ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

খরগোশ ও তিহামের বিড়াল

আন্ওয়ার এম হুসাইন

প্রকাশিত: ২২:৫১, ২ জুন ২০২৩

খরগোশ ও তিহামের বিড়াল

.

তিহামদের বিড়ালটা বেশ সুন্দর, নাদুস-নুদুস। সাদা বিড়াল। কালো লেজ। পিঠের উপরেও একটা অংশ কালো। দেখতে বেশ ভালো লাগে। দেখলেই মনে হয় কোলে নিয়ে আদর করি। তিহামরা সবাই তাকে খুব আদর করে। মাছ, দুধ, শুঁটকি, বিড়ালের যত পছন্দের খাবার আছে সব তাকে খেতে দেয়। আর খেয়ে-দেয়ে সেও বেশ হৃষ্ট-পুষ্ট। তিহাম তার নাম দিয়েছে তিকু। বিকেলে তিহাম যখন মাঠে খেলতে যায়, তখন তিকুও বেড়াতে বের হয়। সে গিয়ে বাড়ির পেছনে হাঁটাহাঁটি করে। পথের পাশে বসে বসে সুন্দর বিকেল দেখে।

তিহামদের বাড়ি থেকে একটু দূরে ছোট একটা জঙ্গল। সে জঙ্গলে থাকে একটা খরগোশ। খরগোশটা মাঝে মাঝে এদিকে বেড়াতে আসে। তখন তিকুর সঙ্গে দেখা হয়। তারা বসে বসে গল্প-স্বল্প করে। একদিন খরগোশটা তিকুকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি যে মানুষের বাড়িতে থাকো, তোমার কষ্ট হয় না?’

কষ্ট হবে কেন? ওরা তো সবাই আমাকে আদর করে। আর তিহাম তো আমার বন্ধু।

বন্ধু! মানুষ আবার বিড়ালের বন্ধু হয় নাকি?’

অবশ্যই হয়। তিহাম আমার সঙ্গে খেলা করে। সে ঘুরতে বের হলে আমাকে নিয়ে যায়। আর সে যখন পড়তে বসে আমিও পাশে বসে বসে তার পড়া শুনি। আমাকে সঙ্গে নিয়ে বসা ছাড়া তিহাম কখনো পড়তেই বসে না। তিহামের বাবা-মা, দাদা-দাদু ওরাও আমাকে খুব আদর করে। জানো, আমি যখন খুব ছোট ছিলাম তিহামের দাদু তখন আমাকে দুধ খাইয়ে খাইয়ে বড় করেছেন।

কেন? শুধু শুধু তোমাকে এত আদর করবে কেন? তাছাড়া আমি শুনেছি মানুষ খুব খারাপ হয়। তারা পশু-পাখি মেরে মেরে খায়।

না না, তুমি কিছুই জান না। মানুষের সঙ্গে থাকলে ওরা অনেক আদর-যতœ করে। তাছাড়া আমিও ওদেরকে অনেক সাহায্য করি।

খরগোশটি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলতুমি আবার সাহায্য কর কিভাবে?’

বিড়াল বলল, ‘আমি ইঁদুর তাড়াই। মানুষ ইঁদুর পছন্দ করে না।

কেন? ইঁদুরে কি সমস্যা?’

ইঁদুর খাবার-দাবার খেয়ে ফেলে। ঘর-দোর নোংরা করে। ধর, কেউ মাছা ভাজা করে রাখলো সেটা ইঁদুর এসে খেয়ে ফেলে। অথবা ঘরে চাল-ডাল, বিস্কিট, কেক রাখলে সেগুলো খেয়ে ফেলে। আগে তিহামের জামা-কাপড় কেটে ফেলতো। এমনকি ওর বই-খাতাও কেটে ফেলতো। একবার ওর দুইটা নতুন জামা কেটে ফেলেছিল। সারাদিন কান্না করেছিল। জামা দুটো ওর খুব পছন্দের ছিল তো, সেজন্য। ওর পছন্দের গল্পের বইগুলোও সব কেটে ফেলত। আমি বাড়িতে আসার পর ইঁদুররা আর আসে না। আমাকে ভয় পায়। তিহামরা সবাই তাই খুব খুশি। তবে এসবের চেয়ে বড় কথা, তিহাম আমাকে খুব ভালোবাসে। কারণ আমি ওর সঙ্গে খেলি। আর তিহাম আমাকে গল্প শোনায়। নতুন কোনো গল্পের বই পেলে সেটা আমাকে পড়ে পড়ে শোনায়। আমার খুব ভাল লাগে।

তখন হঠাৎ করে খরগোশটা বলল, ‘জানো, আমিও ইঁদুর মারতে পারি।

ওর কথা শুনে তিকু হা হা করে হেসে দিল। বলল, ‘তাই নাকি? তুমি জান ইঁদুর মারা বেশ কঠিন কাজ। ইঁদুররা খুব চালাক। সহজে ওদেরকে ধরা যায় না।

সেসব আমি জানি। কত ইঁদুর ধরেছি। আমাদের জঙ্গলেও অনেক ইঁদুর আছে। বাসা বানিয়ে গাছে থাকে, আবার কেউ কেউ গর্ত করে মাটিতে থাকে।

তিকুরা যেখানে গল্প করছিল সেখান থেকে এককু দূরে একটা ধানক্ষেত। ক্ষেতের পাশে একটা পুকুর। তখন ধানক্ষেতের পাশে সেই পুকুরের পাড়ে একটা ইঁদুর মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে গর্ত করছিল। তিকুর চোখে পড়ল সেটা। সে খরগোশটাকে বলল,‘ওই দেখ, ওই দেখ, ওই যে একটা ইঁদুর গর্ত করছে।খরগোশটাও সেটা দেখল। তিকু তখন তাকে বলল, ‘তুমি তো বেশ ইঁদুর ধরতে পার। যাও তো দেখি ইঁদুরটাকে ধরে নিয়ে আসতে পার নাকি!’

খরগোশটা বলল, ‘! এটা কোনো ব্যাপার না। আমি এক্ষুণি ওটাকে ধরে নিয়ে আসছি।তারপর সে ইঁদুরটার উদ্দেশ্যে ছুট দিল।

ইঁদুরটা খরগোশকে দেখে মোটেই ভয় পেল না। সে ভেবেছিল খরগোশটা বোধহয় তার সাখে খেলতে এসেছে। সে বলল, ‘আমি এখন খুব ব্যস্ত। খেলা করার সময় নেই।কিন্তু খরগোশটা কিছু না বলে হুট করে ইঁদুরটাকে আক্রমণ করে বসল। ইঁদুরটা প্রথমে খুব অবাক হলো। কারণ খরগোশরা কখনো ইঁদুরকে আক্রমণ করে না। তারপর সে খরগোশটাকে দিল কামড়ে। ইঁদুরের ধারালো দাঁত বসে গেল খরগোশের গালে। রক্তাক্ত হয়ে গেল সে।

খরগোশটি তখন কাঁদতে কাঁদতে তিকুর কাছে ফিরে এলো। তিকু তখন হা হা হা করে হেসে উঠল। বলল, ‘কী! তুমি না খুব ইঁদুর ধরতে পার? উলটো ইঁদুরের কামড় খেয়ে কান্নাকাটি করছ!’

খরগোশটি বলল, ‘বিড়াল ভাইয়া, ইঁদুরটি যে এত পাজি, সেটা বুঝতে পারিনি। তুমি ওকে ধরে একটা শাস্তি দাও, প্লিজ।

খরগোশটি হাততালি দিয়ে বলল, ‘বাহ! বাহ! বেশ কাজ করেছ। আমাকে কামড়ানোর একটা উচিত শিক্ষা হয়েছেতারপর সে আবার তিকু জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, বিড়াল ভাইয়া, তুমি কিভাবে এত সহজে ইঁদুরটাকে ধরে ফেললে? এটা তুমি কোথায় শিখলে?’

তিকু বলল, ‘ইঁদুর ধরা শিখেছি আমার মায়ের কাছে। ছোটবেলায় মা আমাকে শেখাতেন কিভাবে চুপি চুপি কোনো আওয়াজ না করে হাঁটতে হয়। কিভাবে ইঁদুরকে লক্ষ্য করে ওঁত পেতে থাকতে হয়।তারপর সে তার পায়ের নখ বের করে দেখিয়ে বলল, ‘কিভাবে থাবা মারতে হয় সেটাও শিখিয়েছেন। গাছে ওঠা শিখিয়েছেন। মা অনেক কিছু জানতেন। আর সেসব কিছুই আমাকে শিখিয়েছেন।

খরগোশটি মনে মনে বিষয়গুলো ভাবতে লাগল।  মা প্রথমে আমাকে শেখাতেন। তারপর তার সঙ্গে অনুশীলন করাতেন। এরপর আমি নিজে নিজে অনুশীলন করতাম। প্রথম প্রথম আমি বেশ কয়েকবার ধরতে পারিনি। মা বলতেনএটা স্বাভাবিক, আরও চেষ্টা করে যাও তারপর পারবে।ধীরে ধীরে একসময় আমিও দক্ষ হয়ে উঠেছি। এখন ইঁদুর ধরা আমার কাছে কোনো বিষয়ই না। আর একটা কথা মনে রাখবে, কোনো কাজ না জেনে শুধু শুধু বড়াই করবে না কখনো, এতে বিপদে পড়বে।

খরগোশটি সবকিছু বুঝতে পেরে তিকুকে ধন্যবাদ দিল। আর তিকুও বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কারণ সন্ধ্যা হলেই সে তিহামের সঙ্গে পড়তে বসবে।

 

×