ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

কন্যার চোখে বুদ্ধদেব বসু ও কবিতা পত্রিকা

আবু আফজাল সালেহ

প্রকাশিত: ২২:৪০, ১৬ নভেম্বর ২০২৩

কন্যার চোখে বুদ্ধদেব বসু ও কবিতা পত্রিকা

বুদ্ধদেব বসু

বুদ্ধদেবের সাহিত্যচর্চা নিয়ে কন্যা মীনাক্ষী বসু তাঁর ‘স্মৃতিতে চিঠিতে বুদ্ধদেব বসু’ বইয়ে লিখছেন-‘কবিতাভবন’ ছিল বারোমাসের ‘ওপেন হাউস’। বহু রাত অবধি চলত হাসি-গল্প-তর্ক। মতানৈক্য বাবা শুধু সহ্যই করতেন না, স্বাগত জানাতেন। সেটা ছিল তাঁর কাছে উত্তেজক টনিক ও মননের প্রয়োজনীয় ব্যায়াম।’ মীনাক্ষী দত্ত- বুদ্ধদেব বসুর প্রথম কন্যা। নামটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের দেওয়া। তাঁরা তিন ভাইবোন। মীনাক্ষীও সুলেখক-স¤পাদক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও সাংস্কৃতিক-কর্মী। মা প্রতিভা বসুও লেখক ও সাংস্কৃতিক-কর্মী।

বুদ্ধদেব বসুর ১০৪টি চিঠি যা মীনাক্ষীর প্রতি লেখা এবং বাবা হিসেবে বুদ্ধদেব বসুর ওপর ৪টি লেখা নিয়ে তিনি স্মৃতিচারণমূলক একটি বই লিখেছেন-‘স্মৃতিতে চিঠিতে বুদ্ধদেব বসু’। বুদ্ধদেব বসুর ৯৯তম জন্মদিনে স্মৃতিচারণমূলক ‘আমার বাবা বুদ্ধদেব বসু’, আনন্দবাজারের বেশকিছু সংখ্যা (বিশেষ করে বুদ্ধদেব সংখ্যা) থেকে বিভিন্ন তথ্য নিয়ে আজকের আলোচনা এগিয়ে নেব।
কবিতা পত্রিকায় পঞ্চপা-ব কবির কবিতা বেশি ছাপা হত। এরমধ্যে জীবনানন্দ দাশের কবিতা বেশি ছাপা হতো বলে মীনাক্ষী বিভিন্ন সময়ে তাঁর লেখা থেকে জানা যায়। আর কবিতা পত্রিকার সংখ্যাগুলো দেখে এটির প্রমাণও পাওয়া যায়। পঞ্চপা-ব কবির বাইরেও অনেক কবির কবিতাও ছাপা হতো। রবীন্দ্রনাথের কবিতাও। বাংলাদেশের সেসময়ের তারুণ্যের কবি- শামসুর রাহনান ও সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা প্রায়ই ছাপা হতো। আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, হুমায়ন কবির, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবুল হাসান প্রমুখের কবিতা মাঝে মধ্যে ছাপা হতো। কবিতা ছাপা হতো।

প্রগতি পত্রিকা থেকেই জীবনানন্দ দাশকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। অনেক সময় কবিতা পত্রিকায় এক সংখ্যাতেই জীবনানন্দের ৭-৮টি পর্যন্ত কবিতা ছাপা হতো। কিন্তু অন্য পত্রিকাগুলোতে জীবনানন্দের কবিতা কেউ ছাপাতে চাইতেন না!-(আমার বাবা বুদ্ধদেব বসু)। বুদ্ধদেব বসু সমতা ও স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। প্রেরিত কবিতা বারবার এমনকি সংশ্লিষ্ট কবিকে দিয়ে ৭-৮ পর্যন্তও সংশোধন করে ‘কবিতা’ পত্রিকায় ছাপতেন স¤পাদক বুদ্ধদেব বসু। সেসময়ে ‘কবিতা’ পত্রিকায় কবিতা ছাপা না হলে তাকে কবি বলে স্বীকৃতি দেওয়া কঠিন ছিল।
বোলদেয়ার, রিলকে, হেল্ডরনি, ব্লেক, পাস্তারনাক প্রমুখের কবিতার অনুবাদ করেছেন বুদ্ধদেব বসু। পৃথিবীর সমস্ত কবি ও লেখকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইতেন তিনি। ঘুরে বেরিয়েছেন বিভিন্ন দেশে। পড়িয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই সুবাদে বিভিন্ন লেখক ও কবির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। ১৯৫৪ সালে বিবিসি থেকে মার্কিন লেখক হেনরি মিলারকে প্রশ্ন করা হয়, এ বছর (১৯৫৪) আপনার জীবনের সবচেয়ে বিশেষ ঘটনা কি ছিল? তিনি উত্তর দেন, বাঙালি কবি বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে পরিচয়।-(আমার বাবা বুদ্ধদেব বসু)
সৃজনশীল সাহিত্য, সম্পাদনা ও সমালোচনা পাশাপাশি প্রবাহিত। তিনি গদ্যরীতিতে ইংরেজির ওজোগুণ এনেছেন; কবিতায়ও। কবিতা, গল্প, সমালোচনা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণ, শিশুসাহিত্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ করেছেন; লিখেছেন ১৫৬টি গ্রন্থ। তাঁর গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধবিষয়ক বেশকিছু গদ্যগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। উপন্যাস-  সাড়া (১৯৩০), সানন্দা (১৯৩৩), লাল মেঘ (১৯৩৪), পরিক্রমা (১৯৩৮), কালো হাওয়া (১৯৪২), তিথিডোর (১৯৪৯) নির্জন স্বাক্ষর (১৯৫১), রাত ভরে বৃষ্টি (১৯৬৭), গোলাপ কেন কাঁদে (১৯৬৮) প্রভৃতি। গল্প- রজনী হলো উতলা (১৯২৬), রেখাচিত্র (১৯৩১), হাওয়া বদল (১৯৪৩), প্রেমপত্র (১৯৭২) উল্লেখযোগ্য। প্রবন্ধ-হঠাৎ-আলোর ঝলকানি (১৯৩৫), কালের পুতুল (১৯৪৬), সাহিত্যচর্চা (১৯৬১), রবীন্দ্রনাথ : কথাসাহিত্য (১৯৫৫), আমার ছেলেবেলা (স্মৃতিকথা, ১৯৭৩), আমার যৌবন (স্মৃতিকথা, ১৯৭৩), সব পেয়েছির দেশে (ভ্রমণ, ১৯৪১), উত্তর তিরিশ(১৯৪৫), জাপানি জার্নাল) ভ্রমণ,১৯৬২),  দেশান্তর (ভ্রমণ, ১৯৬৬), কবিতার শত্রুও মিত্র(১৯৭৪) উল্লেখযোগ্য। নাটকগ্রন্থ হচ্ছেÑ মায়া-মালঞ্চ(১৯৪৪), তপস্বী ও তরঙ্গিণী (১৯৬৬)। উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থগুলো হচ্ছে- মর্মবাণী (১৯২৫), পৃথিবীর পথে (১৯৩৩), কঙ্কাবতী (১৯৩৭), দময়ন্তী (১৯৪৩), দৌপদীর শাড়ি (১৯৪৮), শ্রেষ্ঠ কবিত (১৯৫৩),  যে আঁধার আলোর অধিক (১৯৫৮), মরচেপড়া পেরেকের গান (১৯৬৬), একদিন চিরবিদায় (১৯৭১) প্রভৃতি। বুদ্ধদেব বসু অনুবাদেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর অনূদিত গ্রন্থগুলো হচ্ছেÑ কালিদাসের মেঘদূত (১৯৫৭), গহীন বালুচর (১৯৫৮), বোদলেয়ার : তার কবিতা (১৯৭০), হেল্ডালিনের কবিতা (১৯৬৭), রাইনের মারিয়া রিলকের কবিতা (১৯৭০)। সম্পাদনা করেছেন আধুনিক বাংলা কবিতা (১৯৬৩)।
রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিচিত্রমুখী স্রষ্টার নাম বুদ্ধদেব বসু। তাঁর মূল পরিচিতি কবি হিসেবেই। কবিতার পাশাপাশি ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, ভ্রমণকাহিনী, শিশুসাহিত্য, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা লিখেছেন। এসবে তিনি সফল ছিলেন। সমালোচনা সাহিত্যকে তিনি নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। শুধু কবিতা নিয়েই অনেক গবেষণা করেছেন। বাংলা কবি ও কবিতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন আধুনিক কবিকুলের শেষ্ঠতর প্রতিনিধি। সমালোচক সুকুমার সেন বলেন, ‘তাঁর (বুদ্ধদেব বসু) লক্ষ্য ছিল আধুনিক কবিতার স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং আধুনিক কবিতা লেখকদের পক্ষ সমর্থন করা’। আবার মেয়ের চোখেও তিনি সেরাব্যক্তিত্ব। 

×