ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

শীতের পিঠা

উৎসব-আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া ফেরিওয়ালা দম্পতির কথা-

মাহমুদুল আলম নয়ন

প্রকাশিত: ২২:৪৩, ৩ ডিসেম্বর ২০২৩

উৎসব-আনন্দ ছড়িয়ে  দেওয়া ফেরিওয়ালা  দম্পতির কথা-

বগুড়ায় পিঠাপুলির দোকানে শীতের পিঠা তৈরির ধুম পড়েছে

শীত এখনো জেঁকে না বসলেও কুয়াশার  ঢেউ চারদিকে।  ভোরের শিশিরে শীতের আবহ এখন সবখানে। বিশেষ করে দেশের উত্তরে। ঋতু পরিক্রমায় এখন শীতের আমেজ। নবান্নের পর নতুন ধানের মায়া জড়ানো গন্ধ গ্রামের পর গ্রামজুড়ে।

মেঘের মতো হঠাৎ করেই ঘন কুয়াশা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ফসলের ক্ষেত, ঘাসের ডগা আর পাতার কোণে ভরে থাকা শিশিরে ঠিকরে পড়া সকালের সোনালি রোদ্দুর এক মোহনীয় আবেশে ডাক দিয়ে যায়। সকালে শিশিরভেজা ঘাস মেঠোপথ। প্রকৃতির এমন অপার সৌন্দর্যে সাড়া দিতে কার না মন চায়। শহুরে জীবনযাত্রায় এমন দৃশ্য কল্পনায় থাকলেও শীতের আবহের সঙ্গে পিঠার আয়োজন শুধু এখন গ্রামাঞ্চলেই নয় শহরেও কমতি নেই। শীতের পিঠা নিয়ে কত কথা আর কবিতা, গান। বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ শীতের পিঠা নিয়ে নানা আয়োজন আর পিঠা খাওয়ার ধুম নিয়ে উৎসবের আমেজ।

কারো কাছে পিঠা এক উৎসবের উপলক্ষ হলেও শহর জীবনে শীতের পিঠা কিছু মানুষের নিকট উপার্জনের বাড়তি পথ হিসাবে আশার আলো হয়ে ওঠে। হোক না তা মৌসুমি। শহরের বিভিন্ন এলাকায় এখন পিঠার পসরা চোখে পড়লেও বগুড়ার খান্দার এলাকার ইদ্রিস বেপারি-বেগুনি বেগম দম্পতি শীতের পিঠা খাওয়ার আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার উৎসবের ফেরিওয়ালা হয়ে উঠছেন। ঘরে ঘরে শীতের রকমারি পিঠা পৌঁছে দেওয়া এক নিভৃতচারী দম্পতি। অথচ বসেন ফুটপাতের দোকানে। শীতের পিঠা মুখে দেওয়ার আগ্রহ আছে কিন্তু পিঠা তৈরির হ্যাপা সামলানোর সাধ্য নেই। তবে কোনো চিন্তা নেই, ইদ্রিস-বেগুনি দম্পতি সব মুশকিল আসান করে দিতে তৈরি। মোবাইলে পিঠার নাম বলে লোক পাঠিয়ে চাহিদা পাঠালেই পৌঁছে যাবে বাড়িতে। কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় তাদের পিঠার দোকান প্রকৃতির ছায়ায় পিঠা তৈরির ভিন্ন মাত্রার আবেদন এনে দেয়।

শীত মৌসুম এলেই শহরের বিভিন্ন ফুটপাত বা মোড়ে শেষ বিকেল থেকে পিঠার দোকান চোখে পড়লেও বগুড়ার খান্দার এলাকায় ইদ্রিস-বেগুনি দম্পতির পিঠা বিক্রির আয়োজন ভিন্ন, চোখে পড়ার মতো। বিকেল থেকে ভিড় পড়ে যায় তার দোকানে। কী পিঠা চাই- কুলিপিঠা, তেলপিঠা, ভাঁপাপিঠা, চিতইপিঠা, ঝালপিঠা, ডিম দিয়ে ঝাল-মিঠাসহ রকমারি পিঠার কমতি নেই। তবে নকশি পাটিসাপটা পিঠা এখন আর করেন না। কারণ- কুলি, চিতই ঝালপিঠা তৈরি সরবরাহ করতেই কুলে উঠতে পারেন না। তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে সব বয়সীর ভিড় ইদ্রিস দম্পতির পিঠার দোকানে। গাছের নিচে রাস্তা থেকে একটু সরে এসেই পিঠার দোকান। এর চারদিকে পিঠা দিয়ে রসনার তৃপ্তি মেটাতে আসা লোকজনের বসার বেঞ্চ। মাঝে চুলার সারি। একেক চুলায় চলছে এককে ধরনের পিঠা ভাজা। শীতের আমেজে রকমারি পিঠার আয়োজনে অনেকে ছোটবেলার স্মৃতি কাতরতায় ডুবে যান। বাড়িতে পিঠা ভাজতে মাসহ পরিবারের মহিলা মহলে সে কি আয়োজন। এখন শহর এলাকার বাড়িতে তেমন আয়োজন চোখে পড়বে না। শীতের সকালের কাঁচা রোদে পিঠা খাওয়ার সেই স্বর্ণালি দিন ফিরে আসে না ঠিকই। তবে শেষ বিকেলের আলো-ছায়ায় বগুড়া শহরের ফুটপাতের পাশে জীবন সংগ্রামের তাগিদের সঙ্গে হাসিমুখে অন্যের মুখে আনন্দ ছড়াতে রকমারি পিঠা নিয়ে বসেন ইদ্রিস-বেগুনি দম্পতি।

প্রায় ২৮ বছর আগে ইদ্রিস-বেগুনি দম্পতির পিঠার ফেরি শুরু। তখন সংসার কেবল শুরু, তেমন পিছুটান নেই। শুরুতে অবশ্য তাদের পিঠার পসরা জমেনি। প্রতিদিন বিক্রি হতো থেকে দেড়শটাকার পিঠা। তাদের পিঠা-পুলি তৈরির দোকানে তখন হাতেগোনা কিছু ক্রেতা ছিল। স্টেডিয়ামে (পূর্বের) প্রবেশমুখে এক চুলার ছোট্ট দোকান দিয়ে তাদের শীতের পিঠা বিকিকিনি ব্যবসা শুরু হয়েছিল। কার্তিক মাসের শুরু থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত চলে তাদের এই দোকান। বছরের বাকি সময় অন্য ব্যবসা করেন ইদ্রিস তার ছেলে। ইটপাথরের দালানের মাঝে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম উপকরণ শীতের পিঠা-পুলির পসরা নিয়ে ইদ্রিস দম্পতি বসতেন। পিঠা ভাজতেন একটি চুলায়। তাদের পিঠার পরিচিতি বেড়ে যাওয়ায় দোকানের স্থান পরিধি বাড়ানো হলেও ফুটপাতই রয়ে গেছে তাদের পিঠার আয়োজন। তবে এখন আর এক চুলাতে পিঠা ভেজে সামলাতে পারেন না। তাদের দোকানে বসেছে ৭টি চুলা। একেক চুলার কড়াইয়ে বিরামহীন ভাজা চলছে একেক ধরনের পিঠা।

আগে ইদ্রিস দম্পতি নিজেরাই সব কিছু করতেন। এখন সব মিলিয়ে ১১ জন ফুটপাতের এই পিঠার দোকানে কাজ করছেন। এক অংশ বাড়িতে পিঠার সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন। আর ইদ্রিস-বেগুনি দম্পতি অন্যদের নিয়ে পিঠা  তৈরি করে খদ্দের সামলান। প্রতিদিন বিক্রি করেন ১০/১৫ হাজার টাকার পিঠা। এখানে শুধু ক্রেতারা পিঠা খেতেই আসেন না। যাওয়ার সময় পিঠা নিয়ে যান বাড়িতে সাধ্যমতো। বেগুনি বেগম জানান, কারো বাড়িতে এই সময় জামাইসহ আত্মীয়কে শীতের পিঠা খাওয়াতে চাইলে সেই বাড়ির গৃহকর্তা ফোনে অথবা লোক পাঠিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে এসে কাক্সিক্ষত পিঠা নিয়ে যান। জামাই বা অত্মীয়ের মুখে শীতের পিঠার স্বাদ দিতে ইদ্রিস-বেগুনি দম্পতির পিঠা-পুলির পসরায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা চিতই পিঠা। অন্য পিঠা বাড়িতে ভাজা অনেকটা সহজ হলেও চিতই বা দুধপিঠার হ্যাপা অনেক। তাই ইদ্রিসের দোকান থেকে এই চিতই পিঠা কিনে নিয়ে বাড়িতে শুধু দুধে ভিজিয়ে দুধপিঠা তৈরির শর্টকাট পদ্ধতি বের করে নিয়েছেন অনেকে। এজন্য চিতই পিঠার পার্সেল বেশি হয় বলে জানালেন ইদ্রিস। তবে ২৮ বছর আগে ইদ্রিস দম্পতি পিঠার প্রথম দোকান দেওয়ার সময় যেভাবে নিজেরাই পিঠা তৈরি করতেন, এখন একইভাবে তারা নিজ হাতে পিঠা তৈরি করে শীতের পিঠার স্বাদ ছড়িয়ে দিচ্ছেন প্রতিদিন শত শত মানুষের মাঝে।

শহরের কাটনারপাড়ার ব্যবসায়ী আবু সাইদ বন্ধু কামরুলের সঙ্গে এসেছিলেন ইদ্রিস-বেগুনি  দম্পতির হাতের পিঠা খেতে। কামরুল একাধিকবার পিঠার দোকানে এলেও সাইদ এসেছেন প্রথম। বাড়িতে মেয়েজামাই বেড়াতে এসেছে। তাই তিনি মেয়েজামাইকে দুধপিঠা খাওয়াবেন বলে চিতইপিঠা নিয়েছেন। বাড়িতে স্ত্রী সে পিঠা দুধে ভিজিয়ে মেয়েজামাইকে খাওয়াবেন। রকমভাবে স্বজনদের জন্য পিঠা প্রতিদিন কয়েকশপিঠাপ্রেমী তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসা স্বজনদের শীতের পিঠার স্বাদ মুখে তুলে দিতে ছুটে যান ইদ্রিস-বেগুনি দম্পতির দোকানে।

×