ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১

হারিয়ে যাচ্ছে নদীর মাছ

তিস্তায় বৈরালি, যমুনায় শৈরালি, রংপুরে পরিচয় রুপালি

তাহমিন হক ববী

প্রকাশিত: ২২:০০, ১ অক্টোবর ২০২৩

তিস্তায় বৈরালি, যমুনায়  শৈরালি, রংপুরে  পরিচয় রুপালি

নীলফামারীতে তিস্তা অববাহিকার ডালিয়ায় ঐতিহ্যবাহী রুপালি মাছ বৈরালি নদী থেকে ধরে কেনাবেচা করতে দেখা যায়

বৈরালি মাছ রংপুর অঞ্চলে রুপালি মাছ হিসেবে পরিচিত। তিস্তা নদীর অববাহিকার জেলা নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর গাইবান্ধায় পাওয়া যায় মাছ। এক সময় বৈরালি মাছ দিয়ে অঞ্চলে মাছের চাহিদা অনেকটাই মিটত। তবে বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে উত্তরের ঐতিহ্য সুস্বাদু এই মাছটি। তবে ইলিশ মাছ রক্ষা প্রজনন বৃদ্ধিতে সরকারি উদ্যোগ থাকলেও বৈরালি মাছ রক্ষা প্রজনন বৃদ্ধিতে এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাস জেলেরা বৈরালি মাছের পোনা শিকার থেকে বিরত থাকলে মাছ রক্ষা প্রজনন বাড়ানো সম্ভব। সেই সঙ্গে অন্যান্য মাছের প্রজননও বৃদ্ধি পেত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ঐতিহ্যের রুপালি মাছটিকে তিন নামে ডাকা হয়। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তায় বৈরালি, যমুনা নদী এলাকায় শৈরালি এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি-কোচবিহার দার্জিলিং জেলায় বোরালি। তবে মাছের বৈজ্ঞানিক নাম-বারিলিয়াস বারিলা।

ঐতিহ্যের  মাছটির প্রধান উৎস হলো পাহাড়ি নদী তিস্তা। অর্থাৎ পাহাড় বেয়ে নেমে আসা নদী তিস্তা দিয়ে এই মাছ বহমান। তিস্তার ধারা নামায় ব্রহ্মপুত্র হয়ে যমুনা নদীতেও এই মাছ মেলে। তিস্তা নদী বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। এটি ভারতের সিকিম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তরবঙ্গ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি নদী। তিস্তা সিকিম জলপাইগুড়ির প্রধান নদী। একে সিকিম উত্তরবঙ্গের জীবনরেখাও বলা হয়। সিকিম পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর বাংলাদেশে প্রবেশ করে নীলফামারীর কালীগঞ্জ দিয়ে। এরপর তিস্তা ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এরপর যমুনা। প্রকৃতপক্ষে সিকিম হিমালয়ের ,২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চিতামু হ্রদ থেকে তিস্তা নদীটি সৃষ্টি হয়েছে। এটি দার্জিলিং জেলায় সেভক গোলা নামে পরিচিত একটি গিরিসংকটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে তিস্তা একটি পাহাড়ি বন্য নদী এবং এর উপত্যকা ঘনবনে আচ্ছাদিত। পার্বত্য এলাকায় এর নিষ্কাশন এলাকার পরিমাণ মাত্র ১২,৫০০ বর্গ কিলোমিটার। পার্বত্য এলাকা থেকে প্রথমে প্রবাহটি দার্জিলিং সমভূমিতে নেমে এসেছে। তাই তিস্তা নদীকে বৈরালি মাছের উৎস বলা হয়।

বাংলাদেশে কেবল উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর  কুড়িগ্রাম যমুনায় এই মাছ পাওয়া যায়। মাছ সর্বোচ্চ ছয়-সাত ইঞ্চি বা ১০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং প্রস্থে প্রায় এক ইঞ্চি আকারের হয়ে থাকে। রুপালি রঙের মাছটির গায়ে ছোট ছোট আঁশ, পিঠের রং হালকা মেটে। পেটের নিচে হলুদ দাগ থাকে। মাছটির পুঁটি মাছের মতো কাঁটা থাকলেও তা খুবই নরম। বৈরালি মাছ গ্রীষ্মকালে বংশ বিস্তার করে থাকে। এই মাছটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনেকটা ইলিশ মাছের মতোই। তীব্র স্রোতে উজান থেকে ভাটির দিকে ছুটে চলে। দিনের বেলা গভীর পানিতে সরে গেলেও সাধারণত বিকেল থেকে রাত ভোর-সকালের দিকে মাছটি নদীর কিনারের দিকে পানির ওপরের স্তরে ঝাঁক বেঁধে চলে আসে। জেলেরা ছোট ছোট চটকা জাল (হাতে টানা জাল) দিয়ে বৈরালি শিকারও করেন। জেলেরা জানিয়েছেন, ইলিশ মাছের মতোই বৈরালি মাছ জালে ধরার পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যায়। আবার দ্রুত বরফ দিতে না পারলে বেশিক্ষণ সংরক্ষণও করা যায় না। মাছটি টাটকা অবস্থায় রান্না করে খেলে অনেক স্বাদ।

এদিকে বর্তমানে সৈয়দপুর স্বাদু পানি উপকেন্দ্রে মাছটির বংশ বিস্তার এবং পুকুরে চাষযোগ্য কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। জেলেরা জানায়, তিস্তায় যখন উজানের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, ঠিক তখন ঝাঁকে ঝাঁকে বৈরালি জেলের জালে ধরা পড়ে। পানি প্রবাহ কমে গেলে আশানুরূপ মাছ মেলে না। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তাও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।

তিস্তাপাড়ের জেলেরা বলছেন, উজানে একাধিক জায়গায় বাঁধ দেওয়ার ফলে তিস্তায় মাছের আকাল হচ্ছে। ছাড়া মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার কীটনাশকের ব্যবহার, কারেন্ট জাল দিয়ে পোনা শিকারসহ অভয়াশ্রম থেকে মা মাছ শিকারের ফলে কমে যাচ্ছে বৈরালি মাছ। একই কারণে নদীর দেশি প্রজাতি অন্য মাছের সংখ্যাও কমে গেছে। হারিয়ে গেছে শুশুক, ঘড়িয়াল, মিঠা পানির কচ্ছপসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী। তিস্তাপাড়ের জেলে কাল্টা মিয়া বলেন, আগের মতো আর মাছ পাওয়া যায় না। প্রতি বছর তিস্তা শুকিয়ে যাওয়ার কারণে মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। বর্ষার সময় উজান থেকে পানি এলে মাঝে মাঝে ঝাঁকে ঝাঁকে বৈরালি ধরা পড়ে। পানি কমে গেলে মাছ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কয়েকবার জাল টেনেও আশানুরূপ মাছ উঠছে না। দুইজন মিলে সারাদিন বিভিন্ন জাতের দুই কেজি মাছ পাওয়া যায়। সেই মাছ ৫০০ বা ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে চাল, ডাল, তেল কিনে পকেটে টাকা থাকে না। অন্য কাজও পারি না। তাই বাধ্য হয়ে মাছ ধরার অপেক্ষায় বসে থাকি। তিস্তাপাড়ের জেলে কদম আলী বলেন, গত বছর তিস্তায় বৈরালির পাশাপাশি নদীতে ইলিশ মাছ ধরেছি। বছর ইলিশ পাওয়া যায়নি। বর্তমানে একটু করে বৈরালি ধরা পড়ছে, তা বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। বৈরালি মাছের চাহিদা থাকলেও নদীতে আর তেমন একটা মিলছে না।

তিস্তাপাড়ের মাছ ব্যবসায়ী নূর হোসেন বলেন, প্রতিদিন মাছ কিনে বাজারে বিক্রি করি। এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। খুব কঠিন অবস্থায় আছি। এই তিস্তায় এক সময় বিভিন্ন জাতের মাছ পাওয়া যেত। দিন দিন তিস্তা থেকে বৈরালি, ঘাঁঘসি, দাড়াগিং, ঘোল, খট্টি, ভাগনা, বাইম, বোয়াল, আইড় হারিয়ে গেছে। দেশীয় মাছ আর চোখে দেখা যায় না। এতে আমাদের ব্যবসাও কমে গেছে। তিস্তাপাড়ের মৎস্যজীবী কমিটির সদস্য ভুট্টু মিয়া বলেন, বর্তমানে তিস্তায় পানি আছে, তাই বৈরালি মাছ ধরছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় কিছু জেলে ব্যাটারির সাহায্যে কারেন্ট তৈরি করে মাছ নিধন করছে। এতে বড় মাছটি ধরা পড়লেও ছোট পোনা একেবারেই নিধন হচ্ছে। তাই প্রশাসনের কাছে আবেদন, মাছ নিধনে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিন। ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে জোড়গাছ মাঝিপাড়া গ্রামের জেলে প্রফুল চন্দ্র বলেন, ‘ছয়-সাত বছর আগেও তারা কারেন্ট নেট দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মাছ ধরতেন না। স্থানীয় কিছু মৌসুমি মাছ শিকারি এই জালের ব্যবহার শুরু করলে তারাও বাধ্য হয়ে এই জাল ব্যবহার করছেন। আমরাও জানি, এক পোয়া (২৫০ গ্রাম) বৈরালি পোনা প্রায় এক মণ মাছের সমান। কিন্তু জীবন জীবিকার জন্য বাধ্য হয়েই বৈরালি পোনা ধরছি।

অপরদিকে পরিবেশের বিপর্যয় যমুনা নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে জামালপুর অংশের যমুনা নদীতে শৈরালী মাছ এখন বিলুপ্তির পথে। এককালে যমুনা নদীর এই মাছ যমুনার একমাত্র সুস্বাদু মাছ ছিল, যা বৈরালি বা স্থানীয় ভাষায় শৈরালি নামেই পরিচিত। বিপন্ন তালিকায় এই মাছের নাম এসেছে।

যমুনা নদীর মাছ শিকারি মাদারগঞ্জের দুলালসহ আন্য জেলেরা জানান, আগে যমুনায় বন্যায় নতুন পানি এলে ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট ছোট শৈরালি মাছ পাওয়া যেত। এই মাছের ক্রেতাও ছিল প্রচুর। শীত মৌসুমে মাছগুলো একটু বড় শরীরে তেল জমে গেলে এই মাছ খুবই সুস্বাদু হতো। কারণে এই মাছ ছিল এলাকায় প্রসিদ্ধ। অতিথি আপ্যায়নে ছিল এই মাছের ব্যাপক চাহিদা। বর্তমানে এই মাছ পাওয়াই কষ্টকর। তিনি জানান, বিগত কয়েক বছর ধরে যমুনা নদীতে জাল ফেলে এই মাছ পাওয়াই যাচ্ছে না। মাদারগঞ্জ উপজেলার প্রধান বাজার বালিজুড়ি মাছের আডতদার সোবাহান মিয়া জানান, এই শৈরালি মাছ এখন পাওয়াই দুষ্কর। যদি পাওয়া যায় তা এক হাজার থেকে ১২শটাকা কেজি বিক্রি হয়। অনেকে এই মাছ পাওয়ার জন্য অগ্রিম বুকিং দিয়ে থাকে।

বৈরালি মাছ কমে যাওয়ার তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছে মৎস্য বিভাগ। সেগুলো হলোÑ মাত্রারিক্ত রাসায়নিক সার কীটনাশকের ব্যবহার, কারেন্ট জাল দিয়ে পোনা মাছ শিকার মাছের অভয়াশ্রম থেকে মা মাছ শিকার। মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, নদী থেকে প্রতিদিন প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন কেজি বৈরালি পোনা শিকার করছেন জেলেরা। এসব পোনা মিলছে স্থানীয় হাটবাজারে যা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৫০০ টাকায়। এপ্রিল মাস আসলে পোনা বড় মাছ হতো। এক কেজিতে প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার বৈরালি পোনা থাকে। এসব পোনা বড় হলে এপ্রিল-মে মাসে ওজন হতো প্রায় চার মণ। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস বৈরালি মাছের প্রজনন বেড়ে ওঠার সময়। এই তিন মাস জেলেরা বৈরালি মাছের পোনা শিকার থেকে বিরত থাকলে মাছ রক্ষা প্রজনন বাড়ানো সম্ভব। সেই সঙ্গে অন্যান্য মাছের প্রজননও বৃদ্ধি পেত।

×