ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯

দ্রুত শেষ করতে শিক্ষার্থীদের স্মারকলিপি

জবির নতুন ক্যাম্পাসের উন্নয়ন কাজে ধীরগতি

মামুন শেখ, জবি সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ০১:০৯, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

জবির নতুন ক্যাম্পাসের উন্নয়ন কাজে ধীরগতি

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে

 শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ছয় বছর আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস গড়ে তোলার ঘোষণা এলেও কেরানীগঞ্জের ২০০ একর জমিতে এখনও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজই শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এরইমধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে তিন দফা, কাজের ধীরগতিতে হতাশা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
২০০৫ সালে দেশের প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের অবকাঠামোতে যাত্রা শুরু করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা ও অবকাঠামো সঙ্কট থাকায় শিক্ষার্থীদের নানা আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় করার ঘোষণা দেন তিনি। এরপর ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন : ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক সভা। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নানা অনিয়মে আটকে গেছে নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনের কাজ। বছরের পর বছর গড়ালেও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কোন সুরাহা হচ্ছে না।
নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্পের ১ হাজার ৯২০ কোটি ৯৪ লাখ টাকার মধ্যে ভূমি উন্নয়ন, পরিকল্পনা ও প্রকৌশল ভবন নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ রাস্তা নির্মাণ, লেক খনন, পুকুর খনন, ঘাট নির্মাণ, সংযোগ সেতু নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ সারফেস ড্রেন নির্মাণের কাজও এখনও শুরু হয়নি। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কেরানীগঞ্জে ক্যাম্পাস নির্মাণের সিদ্ধান্তের ছয় বছর হলেও জমি অধিগ্রহণ ছাড়া কোন কাজ হয়নি।
এদিকে সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নসহ ১০ দফা দাবি জানিয়ে উপাচার্য ইমদাদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করে স্মারকলিপি দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। গত বুধবার উপাচার্যের কার্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উপাচার্যের এ বৈঠক হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা এই স্মারকলিপি প্রদান করেন। এর আগে গত রবিবার নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন প্রকল্পে কেরানীগঞ্জের উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে টেন্ডার দখলের অভিযোগে প্রতিবাদ ও দ্রুত সম্প্রসারিত ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ শেষ করাসহ ১০ দফা দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবিগুলো হলো অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দ্রুততম সময়ে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস বাস্তবায়ন, কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সম্পৃক্ত রয়েছেন এমন কোন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার না দিয়ে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাজ করা, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা, আবাসিক হলগুলো আগে নির্মাণ করা, সকল টেন্ডারের সুষ্ঠু তদন্ত করা, জরিপের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ২০০ একর জমি নিশ্চিত করা, প্রকল্পে ছাত্র প্রতিনিধি যুক্ত করা বা শিক্ষার্থীদের কাছে প্রকল্পের সকল তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দ্রুত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন, পানি ও বিদ্যুত সরবরাহের ব্যবস্থা করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠান সম্প্রসারিত দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে করার ব্যবস্থা নেয়া।
ওই কর্মসূচী থেকে বুধবারের মধ্যে দাবি মেনে নেয়ার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুরে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দেন শিক্ষার্থীরা। পরে উপাচার্য ইমদাদুল হক শিক্ষার্থীদের বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে আবেদন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত পেলে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণ কাজ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে তাকে (প্রধানমন্ত্রীকে) শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো জানাবেন।
এর মধ্যে, চলতি বছরের ১৬ মার্চ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নতুন ক্যাম্পাসের লেক নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্রে চারটি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। যদিও কাজ করার জন্য একটি কোম্পানিকে নির্দিষ্ট করে মন্ত্রণালয়ের পাঠানোর আগেই পুরো প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন ক্যাম্পাসের কাজ থমকে আছে মূলত মাস্টারপ্ল্যান ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে অনিয়ম ও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ের দেয়ার পাঁয়তারার জন্য। এর মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ তিন দফায় ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ব্যয়ও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৪১.৪ কোটি টাকা। জানা যায়, ২০১৯ সালে ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন  ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য ২৯ কোটি ৫৮ লাখ ৯৮ হাজার টাকার ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপিতে জিওবির অর্থায়নে মাস্টারপ্ল্যান এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান খাতে ৩০ কোটি টাকা রাখা হয়।
২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে বিজ্ঞপ্তির পর ২১ মার্চ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য ১৮টি প্রতিষ্ঠানের এক্সপ্রেস অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) গ্রহণ করে। ৩০ নবেম্বর প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটি ১৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত তালিকা করে। ২০২০ সালের ১৫ মার্চ তিনটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আরএফপি-এর চাহিদা অনুযায়ী টেকনিক্যাল ও ফিন্যান্সিয়াল প্রস্তাব দাখিল করে।
এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সৃজনী উপদেষ্টা লিমিটেডের কারিগরি মূল্যায়নে সর্বোচ্চ স্কোর অর্জন করে এবং তাদের সেবার মূল্য ৪ কোটি ৮ লাখ ৫১ হাজার টাকা। কিন্তু ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান নিয়ম অমান্য করে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘আরবানা’কে ২১ কোটি ৬০ লাখ টাকা নির্ধারণ করে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগে সুপারিশ করেন। এ প্রক্রিয়ায় আরেকটি প্রতিষ্ঠান ডিপ্লোমেন্ট ডিজাইন কনসালটেন্স লিমিটেড ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকায় সেবার মূল্য নির্ধারণ করে। যে কারণে, গত ১১ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২০-২১ আর্থিক বার্ষিক কর্মসূচীর সভায় ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন : ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ ও মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের জন্য ক্রয় প্রক্রিয়া পিপিআর অনুযায়ী না হওয়ায় মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নাকচ করে দেয়।
একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি কম্পোনেটের ‘ইআইও’ আহ্বান করেন। বিষয়টি বিব্রতকর উল্লেখ করে ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য এবং পিপিআর মেনে চলতে সভায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়।
এরপরও প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন মাস্টারপ্ল্যানের কাজের জন্য সিঙ্গেল চয়েজের ভিত্তিতে ফের ‘আরবানা’ কোম্পানিকে প্রায় ৫ কোটি টাকায় কাজ করার জন্য নির্দিষ্ট করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠায়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ একর জমির মাস্টারপ্ল্যানের জন্য কমপক্ষে ১০০ একর জমিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু আরবানা কোম্পানির সেই অভিজ্ঞতা নেই।
২০২১ সালের ৩ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ ইমদাদুল হক যোগদানের পর মাস্টারপ্ল্যানের কোম্পানি নিয়োগে জটিলতা ও অনিয়মের কারণে পুরো প্রক্রিয়া বাতিল করেন। গত ২৩ আগস্ট মাস্টারপ্ল্যানের জন্য পুনঃদরপত্র আহ্বানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতোমধ্যে একটা মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে। সেটা এখন প্রধানমন্ত্রীকে দেখাবেন।
বিশ্ববিদ্যালয় চীফ ইঞ্জিনিয়ার প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘নতুন ক্যাম্পাসের সীমানা প্রাচীরের কাজ চলছে। আর মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হলে বাকি কাজ দ্রুতই শুরু হবে।’
নতুন ক্যাম্পাসের কাজের অগ্রগতি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ ইমদাদুল হক বলেন, ‘নতুন ক্যাম্পাসের কাজের মাস্টারপ্ল্যানের দরপত্রে জটিলতা ছিল। আগের পুরো প্রক্রিয়া বাতিল করে নতুন করে মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণ কাজের অগ্রগতি জানতে প্রতি সপ্তাহে একটি করে প্রতিবেদনে দিতে প্রকৌশল দফতরকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সকল তথ্য সরবরাহ করবে।’
এদিকে ১০ দফা দাবির বিষয়ে বৈঠক শেষে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা উপাচার্যের কাছে আমাদের দাবিগুলো জানিয়েছি। তিনি বলেছেন, আগামী ৩ অক্টোবরের পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আমাদের দাবির কথা তুলে ধরবেন। তিনি সিডিউল নিয়েছেন। আমরা শিক্ষার্থীরাও সেই বৈঠকে থাকতে চাই, সেটা জানিয়েছি। এছাড়া সেই বৈঠকে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের অগ্রগতির বিষয়ে যদি সুনির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্ত না আসে তাহলে আমরা আবার কঠোর আন্দোলনে যাব।’