবী সপরিবারে কলকাতা চলে আসার পর কবি নিয়মিত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ১৯৩৮ সালে কলকাতায় এই মহীয়সী নারী দেহ ত্যাগ করেন। নজরুল এ সময় তাঁর শয্যাপাশে উপস্থিত ছিলেন। 
বহরমপুর জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর যে পরিবারের সঙ্গে কবির পরিচয় হয়, সে পরিবারের কর্ত্রী সুনীতি বালাকেও কবি মায়ের আসনে রাখেন। নজরুল জীবনে সাহিত্য যেমন ছিল।

ঠিক তেমনটি ছিল নারীর অবদান। কবি তাঁর সুখ-দুঃখ অভিমান মুখে প্রকাশ না করে সাহিত্যের মাঝে তুলে ধরেছেন। মায়েদের নিয়ে লিখেছেন একের পর এক কবিতা। এই কবির সাহিত্য মানেই নারীর অবদান। এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 
হুগলীর এক মহীয়সী নারী বিশিষ্ট সমাজ সেবিকা এবং লেখিকা মিসেস এম. রহমান কেও নজরুল অপরিসীম শ্রদ্ধা ভক্তি করতেন। তাঁকেও মা বলে ডাকতেন। তাঁর প্রকৃত নাম মোছাম্মদ মাসুদা খাতুন। জন্ম ১৮৮৪ সালে। হুগলির সরকারি উকিল খান বাহাদুর মজহারুল আনওয়ার চৌধুরীর কন্যা এই মিসেস এম. রহমান নজরুর ইসলামকে বিশেষ ¯েœহ করতেন। 
এই সময় আরেক জন মহীয়সী নারীকে তিনি প্রাণ ভরে ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন। তিনি হচ্ছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সহধর্মিণী বাসন্তী দেবী। তিনি ও তাঁকে সন্তানতুল্য স্নেহ করতেন। 

×