ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯

ড. রেবা মন্ডল

বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের সংস্কার জরুরী

প্রকাশিত: ০৯:১৫, ২৫ জুন ২০১৯

  বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের সংস্কার জরুরী

উত্তরাধিকার বিষয়টি প্রয়োজনীয়তার বিষয় নয়, বরং অধিকারের বিষয় (not a matter of need rather a matter of right)। যে সভ্যতায় বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান নারীরা রয়েছেন, এমনকি জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে মহাসচিব হওয়ার জন্য নারীদের নাম প্রস্তাবিত হয়েছে (নিকটভবিষ্যতে হবেও হয়ত), সে সভ্যতায় সম্পওির উত্তরাধিকারে নারীর মালিকানার অধিকার থাকবে না, এমনটি অকল্পনীয়। বাংলাদেশে হিন্দু সমাজে নারীরা উত্তরাধিকার আইনে জীবনস্বত্বে সম্পওি পায়, কিন্তু মালিকানাস্বত্ব পায় না। বাংলাদেশে হিন্দুদের উত্তরাধিকার কর্তৃক প্রণীত দায়ভাগ সিস্টেম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে ৫৩ জন সপি--এর মধ্যে মাত্র ৫ জন নারী (মৃতের স্ত্রী, কন্যা, মাতা, পিতামহী ও প্রপিতামহী) রয়েছেন, যারা শুধু যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন ভোগদখল করতে পারবেন উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি, তবে মালিকানার অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবেন। ব্রিটিশ ভারতে ১৯৪১ সালে হিন্দু ব্যক্তিগত আইনকে বিধিবদ্ধ করার জন্য স্যার বি এন রাও-এর সভাপতিত্বে Hindu Lwa Committee গঠন করা হয়, যা Rao Committee নামে পরিচিত। স্বাধীন ভারতে ১৯৫৬ সালে Rao Committee এর সুপারিশের ভিত্তিতে সমগ্র ভারতের জন্য অভিন্ন উত্তরাধিকার আইন The Hindu Succession Act পাস হয়, যার মাধ্যমে ভারতের সব অঞ্চলে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে নারীর মালিকানা স্বীকৃত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে রয়ে যায় পূর্বের আইন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের অবস্থা পূর্বের মতোই রয়েছে। যার ফলে হিন্দু নারীর মানবাধিকার, সাংবিধানিক অধিকার উত্তরাধিকার আইনে লঙ্ঘিত হয়েই যাচ্ছে। উপরন্তু ভারতে ১৯৭০-১৯৯০ সালে ৫টি স্টেটে- কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র ও কর্নাটক এ The Hindu Succession Act, ১৯৫৬ সংশোধন করে সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে, যা ২০০৫ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সমগ্র ভারতবর্ষের জন্য অনুমোদন দেয় এবং তখন থেকেই প্রতিটি স্টেট ওই সংশোধনীকে প্রয়োগ করে আসছে। প্রসঙ্গত মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে সূরা আন নিসার আয়াত ১১তে পুত্র-কন্যা ২:১ অনুপাতে এবং ১৭৬নং আয়াতে ভাই-বোন ২:১ অনুপাতে সম্পত্তি লাভ করবে, এ কথা বলা হয়েছে। ভারতে হিন্দু নারীদের অসতীত্বের কারণেও সম্পত্তির মালিকানার অধিকার বিনষ্ট হয় না ১৯৫৬ সালের আইনটি পাস হওয়ার পর থেকে। তবে বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে অসতীত্বের কারণে নারীরা জীবনস্বত্বে যেটুকু সম্পত্তি অর্জন করার আইন আছে, সেটুকু থেকেও বঞ্চিত হয়। অর্থাৎ দেখা যায়, বাংলাদেশে হিন্দু ব্যক্তিগত আইনের সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়টি অদ্যাবধি সংস্কারমুক্তও হয়নি, যুক্তিবাদীও হয়নি, যেটি ভীষণ পরিতাপের বিষয়। আইন সংস্কারমুখী, সংশোধনমুখী না হলে কোনক্রমেই সমাজ ও সভ্যতার উন্নয়ন ওই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব নয়। যা কিছু সার্বজনীনভাবে মানুষের কল্যাণে পরিবর্তন করা হয় না, যায় না, তা এক সময় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে, বিলীন হয়ে যায়। ইংরেজ দার্শনিক জন লক তাঁর Second Treaties on Civil Government (1689) এ বলেছেন যে, The right to property and right to life were inalienable rights and that it was the duty of the state to secure these rights for individuals. তাই তো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ State Lwa করে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। এমনকি আমেরিকা একসময় কেবল সাদা মানুষেরই ভোটদানের ও সম্পত্তির অধিকার ছিল। এখন সেখানে এসবের পরিবর্তন ঘটেছে। জার্মানিতে ১৯৬৩ সালে ল্যান্ডমার্ক ডিসিসন হয়, যেমনটি বলা যায়- Federal Constitutional Court held that preferences for male heirs in the laws were unconstitutional and they nwo grant equal rights to male and female. উল্লেখ্য, ১৯৬৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত জার্মান পুরুষের অগ্রাধিকার ছিল। কানাডার বিভিন্ন প্রভিন্স এ যেমন ব্রিটিশ কলম্বিয়া, আলবার্তো, অন্টারিও, কুইবেক ইত্যাদি সবক্ষেত্রে স্বামী/স্ত্রী একে অপরের সম্পত্তিতে অর্ধেক অংশ পায় এবং ছেলে-মেয়েরাও সমানভাবে অর্ধেক অংশ পায়। চীনে Lwa of Succession of the Peoples Republic of China যা 3rd Session of the 6th National Peoples Congress এ গৃহীত এবং ঘোষিত হয়েছে (Order No. 24 of the President of the Peoples Republic of China on April 10, 1985 দ্বারা) যার দ্বিতীয় অধ্যায়ে অনুচ্ছেদ ৯-এ বলা হয়েছে যে, Males and Females are equal in their Lwa of Inheritance. এছাড়া জাপানসহ পৃথিবীর সভ্য দেশসমূহে সরকার আইন পাস করে উত্তরাধিকার আইনে যুক্তিসংগত সংশোধন এনে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। আবার জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত-UN Declaration on the Elemination of All Forms of Racial Discrimination, (কার্যকর ৪ জানুয়ারি ১৯৬৯)-এর অনুচ্ছেদ ১ এ বলা হয়েছে যে, মানুষে মানুষে বৈষম্য করা হলে তা হবে মানব মর্যাদার বিরুদ্ধে কৃত একটি অপরাধ, UN Charter-এর নীতিসমূহের অস্বীকৃতি হিসেবে নিন্দনীয়, UDHR এ বর্ণিত মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতাসমূহের লঙ্ঘন, বিশ্বের জাতিসমূহের বন্ধুত্বসুলভ ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের পথে বাধা এবং জনগোষ্ঠীসমূহের মধ্যকার শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নকারী একটি উপাদান। আবার ১৯৭৯ সালের CEDAW সনদে ১৬টি ধারার মাধ্যমে নারী-পুরুষের সমানাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের কথাই ঘোষিত হয়েছে। কাজেই নারী-পুরুষকে জীবন-জীবিকার অন্যতম উপাদান উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানাস্বত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা অত্যন্ত অমানবিক ও গর্হিত বিষয়। যে কোন সমাজে নারী-পুরুষ সংখ্যা অনুপাত প্রায় সমান। সেক্ষেত্রে নারীকে অধিকারবঞ্চিত করে রাখলে ওই সমাজের অর্ধেক মানুষই অধিকার বঞ্চিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়, যা সার্বিক উন্নয়নের পথে বাধা ও অকল্যাণকর। এ ব্যাপারে নারীদেরই এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষভাবে হিন্দু নারীদের এ অসহায়ত্ব দূর করতে ঘরের কোণের অবলা নারী হয়ে থাকলে চলবে না। পৃথিবীর আলো-বাতাস, মাটি, পানিতে সব মানুষের সমান অধিকার আছে, তা বুঝে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে নিজেকে সাহায্য করে, ঈশ্বর তাকে সাহায্য করেন। শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘নারীর মূল্য’ উপন্যাসে আক্ষেপ করে যথার্থই বলেছেন ‘স্বার্থের জন্যই যে পুরুষ তাহাকে চিরদিন নির্যাতন এবং অপমান করিয়া আসিয়াছে, এ সমাজে আরও কিছু বলা আবশ্যক। কেন না, এ কথা পুরুষে বুঝিলেও স্ত্রীলোক বুঝে না, বোধ করি বুঝিতেও চাহে না। সংসারে ছোটখাটো সুখ-শান্তির মধ্যে থাকিয়া স্বামীর মুখের দিকে চাহিয়া কি করিয়া সে মনে করিবে, এই স্বামী তাহার আন্তরিক মঙ্গল কামনা করে না। পিতার কাছে দাঁড়াইয়া কি করিয়া সে ভাবিবে, এই পিতা তাহার মিত্র নহে। বাস্তবিক পৃথকভাবে একটি একটি করিয়া দেখিলে এই সত্য হৃদয়ঙ্গম করা অসাধ্য, কিন্তু সমগ্রভাবে সমস্ত নারীজাতির সুখ-দুঃখের মঙ্গল-অমঙ্গলের ভিতর দিয়া চাহিয়া দেখিলে, পিতা, ভ্রাতা, স্বামীর সমস্ত হীনতা, সমস্ত ফাঁকি এক মুহূর্তেই সূর্যের আলোর মতো ফুটিয়া ওঠে।’ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে এবং নারী শিশুটিও যে মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয় পুরুষ শিশুটির মতোই, এটি অনুধাবন করতে হবে। কামিনী রায়ের কবিতা- জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে, সে জাতির নাম মানুষ জাতি। বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ ঐক্যপরিষদ এবং বাংলাদেশের হিন্দু সমাজের নারীসহ সমস্ত নারীই যদি আর দেরি না করে শীঘ্রই বাংলাদেশে হিন্দু নারীদের উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে পূর্ণ মালিকানা ও নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হয়ে কাজ করেন এবং জননেত্রী মানবতাবাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার সাহায্য করেন, তাহলে বাংলাদেশে হিন্দু নারীর মানবাধিকার, সাংবিধানিক অধিকার ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত হবে এবং নারীর ক্ষমতায়ন প্রসারিত ও বিকশিত হবে। আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১৭ এর ৭নং অনুচ্ছেদ (নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করা) এর উদ্দেশ্যও বাস্তবায়িত হবে। লেখক : ডিন, আইন অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া