ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৯ মে ২০২৪, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

সংস্কৃতি প্রতিবেদক

শিলালিপি গবেষক মওলানা ফতেহ্পুরী স্মরণ

সংস্কৃতি সংবাদ

প্রকাশিত: ০০:৩০, ২ এপ্রিল ২০২৩

শিলালিপি গবেষক মওলানা ফতেহ্পুরী স্মরণ

শিলালিপি গবেষক মওলানা মুহাম্মদ নুরুদ্দিন ফতেহ্পুরীর স্মরণসভায় বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক

নীরবে-নিভৃতে কাজ করে যাওয়া এক মানুষ মওলানা মুহাম্মদ নুরুদ্দিন ফতেহ্্পুরী। দেশের স্থাপত্যের ইতিহাস সংগ্রহের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার নামটি। গত শতকের আশির দশকে শিলালিপির পাঠোদ্ধারের ব্রত গ্রহণ করেন তিনি। সেই সুবাদে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ নানা অঞ্চলে ছুটে বেড়িয়েছেন। এসব অঞ্চলে অগ্রন্থিত শিলালিপির পাঠোদ্ধার করেছেন।

বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাচীন মসজিদ, মাজার থেকে ঢাকার বড় কাটরা কিংবা ইমামবাড়ার মতো প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান শিলালিপি পাঠের মাধ্যমে সেগুলোর অন্তর্নিহিত বিষয়কে ইতিহাসে সম্পৃক্ত করেছেন। প্রাচীন শিলালিপি চর্চা ও পাঠোদ্ধারে তার জ্ঞান ছিল অতুলনীয়। পাশাপাশি তিনি ছিলেন ফারসি, আরবি, উর্দু ও বাংলা ভাষার সুপ-িত। গত ১৭ জানুয়ারি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির অন্যতম মওলানা ফতেহ্্পুরী।

শনিবার স্মরণ করা হলো এই শিলালিপি গবেষককে। সেখানে বিশিষ্টজনদের কথায় উঠে এলো স্থাপত্যের ইতিহাস সংগ্রহে ফতেহ্্পুরীর অসামান্য অবদানের কথা। সেই সঙ্গে প্রদর্শিত হলো তাকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র। ছিল তার কর্মজীবনের সাক্ষ্যবহ আলোকচিত্র প্রদর্শনী। 

জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এই স্মরণসভার আয়োজন করে ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি। সুরের আশ্রয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। শ্রোতার মননে মুগ্ধতার অনুভব ছড়িয়ে সানোয়ারা জাহান নীতু গেয়ে শোনান, কোনো আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো ...। এরপর তথ্যচিত্র প্রদর্শনী শেষে শুরু হয় ফতেহ্পুরীর কর্মজীবনের মূল্যায়নভিত্তিক আলোচনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক কামালউদ্দীন কবির ও গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির সম্পাদক স্থপতি অধ্যাপক আবু সাঈদ এম আহমেদ। স্মৃতিচারণ করেন ফতেহ্্পুরীর ছেলে কাওসার বিন নুরুদ্দিন এবং রাজধানীর বড় ভাট মসজিদের ইমাম মুফতি তানভির আহমেদ সিদ্দিকি। 
সভাপতির বক্তব্যে আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বললেন, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন দুটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মওলানা ফতেহপুরীর মতো সুপ-িতের গোটা জীবন এই দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই কেটেছে। আর মাধ্যম ভিন্ন হলে জ্ঞানের মধ্যে বিভাজন নেই। জ্ঞানকে যে খণ্ডিত করা যায় না তার উদাহরণ রেখে গেছেন মওলানা ফতেহ্্পুরী। তার শিক্ষা তাকে এতটাই আলোকিত করেছে যে তাকে বাতিঘর বলা যায়। কারণ, বহু মানুষকে তিনি আলোকিত করেছেন।

 মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, কমলাপুর রেল স্টেশনের অনেক আগে একটা দীঘি ছিল। সেখান থেকে একটা পুরানো মূর্তি উদ্ধারের পর মূতির গায়ে উৎকীর্ণ লিপি পড়েই ফতেহপুরী জানিয়ে দিয়েছিলেন, ওটা লক্ষ্মণ সেনের সময়ের। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত অনেক প্রতœতত্ত্ববিদ যে ভূমিকা রাখতে পারেনি তার বেশি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে উদাহরণ রেখে গেছেন ফতেহ্পুরী।
অধ্যাপক আবু সাইদ এম আহমেদ বলেন, নুরুদ্দিন ফতেহপুরীর জীবনের বড় অংশই কেটেছে বড় কাটরা ও বড় ভাট মসজিদের মতো দুটো মোঘল স্থাপত্যের সঙ্গে। গবেষণায় নিবেদিত প্রাণ এই মানুষটি সব সময়ই নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য উন্মুখ থাকতেন। 
কামালউদ্দিন কবীর বললেন, ভাষার মধ্যে থাকে আত্মপরিচয়। ভাষার মাধ্যমে জগৎ চেনা যায়। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্যে যেমন মধ্য যুগের কাব্য আছে তেমনি আছে আরবি, ফার্সি ভাষার ব্যবহার। সেই সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস। শিলালিপি পড়ে পড়ে নিজ আগ্রহে পাঠোদ্ধার এবং লিপিবদ্ধ করতেন মওলানা ফতেহপুরী। 
স্মৃতিচারণে ফতেহ্্পুরী ছেলে কাওসার বিন নুরউদ্দিন বলেন, বাবা বড় কাটরা মাদ্রাসায় অবৈতনিকভাবে কয়েক দশক পড়িয়েছেন।

×