ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০

৫২তম বার্ষিকীতে ফিরে দেখা

বাঙালির জাতিরাষ্ট্র পেল প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

মোরসালিন মিজান

প্রকাশিত: ০০:১৫, ৬ ডিসেম্বর ২০২৩; আপডেট: ০০:০৬, ৭ ডিসেম্বর ২০২৩

বাঙালির জাতিরাষ্ট্র পেল প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

সাপ্তাহিক জয়বাংলা পত্রিকায় বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতি দানের খবর

একাত্তরে ঘোর দুর্দিন নেমে এসেছিল বাঙালির জীবনে। পাকিস্তানিরা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছিল। ধর্ষণ করছিল। গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছিল। এভাবে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল বাংলাদেশ। পরাশক্তি আমেরিকা এবং এই দেশটি দ্বারা প্রভাবিত বহু দেশ বর্বর গণহত্যাকে প্রকাশ্যে বা আড়ালে সমর্থন দিয়ে গেছে। আরব বিশ্ব আবার ইসলাম রক্ষার নামে বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছে।

মানুষ হত্যা বা নারী ধর্ষণের মতো ঘটনাকে অবলীলায় সমর্থন দিয়ে গেছে তারা। কিন্তু একই বাস্তবতায় বিরল ইতিহাস রচনা করেছিল ভারত। প্রতিবেশী দেশটি মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শুরু থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল। সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার পাশাপাশি ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর, মানে, আজকের দিনে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল ভারত। এত এত রক্তচক্ষু উপক্ষো করে দৃঢ়চিত্তে এই স্বীকৃতিদানের কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন একাত্তরের শ্রেষ্ঠ সুহৃদ শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। তার এই ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধকে সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল।

বাংলাদেশ যে অনিবার্য, বাঙালির রাষ্ট্র য়ে দাঁড়িয়ে গেছে, একে যে মেনে নিতেই হবে- পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল ভারত। তার পরের ইতিহাস কারও অজানা নয়। মাত্র ক’দিন পর ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদারদের বিতাড়িত করে বাংলাদেশে লাল-সবুজের পাতাকা উড়িয়েছিল বাঙালি। ঐতিহাসিক সেই স্বীকৃতির ৫২তম বার্ষিকী আজ। আজকের দিনে কৃতজ্ঞ বাঙালি সেই ইতিহাসের কাছে ফিরে যাবে। নতুন করে আবিষ্কার করবে বন্ধুতার শক্তি।

ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখা যায়, ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে লোকসভার অধিবেশনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। এ সময় লোকসভার সদস্যরা দাঁড়িয়ে এই ঘোষণাকে স্বাগত জানান। এ সময় অধিবেশনে ‘জয় বাংলা’ স্লোাগানও দেওয়া হয়। বক্তব্যে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, বাংলাদেশের জনগণ পাকিস্তানি  স্বৈরতান্ত্রিক ও গণহত্যা, নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। বাংলাদেশের নতুন সরকার ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ হিসেবে অভিহিত হবে। এ সময় বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও তাদের অন্যান্য সহকর্মীকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান তিনি।’
বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদও এক তারবার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান। সৈয়দ নজরুল ইসলাম তার তারবার্তায় বলেন, বাংলাদেশের জনগণ ও বাংলাদেশ সরকার ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও অভিবাদন জানাচ্ছে।

তার এই বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত আমাদের বিজয়ের পথে অনেকখানি পথ ধাবিত করল। ভারত সরকার বাংলাদেশের ন্যায়সঙ্গত মুক্তি সংগ্রামে সমর্থন করায় ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে বন্ধুত্ব শান্তি ও সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচিত হলো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে, বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের ঘটনায় এক রকম দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তানিরা। পাঁচ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে পাকিস্তান সরকার ভারতের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। ঘোষণাটি দিয়ে পাকিস্তান সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, পূর্ব পাকিস্তানকে ভারতের স্বীকৃতির কারণে আমরা ভারতের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করছি। এই সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের সনদের নীতি বিরুদ্ধ। জাতিসংঘে শীঘ্রই পাকিস্তান এই বিষয়টি উত্থাপন করবে।
তবে এসব হুমকি-ধমকিতে কাজ হয় না। একই দিন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় আরেক বন্ধুরাষ্ট্র ভুটান। ইন্দিরা গান্ধী জানিয়ে দেন আরও অনেক দেশ অচিরেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে। হয়েছিলও তাই। সে লক্ষ্যে আগে থেকেই বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনের কাজ করছিলেন ইন্দিরা গান্ধী।

এদিকে, মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়ছিল। দুই দেশের যৌথ কমা-ের কাছে নাস্তানাবুদ হচ্ছিল হানাদার বাহিনী। একের পর এক অঞ্চল শত্রুমুক্ত হচ্ছিল। যৌথ বাহিনী অগ্রসর হচ্ছিল ঢাকার দিকে। পরাজয় আঁচ করে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব করে পাকিস্তান। আমেরিকাও ভয় দেখাতে সপ্তম নৌবহর নিয়ে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। কিন্তু কিছুই আর কাজ করে না। আমেরিকার সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে সক্ষম হয় ভারত।

ফলে অনিবার্য হয়ে যায় পাকিস্তানের পরাজয়। নয় মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রথম বাঙালি জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। ভারতের দেখানো পথে পরে আরও বহু দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী আমেরিকাও মেনে নেয় সত্যকে, সত্যটির নাম বাংলাদেশ।

×