ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০৩ মার্চ ২০২৪, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩০

ভাষা সংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তর বাড়ি

এস ডি সুব্রত

প্রকাশিত: ২২:২৭, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ভাষা সংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তর বাড়ি

ভাষা সংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তর বাড়ি

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন বসে। কংগ্রেসের এমপি হিসেবে নয়, বাঙালি হিসেবে, ব্যক্তি হিসেবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদে প্রথম দিনেই প্রস্তাব করেন উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা করা হোক। সেদিন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে সংসদে চরম কটাক্ষ ও অবহেলার শিকার হতে হয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের গণপরিষদ সদস্যদের কাছে

ফেব্রুয়ারি এলেই যেন বাংলা আর বাঙালি জেগে ওঠে। পলাশ শিমুলে রঙের আগুন লাগে। শোকে আর গর্বে বুক ভরে ওঠে বাঙালির। মর্মে শিহরণ জাগে। আবার ফেব্রুয়ারি চলে গেলে যেন স্তিমিত হয়ে ভাষার প্রেম। বাঙালি হচ্ছে সেই জাতি যে জাতিকে মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর যে চক্রান্ত শুরু হয় তার প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন বসে। কংগ্রেসের এমপি হিসেবে নয়, বাঙালি হিসেবে, ব্যক্তি হিসেবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদে প্রথম দিনেই প্রস্তাব করেন উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা করা হোক। সেদিন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে সংসদে চরম কটাক্ষ ও অবহেলার শিকার হতে হয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের গণপরিষদ সদস্যদের কাছে। তখন বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ও ধর্মান্ধ মহল তাকে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার ধারক ও রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।

তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইল গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মহান ভাষা সৈনিককে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে মৃত্যুবরণ করতে হয় তার ছেলে দিলীপ দত্তসহ। অথচ সেই ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতির প্রতি আমরা বাঙালি বড়ই উদাসীন। এমনকি তার স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি আজ বড় অনাদরে অবহেলায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে যা ধর্ম সাগর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত। 
গতকাল বাংলাদেশ সমবায় একাডেমি কোটবাড়ি কুমিল্লায় আসি একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণে। প্রশিক্ষণে আসার আগেই পরিকল্পনা করি এবার কুমিল্লা গিয়ে ধর্ম সাগর পশ্চিমপাড়ে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িতে যাব। যেই কথা সেই কাজ। ক্লাস শেষে বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে হোস্টেলে ফিরে রুমমেট ও আমার সহকর্মী জালালকে (জলাল উদ্দিন আহমদ ) বলি এক জায়গায় যাব কুমিল্লা শহরে। তবে একা যাব। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি বার্ডের সামনে থেকে সিএনজি নিয়ে সোজা কান্দিরপাড়।

সেখান থেকে নেমে ধর্ম সাগর পশ্চিমপাড় ঝাউতলা রোড। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সামনে দিয়ে চলে যাওয়া এই রাস্তাটির বর্তমান নামকরণ করা হয়েছে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সড়ক। এখানে বেশ কয়েকজন এলাকাবাসীকে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির কথা বললে তারা আমাকে সঠিকভাবে লোকেশন দিতে পারেনি। শেষে একজন প্রায় ষাটোর্ধ্ব লোককে বললে তিনি একটা চায়ের দোকান দেখিয়ে দিয়ে বলেন এটিই শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি। ভাঙা টিনের গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই পরিত্যক্ত প্রায় দুই তিনটা ঘর। একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন একজন বয়স্ক মহিলা। নাম জাহানারা বেগম।

বললাম, চাচি আপনি এখানে কি করেন? উনি বললেন, আমরা এই বাড়ি দেখাশোনা করি। আগে আমার স্বামী মো. সুজন মিয়া ডাকনাম সুধন মিয়া এই বাড়ি দেখাশোনা করত উনি মারা গেছেন ৭/৮ বছর হয়। এখন আমি আর আমার ছেলে রিপন এ বাড়ি দেখাশোনা করি। তখন বললাম রিপন কোথায়? চাচি বললেন সামনে চায়ের দোকানে। আবার গেট ঠেলে বেরিয়ে চার দোকানে গেলাম। তখন রিপন মিয়াকে এক কাপ চা দিতে বলি। চা খেতে খেতে রিপন মিয়ার সঙ্গে গল্প করি।

রিপন মিয়া জানান তাদের গ্রামের বাড়ি মুরাদনগর উপজেলার চালিয়াকান্দি গ্রামে। তারা এ বাড়ি দেখাশোনা করে আর বাড়ির সামনের দিকে রাস্তার পাশের চায়ের দোকান চালায়। তো তাকে বললাম বাড়িটি ঘুড়িয়ে দেখানোর জন্য। রাত হয়ে গেছে। সব ভালোমতো দেখা যাচ্ছে না। তো একটা ঘরে নিয়ে গেল যেটা রিতিমতো বসবাসের অযোগ্য। রিপন মিয়া বলল এটা তার অফিস কক্ষ ছিল। 
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আইনজীবী ছিলেন। এটা তার চেম্বার ছিল। আমি বললাম উনার শোবার ঘরটা দেখতে চাই। রিপন বলল, ওটাতে যাওয়া যাবে না। নোংরা, ময়লা-আবর্জনা। এমনকি সাপও থাকতে পারে। বৃষ্টি হলে এখানে প্রায় হাঁটু পানি হয়ে যায়। বড় কষ্ট লাগল । যে মানুষটা বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য প্রথম দাবি জানাল, দেশের জন্য জীবন দিল, সে মহান ভাষা সৈনিকের বাড়ির এ হাল। বাঙালি হিসেবে লজ্জিত হলাম ভেতরে ভেতরে।

সরকার এ বাড়ি নিয়ে কোনো পরিকল্পনা অর্থাৎ এ অঞ্চলের মানুষের দাবি এ বাড়িটিকে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি যাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নিয়ে এখনো কিছু করছে না কেন। ব্যথিত হলাম। রিপন মিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম এ বাড়িতে মোট জায়গার পরিমাণ ৬ গ-া অর্থাৎ ১২ শতক। আরও জানতে পারলাম শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি অ্যারোমা দত্ত কুমিল্লার সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি।

আরও কষ্ট পেলাম। একজন এমপি হয়েও তিনি তার পূর্বপুরুষ অর্থাৎ দাদুর বাড়িটি নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করছেন না কেন। রিপন মিয়ার কাছ থেকে অ্যারোমা দত্তের মোবাইল নম্বর নিলাম। হোস্টেলে ফিরে ফোন দিলাম, কিন্তু ফোন রিসিভ না করায় কথা বলতে পারলাম না। এ বাড়ির এমন অবস্থার কারণটি কি, না জানা পর্যন্ত স্বস্তি মিলছে না কিছুতেই।

×