ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

কবতিা

প্রকাশিত: ২১:৩১, ১ জুন ২০২৩

কবতিা

-

লালন হাসে শূন্যে বসে

সৌরভ জাহাঙ্গীর

‘উঞ্চা উঞ্চা পাবত ধরে’ খালি পায়ে হাঁটছো যখন হে কাহ্নপা
কাঞ্চি মুখে তোমার কি আর কীর্তন সাজে হরে কৃষ্ণের?
এক যুগ পর হঠাৎ করে লোকাল ট্রেনে এলে যখন রাধানগর
কী আর করা খানিক বসে গতর ভিজাও মাতম দেখে রাধা-কৃষ্ণের
 
অচিন পাড়ে লালন হাসে শূন্যে বসে।
 
এক দশকের শ্রেষ্ঠ ভেবে নিজকে নিয়ে
বেশ তো আছো
তিন দশকের গর্তে পড়ে ভাঙবে যে পা
হেলিপ্টার।
 
এ যুগের পর আসবে না আর
এ যুগ থাকবে সব দশকে
বিদ্যাপতি কানে কানে কহে বাহে
হায়! কাহ্নকে বলে দে না
লোকাল ট্রেনের জায়গা নেই আর রাধানগর
জেট বোমারু ঘুরে ফিরে
উড়ে বেড়ায়।


** অণুর ভিতর পরমাণু

মেহরাব রহমান

অন্ধকার......................
মন্দ বাতাস.........................
বন্ধ খিড়কিতে কে কড়া নাড়ে?
কী করুণ ভিজছি ভেজা বর্ষায়; চিমনির
কালো ধোঁয়ায়
ভাঙা ভাঙা ভঙ্গুর গান বাজে। 
ভোরের যমুনায়
ছেঁড়াপাল বিপন্ন নৌকো; ডুবন্ত
মাঝির শেষ ক্রন্দন।

এরপর পূর্ণিমার পূর্ণ প্লাবনে
হয়তো আনন্দ ঝঙ্কার; সুখং সুন্দরম
বাজনা বাজে।
রহে না—- থাকে না কিছুই এইসব।
উত্তর রমণীর জমার খাতায়,
উত্তর পুরুষের বুক পকেটে
থেকে যায় কিছু কিছু
জলরং জলছবি।


** জব্বারের বলীখেলা

আজহার মাহমুদ

বলীখেলা বিশেষ ধরনের কুস্তি খেলা। এই খেলায় অংশগ্রহণকারীদের বলা হয় বলী। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কুস্তি ‘বলীখেলা’ নামে পরিচিত। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে প্রতিবছরের ১২ বৈশাখে অনুষ্ঠিত হয় জব্বারের বলী খেলা। ১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এই প্রতিযোগিতার সূচনা করেন। তার মৃত্যুর পর এই প্রতিযোগিতা জব্বারের বলী খেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। জব্বারের বলীখেলা একটি জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যম-িত প্রতিযোগিতা হিসেবে বিবেচিত। বলীখেলাকে কেন্দ্র করে লালদীঘি ময়দানের আশপাশে প্রায় তিন কিলোমিটার জুড়ে বৈশাখী মেলার আয়োজন হয়। এটি বৃহত্তর চট্টগ্রাম এলাকার সবচেয়ে বৃহৎ বৈশাখী মেলা।
ভারতবর্ষের স্বাধীন নবাব টিপু সুলতানের পতনের পর এই দেশে ব্রিটিশ শাসন শুরু হয়। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ এবং একইসঙ্গে বাঙালি যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের মনোবল বাড়ানোর উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের বদরপতি এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর বলীখেলা বা কুস্তি প্রতিযোগিতার প্রবর্তন করেন। ১৯০৯ সালের ১২ বৈশাখ নিজ নামে লালদীঘির মাঠে এই বলীখেলার সূচনা করেন তিনি। ব্যতিক্রমধর্মী ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য ব্রিটিশ সরকার আবদুল জব্বার মিয়াকে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকেও নামিদামি বলীরা এ খেলায় অংশ নিতেন।
চট্টগ্রামের মুরব্বিদের ভাষ্য, চট্টগ্রাম বলীর দেশ। কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীর মধ্যবর্তী স্থানের উনিশটি গ্রামে মল্ল উপাধিধারী মানুষের বসবাস ছিল। প্রচ- দৈহিক শক্তির অধিকারী মল্লরা সুঠামদেহী সাহসী পুরুষ এবং তাদের বংশানুক্রমিক পেশা হচ্ছে শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন। এই মল্লবীরেরাই ছিলেন বলীখেলার প্রধান আকর্ষণ ও বলীখেলা আয়োজনের মূল প্রেরণা। কিন্তু এখন পেশাদার বলির (কুস্তিগীর) অভাবে বলীখেলার আকর্ষণ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে পেশাদার বলী পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এখন আর কেউ বলী কিংবা কুস্তি খেলতে আগ্রহ দেখায় না। আগে গ্রামে গ্রামে এমন কুস্তি আর বলী খেলা হতো। আজ সেই দৃশ্য প্রায় কল্পনার পর্যায়ে চলে গেছে। তাই এই বিষয়টা আমাদের সকলের ভাবতে হবে। এখন থেকে তরুণ প্রজন্মকে এ খেলার প্রতি আগ্রহী করতে হবে। যেন এই ঐতিহ্য কখনও হারিয়ে না যায়।
বিগত দুই বছর করোনার কারণে এই বলীখেলা বন্ধ ছিল। এই বলীখেলাকে কেন্দ্র করে যে মেলা গড়ে ওঠে সেটাও বন্ধ ছিল গত দু’বছর। এবছর জব্বারের বলীখেলার ১১৪তম আসর অনুষ্ঠিত হবে। দু’বছর পর ঐতিহ্যের এই আসর ফিরে এসেছে এটাতেই চট্টগ্রামের তথা সারাদেশের মানুষ খুশি। বাংলাদেশের নানা জায়গা থেকে ছুটে আসে এই বলীখেলা দেখতে। সেই সঙ্গে এই বলীখেলাকে কেন্দ্র করে যে মেলা হয়, সেখানেও ফুঠে ওঠে বাঙালিয়ানার মুনসিয়ানা। বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, কালচার বাঁচিয়ে রাখার জন্য এই মেলাটিও চমৎকার একটি উদাহরণ। 
তাই অনেকে বলীখেলার পরিবর্তে একে বৈশাখী মেলা হিসেবেও চিনে। জব্বার মিয়ার বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অহঙ্কারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় লোকজ উৎসব হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করা হয়। খেলাকে কেন্দ্র করে তিন দিনের আনুষ্ঠানিক মেলা বসার কথা থাকলেও কার্যত পাঁচ-ছয় দিনের মেলা বসে লালদীঘির ময়দানের আশপাশের এলাকা ঘিরে। 
জব্বারের বলীখেলার পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে যেমন কক্সবাজারে ডিসি সাহেবের বলীখেলা, সাতকানিয়ায় মক্কার বলীখেলা, আনোয়ারায় সরকারের বলীখেলা, রাউজানে দোস্ত মোহাম্মদের বলীখেলা, হাটহাজারীতে চুরখাঁর বলীখেলা, চান্দগাঁওতে মৌলভীর বলীখেলা এখনও কোনো রকমে বিদ্যমান। তবে জব্বারের বলীখেলা বর্তমানে বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেল ‘চ্যানেল আই’তে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়ে থাকে। কয়েক বছর ধরে সিআরবির শিরীষ তলায় অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে সাহাবউদ্দিনের বলীখেলা। এটি অবশ্য পহেলা বৈশাখকে ঘিরে আয়োজন করা হয়ে থাকে। 
জব্বারের বলীখেলার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন জীবন বলী। জব্বারের বলীখেলায় এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ চ্যাম্পিয়ন দিদার বলী। তিনি সর্বোচ্চ ১৩ বার বিজয়ী হয়েছেন। বর্তমানে দিদার বলী এ খেলা থেকে অবসরে আছেন। বলীখেলা যারা নিয়মিত দেখতে আসেন, তাদেরই একজন জানান, যাকে তাকে সুযোগ না দিয়ে প্রকৃত বলীদের খেলায় সুযোগ দেওয়া উচিত। এতে করে এ খেলার মান এবং দর্শক দুটোই বেঁচে থাকবে। আশা করি, এ সকল বিষয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে আসবে।
পরিশেষে বলতে চাই, জব্বারের বলীখেলা আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, কালচার বাঁচিয়ে রাখার অনন্য নিদর্শন। প্রশাসনের উচিত এই নিদর্শনটি বাঁচিয়ে রাখতে সবধরনের সহযোগিতা করা। 

×