শনিবার ৯ মাঘ ১৪২৮, ২২ জানুয়ারী ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

স্বাস্থ্যখাতে অর্জন ও অপপ্রচার

স্বাস্থ্যখাতে অর্জন ও অপপ্রচার
  • মিলু শামস

গত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝিতে দেশের চিকিৎসা জগতে মোটা দাগে তিনটি ভাগ ছিল- মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি। এখন শুধু সার্জারিতেই কমপক্ষে পঞ্চাশটা সুপার স্পেশালিটি তৈরি হয়েছে। তার মানে নতুন কনসেপ্ট, নতুন প্রযুক্তির চর্চা ও প্রসার ঘটছে। নব্বই দশকের মাঝামাঝিতেও সাধারণ এনজিওগ্রাম করাতে দেশের বাইরে যেতে হতো। এখন শুধু ঢাকাতেই সরকারী-বেসরকারী মিলে অন্তত বিশটি সেন্টার আছে যেখানে এনজিও গ্রামের সুবিধা রয়েছে। ঢাকার বাইরেও আছে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান। বাইপাস ওপেন হার্ট সার্জারি অপারেশন অনায়াসে হচ্ছে। ভাল্ব রিপ্লেœস, হার্টের কনজেনিটাল ডিফর্মেটি বা জন্মগত ত্রুটি, জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট আর্থ্রস্কোপিক সার্জারি, এ্যান্ডোস্কোপিক সার্জারি ইত্যাদি অপারেশন খুবই সফলতার সঙ্গে হচ্ছে। কিডনি ও লিভার ট্রান্সপ্লান্টের মতো জটিল প্রক্রিয়ার সাফল্য অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। কিডনি প্রতিস্থাপনে সাফল্যের হার বাড়ায় রোগীদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা অনেক কমেছে। জানা গেছে, বিদেশগামী শতকরা সত্তর ভাগ রোগী এখন দেশে চিকিৎসা করাচ্ছেন। অনেক কম খরচে তারা বিদেশের উন্নত চিকিৎসা দেশে পাচ্ছেন।

এক সময় আলোড়ন তোলা কিডনি বিক্রির খবর স্পর্শ করেছিল মানুষকে। গরিব মানুষ পেটের দায়ে কিডনি বিক্রি করছে- হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া এ খবর নিঃসন্দেহে মর্মস্পর্শী। অভাবের থাবা যত কর্কশ হোক তার দাবি মেটাতে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিশেষ করে কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিক্রি মেনে নেয়া যায় না। এভাবে অঙ্গ বিক্রি বৈধও নয়। শরীরের মালিক ব্যক্তি নিজে হলেও এর কোন অংশ বিক্রির আইনী অধিকার তার নেই। যেমন নেই নিজেকে হত্যার অধিকার। কিন্তু প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার বিভিন্ন প্রতিবেদন জানিয়েছিল এ রকম ঘটছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের অভাবী মানুষ প্রভাবিত হয়ে কিডনি বিক্রি করছে। যারা প্রভাবিত করেছে তাদের দু’চারজন গ্রেফতার হয়ে দোষ স্বীকার করেছে। সত্যিই যদি এরকম ঘটে থাকে তাহলে তার বিচার হওয়া উচিত। এ নিয়ে বিবেকবান মানুষের দ্বিমত থাকতে পারে না। কিন্তু যেভাবে এর সঙ্গে দেশের বিশেষজ্ঞ কিডনি চিকিৎসক ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর নাম এসেছিল তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিডনি প্রতিস্থাপনে দেশের চিকিৎসকদের সাফল্য গর্ব করার মতো। যে কোন উন্নত দেশের সঙ্গে এর তুলনা চলে। কিডনি কেনাবেচার সঙ্গে এসব চিকিৎসক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নাম জড়িয়ে ফেলা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। চিকিৎসা ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন অনেক। অভিযোগ তোলার আগে অর্জনগুলো ভেবে দেখা দরকার।

কিডনি বিক্রির বিষয়টা যেভাবে সরলীকরণ হয়েছিল তাতে মনে হয়, দালালরা গ্রাম থেকে ফুঁসলিয়ে লোক এনে গোপনে কিডনি বিশেষজ্ঞদের কাছে যায়। তারা ওই লোকদের অপারেশন টেবিলে শুইয়ে কিডনি কেটে দালালদের থেকে গুনে গুনে টাকা নিয়ে নিরীহ বেচারাকে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়। যেমন হাস্যকর উপস্থাপনা তেমনি পাঠকের বিশ্বাসপরায়ণতা। এ রকম মন নিয়ে বিজ্ঞাননির্ভরতাকে বিশ্লেœষণ করা যায় না। মনটা একটু ঘষামাজা করে উন্নত করতে হয়। ইতিবাচক মনোভাব অর্জন করতে পারা এক বিশেষ গুণ। এ জন্য মনেরও আলোকপ্রাপ্তি দরকার।

কিডনি প্রতিস্থাপন এক জটিল প্রক্রিয়া। যেখানে সেখানে কিডনি অপসারণ ও প্রতিস্থাপন করা যায় না। এ জন্য পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো দরকার এবং তা তৈরি করা বেশ ব্যয়বহুল। দেশে হাতেগোনা কয়েকটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে প্রতিস্থাপনের কাজ হচ্ছে। দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আক্রান্তদের বড় অংশের পক্ষে বিদেশে গিয়ে ব্যয়বহুল এ চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। দেশে পরিপূর্ণ চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়ায় এ রোগীরা দীর্ঘদিন সুস্থ-সবল জীবনযাপন করছেন। মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ বিভিন্ন জটিল রোগ নিরাময়ের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া। এটা নিঃসন্দেহে চিকিৎসা জগতের অন্যতম সাফল্য। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অবকাঠামো থাকলে দেশের চিকিৎসকরা বিদেশের চিকিৎসকদের সঙ্গে পাল্লœা দিয়ে চলতে পারেন, কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের অতিক্রমও করতে পারেন তা এখন প্রমাণিত। সে জন্য আর্থিক সঙ্গতি যাদের আছে তাদের বিদেশমুখী হওয়ার হারও কমছে। দেশে এখন প্রায় প্রতিটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসায় ষাট ভাগ আধুনিক সেবা সহজলভ্য। বিদেশের যেসব হাসপাতালে নিয়মিত রোগী যেত সেসব হাসপাতাল এখন বাংলাদেশী রোগী কম পাচ্ছে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভারত প্রভৃতি দেশের নামকরা হাসপাতালের পক্ষে আমাদের এখানে এখন নিয়মিত হেলথ প্রমোশন হচ্ছে। এ জন্য এখানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লোক নিয়োজিত। তারা নিয়মিত সভা-সেমিনার করছে। নব্বই দশক পর্যন্ত এ চিত্র ছিল না। ওসব দেশের হাসপাতালগুলোতে তখন এমনিতেই রোগী যেত। এখন রোগীদের আকৃষ্ট করতে তাদের প্রচার-প্রচারণা চালাতে হয়।

দেশে-বিদেশে সবখানে বেসরকারী মালিকানায় যারা হাসপাতাল চালাচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্য ব্যবসা। সেবার মনোভাবের চেয়ে ব্যবসায়ী মনোভাবের মূল্য তাদের কাছে বেশি। অন্য দশটা প্রতিষ্ঠানের মালিক যেমন ব্যবসায়ী, হাসপাতাল মালিকও তেমনি ব্যবসায়ী। প্রচুর পুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে এ খাতে। প্রতিযোগিতা হচ্ছে। শুধু দেশে নয়, বিদেশের হাসপাতালের সঙ্গেও। বিদেশের যেসব হাসপাতালে রোগী কমে গেছে তাদের ব্যবসায় স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ছে। তারা তাই তাদের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালাবে মুক্তবাজারে সে তো স্বাভাবিক। কিডনি নিয়ে যে ধোঁয়াশা বা ঘোলাটে অবস্থা তৈরি হয়েছিল তা যে এ প্রচারণার অংশ নয় তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আর এর সঙ্গে দেশীয় স্বার্থান্বেষীরা জড়িত নেই তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ অতীতে এমন অনেক ঘটেছে। সুতরাং একটা হুজুগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত ছাড়া কাউকে অপরাধী বলার বিষয়ে সংযত থাকা দরকার। বিশেষ করে চিকিৎসার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে।

এখানে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকাও অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের দেশে চিকিৎসকদের অনেক দুর্নাম রয়েছে। কোন কোন চিকিৎসক দুর্নীতপরায়ণ তাও সত্যি। তারা তো দুর্নীতি আক্রান্ত এ সমাজেরই মানুষ। অন্য দশটা পেশায় যেমন দুর্নীতগ্রস্ত মানুষ আছে, এ পেশায়ও তাই এবং অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হওয়াও জরুরী তাতেও দ্বিমত নেই। তাই বলে ঢালাওভাবে তাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রচার করলে তাতে শুধু তাদেরই ক্ষতি হবে না। ক্ষতি দেশের মানুষের, আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ইমেজের। নব্বই দশকের শেষ দিকে একজন প্রখ্যাত গাইনি বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন বিদেশে পড়াশোনা ও গবেষণা শেষে দেশে এসে গাইনিতে দারুণ সফলতার সঙ্গে কাজ করছিলেন। অনেক জটিল গাইনি রোগী তার চিকিৎসায় সেরে উঠেছেন। অনেকে সুস্থ স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করেছেন তার হাতে। কোন এক সামান্য ত্রুটির জন্য যার দায় মূলত তার নয়, কাগজে এক পাক্ষিকভাবে এত লেখালেখি হয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। এতে তার যত না ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে দেশের। একজন সফল চিকিৎসকের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে দেশের মানুষ।

আমাদের অর্জনগুলো ধরে রাখতে হবে আমাদেরই। ধরে রাখতে না পারলে সে অর্জন হবে মূল্যহীন।

শীর্ষ সংবাদ:
সাকিবের হাসিতে শুরু বিপিএল         ফের বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ॥ করোনার লাগাম টানতে পাঁচ জরুরী নির্দেশনা         বাবার সম্পত্তিতে পূর্ণ অধিকার পাবেন হিন্দু নারীরা ॥ ভারতীয় সুপ্রীমকোর্ট         উচ্চারণ বিভ্রাটে...         বাণিজ্যমেলার ভাগ্য নির্ধারণে জরুরী সিদ্ধান্ত কাল         আলোচনায় এলেও আন্দোলনে অনড় শিক্ষার্থীরা         ‘আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই’         করোনা ভাইরাসে আরও ১২ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১১৪৩৪         ‘১৫ ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরু’         ঢাবির হল খোলা, ক্লাস চলবে অনলাইনে         করোনারোধে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ৫ জরুরি নির্দেশনা         আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ স্কুল-কলেজ         ভরা মৌসুমে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের সবজি         মাদারীপুরে সেতুর পিলারে মোটরসাইকেলের ধাক্কা, ২ শিক্ষার্থী নিহত         বিপিএম-পিপিএম পাচ্ছেন পুলিশের ২৩০ সদস্য         অভিনেত্রী শিমু হত্যা : ফরহাদ আসার পরেই খুন করা হয়         দিনাজপুরে মাদক মামলায় নবনির্বাচিত ইউপি সদস্য গ্রেফতার         শাবিপ্রবিতে গভীর রাতে শিক্ষার্থীদের মশাল মিছিল         ঘানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে ৫শ’ ভবন ধস, নিহত ১৭         করোনায় রেকর্ড সাড়ে ৩৫ লাখ শনাক্ত, মৃত্যু ৯ হাজার