সোমবার ৪ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জানুয়ারী ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

পাহাড় এখন আর দুর্গম নেই, হয়েছে অনেক উন্নত

  • আরও সুন্দর জীবনের হাতছানি

হাসান নাসির, খাগড়াছড়ি থেকে ফিরে॥ পার্বত্য শান্তিচুক্তির দুই যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন। পাহাড় এখন আর অতটা দুর্গম জনপদ নয়, যেমনটি ছিল আগে। একদা পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলি মানে ‘পানিশমেন্ট ট্রান্সফার’, এমনই মনে করা হতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেখানে যাওয়া মানে শাস্তি নয়, বরং চাকরিসূত্রে দীর্ঘদিন থাকা অনেকে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। উন্নত সড়ক যোগাযোগ পাহাড়কে মিলিয়েছে সমতলের সঙ্গে। সীমান্ত সড়কসহ চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হয়ে গেলে পার্বত্য এলাকার জনগণ লাভ করবে আরও উন্নত জীবন।

খাগড়াছড়ি শহর এবং নিকটবর্তী বাঘাইহাট ও মাচালং বাজারে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল তাদের সন্তুষ্টির কথা। তারা এখন আগের চেয়ে অনেক ভাল আছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি ঘটেছে। সৃষ্টি হয়েছে নতুন নতুন জীবিকা। উৎপাদিত ফসল সহজেই পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে সড়ক ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ায়। পর্যটক বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতিতে পড়েছে ইতিবাচক প্রভাব।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও মাচালং বাজার কমিটির সভাপতি অতুলাল চাকমা জানান, তার এলাকায় পাহাড়ী-বাঙালীর মধ্যে মেলামেশাও বেশ ভাল। তারা একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হলেও যেটুকু হয়েছে, তাতেও জীবন আগের চেয়ে অনেক উন্নত। আলাপে তিনি অবশ্য ব্যবসা করতে গিয়ে চাঁদাবাজির শিকার হওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করলেন। তিনি বলেন, এখনও পাহাড়ে বসবাসকারীদের মধ্যে যেটুকু বিরোধ রয়েছে তা মূলত ভূমি নিয়ে। এই বিরোধ মিটে গেলে শান্তিচুক্তির পূর্ণতা আসবে। একইসঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় আরও উন্নতির প্রয়োজন বলে মত ব্যক্ত করে এ বিষয়ে তিনি আশাবাদও প্রকাশ করেন।

খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে। সাধারণ জনগণও বুঝতে পারছে যে, এখানকার অর্থনীতির উন্নয়নে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে পর্যটন খাত। আর এ খাতের উন্নয়নে প্রয়োজন শান্তিপূর্ণ নিরাপদ অবস্থা এবং সম্প্রীতি। তিনি বলেন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের সঙ্গে যারা জড়িত তারা সংখ্যায় বেশি নয়। অধিকাংশ পাহাড়ীই শান্তিতে বসবাস করতে চায়। বক্তব্যে তিনি শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ার জন্য বর্তমানে বিবদমান চারটি পাহাড়ী সংগঠনকে দায়ী করেন।

পাহাড়ে উন্নয়নের জন্য সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেকগুলো সড়ক হয়েছে। এতে করে যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম হয়েছে। বর্তমানে বিরোধিতায় যারা মাঠে রয়েছে তাদের মধ্যে শুধু ইউপিডিএফের একটি গ্রুপ সমঝোতার বিরুদ্ধে। এ গ্রুপটিকে প্রতিহত করতে হবে। বাকি তিন গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে। সীমান্ত সড়ক হয়ে গেলে পর্যটন খাতের আরও উন্নতি হবে বলে জানান তিনি। পাহাড়ে শান্তিপূর্ণ ও সাধারণ জনগণের বসবাসের জন্য নির্ভয় পরিবেশ বজায় রাখতে সেনাবাহিনী থাকা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছ থেকে যে তথ্য মিলেছে তা বিস্ময়কর। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তির পূর্বে সড়ক ছিল ২ হাজার ৮০৩ কিলোমিটার, যা দু’যুগে উন্নীত হয়েছে ৭ হাজার ৯৪৯ কিলোমিটারে। হাসপাতাল-ক্লিনিক আগে ছিল ২৪টি। এখন এ সংখ্যা ২৭০টি। এগুলো সরকারী-বেসরকারী হাসপাতাল এবং কমিউনিটি ও বিভিন্ন ধরনের ক্লিনিক। শিল্পায়নও হতে যাচ্ছে পার্বত্য এলাকায়। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। শান্তিচুক্তির আগে তিন পার্বত্য জেলায় কলকারখানা ছিল ১৩৫টি। এখন এ সংখ্যা ২২৩টি। যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ায় শিল্পায়ন ও ব্যবসা- বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটছে। এখন সমতল থেকে পাহাড়ে আসা যেমন সহজ হচ্ছে, তেমনিভাবে পাহাড়ে উৎপাদিত কৃষিসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য খুব সহজই বাজারজাত হতে পারছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন প্রায় ৮০টি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) কাজ করছে। এ এনজিওগুলোর পরিচালিত প্রকল্পের সংখ্যা শতাধিক। মূলত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে এ এনজিওগুলো। এতে নিয়োজিত রয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী। এরমধ্যে ৩৬ শতাংশ বাঙালী এবং ৬৪ শতাংশ পাহাড়ী। এসকল এনজিও কার্যক্রমে সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ, যারমধ্যে ৩৭ শতাংশ বাঙালী এবং ৬৩ শতাংশ পাহাড়ী। এ সুযোগ সুবিধা যেন টেকসই বা দীর্ঘস্থায়ী হয় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থারই প্রয়াস রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডেও টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান প্রকল্পের কর্মকর্তা মতিউর রহমান জানান, সরকার পাহাড়ী-বাঙালীকে আলাদা চোখে দেখে না। সকলের জন্যই সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। এক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কৃষি, যাতায়াত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সমাজকল্যাণের ওপর। বিদ্যুত এখন উন্নয়নের অপরিহার্য উপকরণ।

সে কারণে নতুন করা সড়কের পাশ ঘেঁষে অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে বৈদ্যুতিক সংযোগ। দুর্গম এলাকায় চলে যাচ্ছে সোলার প্যানেল। বক্তব্যে তিনি পাহাড়ে উন্নয়নের ক্ষেত্রে পাড়াকেন্দ্র স্থাপনে সরকারী উদ্যোগ বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, পাহাড়ে বসবাস মূলত পাড়াভিত্তিক। টিকাদান কর্মসূচী, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসহ সেবামূলক কর্মকান্ড আমরা পাড়াকেন্দ্রের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে করতে পারছি। পার্বত্য এলাকায় এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু উপস্থিতির হার ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ। পাড়াকেন্দ্র থাকায় আমাদের পক্ষে বসবাসকারীদের সেবার আওতায় নিয়ে আসা সহজ হচ্ছে।

শান্তিচুক্তির সুফল অনেক বলে উল্লেখ করে তিনিও বলেন, পর্যটনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ জন্য ‘স্মার্ট ভিলেজ কর্মসূচী’ হাতে নেয়া হয়েছে। প্রতিটি পাড়ায় ৩০ থেকে ৩৫টি পরিবারকে নিয়ে হবে এই ভিলেজ। পর্যটকরা এখানে এসে থাকতে পারবেন, দেখতে পারবেন পাহাড়ী জীবনযাত্রা। খাগড়াছড়িতে বসবাসকারীদের মধ্যে এখন বাঙালী ও পাহাড়ীর অনুপাত ৫১ শতাংশ ও ৪৯ শতাংশ। সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন এবং বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিতে সেনাবাহিনী অত্যন্ত মানবিক ও কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শীর্ষ সংবাদ: