শনিবার ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২১ মে ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

খাদ্যে ব্যাপক ভেজাল ॥ ঈদের খাবারে ভোক্তাদের যে সতর্কতা প্রয়োজন

  • অধ্যাপক আ ব ম ফারুক

পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর সমাগত। সারাদেশের বাজারগুলো ক্রেতাদের ভিড়ে গম গম করছে। এখন ঈদের দিনের খাবার কেনার পর্যায় চলছে। নিজের স্বাস্থ্য রক্ষার খাতিরে খাবারের অনুষঙ্গী সামগ্রীগুলো কেনার সময় আপনার কিছু সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ, আমাদের দেশে সৎ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অসৎ ব্যবসায়ীও রয়েছে এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে অধিক মুনাফার লোভে খাদ্যে নানা রকম বিষাক্ত দ্রব্যাদি মিশিয়ে যাচ্ছে। তবে বর্তমান সরকার খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে বেশ আন্তরিক বলেই মনে হচ্ছে।

খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই ২০০৯ সালে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘মোবাইল কোর্ট আইন’ এবং ‘বাংলাদেশ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন’ জারি করে। প্রথম আইনে তাৎক্ষণিকভাবে বিচার করার ক্ষমতালাভকারী ম্যাজিস্ট্রেট খাদ্যে ভেজালকারীকে শাস্তি হিসেবে দুই বছর পর্যন্ত কারাদ- প্রদান করতে পারবেন। দ্বিতীয় আইনে ভোক্তার জন্য ক্ষতিকর জিনিস খাবারে মেশালে বা বিক্রি করলে অপরাধীর ৩ বছরের জেল অথবা ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দ-ই হতে পারে। যেহেতু ক্যালসিয়াম কার্বাইডে কিছু পরিমাণে মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর আর্সেনিক হাইড্রাইড ও ফসফরাস হাইড্রাইড থাকে তাই ফলের কৃত্রিম পক্ককারক হিসেবে এই আইনে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার বেআইনী কাজ বলে গণ্য। দুটি আইনই জননন্দিত হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে প্রশংসিত হয়েছে খাদ্যদ্রব্যে বিষাক্ত ফরমালিনের অপব্যবহার রোধকল্পে ২০১৪ সালে জারি করা ‘ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন।’ এই আইনে ফরমালিন আমদানিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি খাবারে মেশানো ও বিক্রির জন্য সর্বনিম্ন ৫ লাখ টাকা থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়ার বিধান রয়েছে। যদিও জাতীয় সংসদের আইনপ্রণেতা ও সরকারের উচ্চ নীতিনির্ধারকরা এসব যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করেছেন, কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারী দফতরগুলো এসব আইনকে যথাযথ প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন করেনি, এখন পর্যন্ত তারা একজনকেও এসব শাস্তি দেয়ার কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেননি। তারা দিয়েছেন খুবই মৃদু নরম কোমল শাস্তি। অথচ খাদ্যে ভেজাল দেয়া মানবতাবিরোধী বা গণহত্যার অপরাধের সমতুল্য। সম্ভবত এই কারণেই ভেজালকারীরাও মাদক ব্যবসায়ীদের মতোই দিনকে দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। এমন অবস্থার অবসান নিশ্চয়ই একদিন হবে। কিন্তু যতদিন তা না হচ্ছে ততদিন ভোক্তাকে খাদ্যসামগ্রী কেনার সময় যথাসম্ভব সাবধান হতেই হবে।

সরকারী আইনের পাশাপাশি ভোক্তাদের এই সচেতনতা যে ভেজালের বাজারে বেশ প্রভাব ফেলে তার উদাহরণ কিন্তু আমাদের সামনেই রয়েছে। ফরমালিনের ব্যবহার অনেক কমেছে। এ জন্য সরকারকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। বাজারের ইফতার সামগ্রী ও মিষ্টিতে ক্ষতিকর টেক্সটাইল রং কিংবা জিলিপিতে পোড়া মবিলের ব্যবহার কিছুটা কমেছে। ফরমালিন দেয়া হয়নি বলে এখন মাছে বা আঙ্গুরে মাছি বসে। তবে ভেজালের ব্যাপকতার তুলনায় এগুলো নস্যি। ঈদের খাদ্যসামগ্রী কেনার সময় ভোক্তাদের কিছু সতর্কতা অবলম্বন তাই এখনও জরুরী।

ঈদের সেমাই কেনার সময় কাঁচা সেমাই কেনাই ভাল, যা ঘরে নিয়ে ভেজে নিতে হবে। এমনিতেই আমাদের অধিকাংশ সেমাই তৈরির কারখানাগুলো অত্যন্ত অপরিষ্কার। তদুপরি ঈদের সময় সেমাইয়ের বিপুল চাহিদার কারণে অসংখ্য কোম্পানি অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় সেমাই তৈরি করে থাকে। বিশেষ করে এগুলো শুকানো হয় মূলত খোলা আকাশের নিচে। ফলে রোদে শুকানো এসব সেমাইতে প্রচুর মাছি বসে, ধুলাবালিও পড়ে। আমরা যখন সেমাই রান্না করি তখন এভাবে আসা জীবাণুগুলো মারা যায় না। তবে কাঁচা সেমাই কিনে ঘরে ভেজে নিলে ভাজার তাপে জীবাণুগুলো মরে যায়। ফলে সেমাইটা নিরাপদ হয়।

তবে কাঁচা সেমাই কেনার সময় ধব ধবে সাদা রঙের সেমাইও কেনা ঠিক হবে না। কারণ এগুলো ধবধবে সাদা করার জন্য হাইড্রোজ ব্যবহার করা হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কম সাদা কাঁচা সেমাই কেনা তাই সবচেয়ে ভাল।

লাচ্ছা সেমাই কেনার সময় সাবধানতা আরও বেশি প্রয়োজন। রঙিন লাচ্ছা না কেনাই ভাল। কারণ দেখতে সুন্দর হলেও এতে থাকে টেক্সটাইল কালার যা চর্মরোগ, এ্যালার্জি, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, পাকস্থলীর গোলযোগ, পেপটিক আলসার, রক্তকণিকার গোলযোগ, লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সার, লিভারের নানা সমস্যা, লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার, কিডনির মারাত্মক ক্ষতি ইত্যাদি সৃষ্টি করতে পারে। তাই লাচ্ছা কেনার সময় সাদা লাচ্ছাই কিনুন এবং তা যেন অবশ্যই কম তেল-চর্বিযুক্ত হয়। কারণ, এসব চর্বি সহজে হজম হয় না।

চিনি কেনার সময় বেশি সাদা চিনি কেনা অনুচিত। কারণ চিনিকে ধবধবে সাদা করতে ব্যবহৃত হয় ক্ষতিকর হাইড্রোজ। এ হাইড্রোজ নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। অনেকে মনে করেন হাইড্রোজ মানে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড, কিন্তু আসলে তা নয়। হাইড্রোজ মানে সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড বা সোডিয়াম ডাইথায়োনাইট। এটি ব্লিচিং এজেন্ট বলে চিনির স্বাভাবিক লালচে রংকে এ দিয়ে সাদা করা হয়। দেখতে সুন্দর হলেও এটি মুখগহ্বর ও পাকস্থলীর জন্য ইরিটেন্ট। ফলে মুখে প্রদাহ এবং পাকস্থলীতে এসিডের অতিরিক্ত নিঃসরণ ঘটে, নিয়মিত ব্যবহারে যা আলসারে রূপ নিতে পারে। এ ছাড়া গরম পানিতে এ চিনি মেশানোর পর সালফার ডাইঅক্সাইড তৈরি হয়, যা পানির সঙ্গে মিশে সালফিউরাস এসিডে রূপান্তরিত হয়, ফলে পাকস্থলীর এসিড নিঃসরণ ও আলসার সৃষ্টির প্রবণতা বেড়ে যায়। এ ছাড়া হাইড্রোজ কাশি, হাঁপানি, পালমোনারি ইডিমা বা ফুসফুসে পানি জমা, এমনকি নিউমোনাইটিস বা ফুসফুসের জটিল সংক্রমণ ঘটাতে পারে। ময়দা দিয়ে তৈরি খাদ্যসামগ্রীকেও ধবধবে সাদা করতে ব্যবসায়ীরা হাইড্রোজ ব্যবহার করে। আমাদের তাই ধবধবে সাদা চিনি, সেমাই ইত্যাদি পরিহার করা উচিত।

চিনি কেনার সময় দেশি চিনি কিনুন। দেশী চিনি দেখতে খুব আকর্ষণীয় না হলেও এতে হাইড্রোজ দেয়া হয় না বলে স্বাস্থ্যসম্মত। তাছাড়া দেশি চিনির মিষ্টত্বও বেশি, বিদেশি চিনির প্রায় দেড়গুণ। ফলে অল্প পরিমাণ দেশী চিনিতে অনেকটা মিষ্টি স্বাদ পাওয়া যায়, যা বিদেশী সাদা চিনিতে পেতে পরিমাণে অনেক বেশি লাগবে। তাই বিদেশী চিনির বদলে দেশী চিনি ব্যবহারে অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও কম থাকে।

ঈদে গরম মসলাও বিক্রি হয় প্রচুর। গরম মসলার দারুচিনিতে ভেজাল দেয়া হয় লালচে দেখতে গজারি বা অন্যান্য গাছের ছাল দিয়ে। যদিও গজারির ছাল স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, তবে সতর্ক হলে এ ফাঁকিটুকু পরিহার করা সম্ভব। দারুচিনি কেনার সময় বাছাই করে পাতলা ছাল দেখে কিনবেন। মোটা ও গন্ধহীন দারুচিনি কখনও কিনতে নেই।

ঈদে জর্দা খাওয়ার জন্য জাফরানি রং কিনতে গিয়ে আপনি ঠকবেন এটা মোটামুটি নিশ্চিত। কারণ জাফরানি রং অত্যন্ত দামী। দশ-বিশ টাকার আসল জাফরানি রং কোন দোকানির পক্ষে বিক্রি করা সম্ভব নয়। জাফরানি রঙের বদলে তাই বিক্রি হয়ে থাকে একই রকম দেখতে টেক্সটাইল কালার, যা থেকে শারীরিক ক্ষতির কথা আগেই বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হলো রংহীন জর্দা খাওয়ার অভ্যাস করুন। নিতান্তই জর্দাকে দেখতে রঙিন করতে হলে গাজর, বিট বা কমলার খোসা পিষে সেই রসটুকু ব্যবহার করা যেতে পারে। শিউলি ফুলের বোঁটাও এক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। শরৎ হেমন্ত শীতের শিউলি ফুলের পাপড়িগুলো ফেলে দিয়ে বোঁটাগুলো শুকিয়ে বৈয়মে ভরে রেখে দেয়া যায়। জর্দা রান্নার সময় এই বোঁটা ব্যবহারে জর্দা রঙিন হবে। প্রাকৃতিক এই রংটির কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা এখনও জানা যায়নি। একই কারণে পোলাও বা বিরিয়ানিতেও রঙের ব্যবহার বর্জন করুন।

পোলাও-বিরিয়ানি বা কোর্মাতে ঘি ব্যবহার না করাই ভাল। আজকাল বাজারের অধিকাংশ ঘি কী দিয়ে তৈরি হয় তা ম্যাজিস্ট্রেট রুকন-উদ্-দৌলার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অনেক আগেই আমরা জেনে গেছি। ঘি পরিহার করে তাই সয়াবিন তেল দিয়ে রান্না করাই ভাল। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কম থাকবে। খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে রান্না করা পোলাও-বিরিয়ানির স্বাদও চমৎকার।

তবে সরিষার তেলটি খাঁটি কিনা তাও নিশ্চিত হতে হবে। কারণ, বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি সরিষার তেলের অস্বাভাবিক বেশি ঝাঁজ দেখেই বোঝা যায় যে এগুলো নকল সরিষার তেল। এলাইল আইসোথায়োসায়ানেট নামের রাসায়নিক উপাদান সরিষার তেলের এই ঝাঁজের জন্য দায়ী। এটি কেমিক্যালসের দোকানে কিনতে পাওয়া যায় এবং মানুষের অজ্ঞতার কারণে প্রস্তুতকারকরা এ উপাদানটি স্বাভাবিক পরিমাণের চেয়েও বেশি করে মিশিয়ে সরিষার তেলকে বিশুদ্ধ বলে চালিয়ে দেয়। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঝাঁজওয়ালা এসব তেল শরীরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

আমাদের বাজারের অধিকাংশ হলুদ-মরিচ-ধনে-জিরার পাউডারে ভেজাল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে হলুদ ও মরিচের গুঁড়ায় পাওয়া গেছে টেক্সটাইল কালার। এসব নকল মসলা দিয়ে রান্না করা তরকারিতে স্বাভাবিক স্বাদ থাকে না আবার তরকারিও হয় অধিক রঙিন। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অধিকাংশ মসলা কোম্পানির ভেজালের এ অত্যাচারের ফলে আমাদের বোধহয় আবারও শিল-নোড়ার যুগে ফিরে যেতে হবে।

টেক্সটাইল কালারের কারণে বাজারের অধিকাংশ সস ও আচার খাওয়ার অযোগ্য। এছাড়া আইসক্রিম জ্যাম জেলি চানাচুর বিস্কুট কেক লজেন্স চকলেট মিষ্টি ইত্যাদি তৈরিতে দেদার ব্যবহৃত হচ্ছে। শরবত তৈরিতে ব্যবহৃত প্রায় সব পাউডার গ্রানিউলস ও কনসেনট্রেটে ক্ষতিকর বা নিষিদ্ধ টেক্সটাইল কালার রয়েছে। এগুলো ব্যবহারে ভোক্তাকে তাই সাবধান হওয়া উচিত। জনগণের স্বাস্থ্যের বিষয় বিবেচনা করে এগুলোর নিয়ন্ত্রণ আজ সময়ের দাবি।

ঈদে দই-মিষ্টির ব্যবহারও কম নয়। ভোক্তার উপলব্ধি করা উচিত যে দই হলুদ রঙের হতে পারে না। যত গাঢ় দুধ দিয়েই তা তৈরি হোক না কেন দই সাদাই থাকবে, বড় জোর অফ হোয়াইট রঙের হতে পারে, কিন্তু হলুদ কখনই নয়। আপনার স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনা করে যেসব মিষ্টির দোকানে টেক্সটাইল কালার মেশানো হলুদ রঙের দই বিক্রি হয় সেগুলো বর্জন করুন, সাদা রঙের দই কিনুন। মিষ্টির বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। স্বাস্থ্যরক্ষার কারণে যথাসম্ভব রংহীন মিষ্টি খাওয়ার চেষ্টা করুন।

আম-কমলার তথাকথিত জুসগুলো মূলত কৃত্রিম, কিন্তু উন্নত দেশগুলোর মতো এদেশে এগুলোর প্যাকেটের গায়ে ‘কৃত্রিম জুস’ কথাটি লেখা থাকে না। এগুলোতে আম-কমলার উপযুক্ত উপস্থিতি নেই। খাবারের রঙের দাম বেশি বলে এগুলোতে টেক্সটাইল কালার ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞাপনের মোহে পড়ে বিশেষ করে বাচ্চারা যেন এসব তথাকথিত জুস নিয়মিতভাবে খেতে শুরু না করে সে বিষয়ে সতর্ক হোন। কারণ বাচ্চাদের লিভার-কিডনি-অস্থিমজ্জা-ফুসফুস সবই অপরিণত বলে ক্ষতিকর রংগুলো বড়দের চাইতে বাচ্চাদের ক্ষতি করে বেশি।

ঈদে প্রচুর কোল্ড ড্রিংকস খাওয়া হয়। মাঝে মধ্যে পরিমিত কোল্ড ড্রিংকস্ খাওয়া ক্ষতিকর নয়, তবে বেশি পরিমাণে খাওয়া ক্ষতিকর। বিশেষ করে বাচ্চাদের কোলাজাতীয় কোন কোল্ড ড্রিংকস্ দেবেন না। কারণ, এর উচ্চ মাত্রার ক্যাফেইন বাচ্চাদের স্নায়ুকে উত্তেজিত করে, মেজাজ খিটখিটে করে, অস্থিরতা আনে, লেখাপড়ায় গভীর মনোসংযোগে বিঘœ ঘটায়, কিডনিকে চাপে ফেলে। অতিরিক্ত কোলাজাতীয় কোল্ড ড্রিংকস বড়দের জন্যও ক্ষতিকর, বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের ও হৃদরোগীদের জন্য। এ ছাড়া উচ্চমাত্রার ক্যাফেইন হাল্কা নেশাও সৃষ্টি করে। আসুন এবারের ঈদে কোল্ড ড্রিঙ্কস সম্ভব হলে পরিহার করি। বিকল্প হিসেবে বরফ মিশিয়ে লেবুর শরবত পান করি। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও নিরাপদতম কোল্ড ড্রিঙ্কস সম্ভবত বরফ মেশানো লেবুর শরবত।

বাজারে এখন বেশ কিছু এনার্জি ড্রিঙ্কস্ বিভিন্ন নামে পাওয়া যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে এগুলো বাচ্চাদের জন্য নয়, প্রবীণদের জন্যও নয়। কারণ, এর অতি উচ্চমাত্রার সুগার ও ক্যাফেইন উপাদান। নিষিদ্ধ কোন উত্তেজক বা এলকোহল অর্থাৎ মদ এগুলোতে মেশানো হয় কিনা তা চূড়ান্তভাবে জানার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। ইতোমধ্যে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে যে, বাংলাদেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এগুলোর কোন কোনটিতে অতি উচ্চমাত্রার বা বিপজ্জনক মাত্রার ক্যাফেইনের পাশাপাশি যৌন উত্তেজক উপাদানের উপস্থিতি নির্ণয় করেছে। কী সাংঘাতিক! বাংলাদেশের শহর-গ্রামে এখন যে হারে ধর্ষণ বেড়েছে তার পেছনে এসব যৌন উত্তেজক তথাকথিত এনার্জি ড্রিঙ্কসের ব্যবহারও অন্যতম কারণ বলে মনে হয়।

কেউ যদি ভেবে থাকেন যে, আমাদের দেশে তৈরি পণ্যগুলোতেই শুধু ভেজাল থাকে, অতএব এগুলোর বদলে বিদেশী খাদ্যসামগ্রী ব্যবহার করাই ভাল তাহলে ভুল করবেন। আমাদের দেশে আমদানিকৃত অনেক খাদ্যসামগ্রীতে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব উপাদানের মধ্যে ক্ষতিকর রং, ক্ষতিকর টেস্টিং সল্ট এবং ক্ষতিকর কৃত্রিম মিষ্টিকারক প্রধান। অনেক সময় এরা উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ করে না। ব্যবহৃত সব উপাদানও তারা অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখ করে না। খুচরা মূল্য লেখা না থাকা এদের আরেক কারসাজি। তারা আমাদের দেশের দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থার পুরো সুযোগ নেয়। তাই বিদেশী খাদ্যসামগ্রী কেনার সময়ও সতর্কতার সঙ্গে দেখেশুনে কেনার কোন বিকল্প নেই।

শরীর আপনার। শরীরের ভাল-মন্দ দেখাশোনার দায়িত্বও প্রধানত আপনার। আমাদের মতো গরিব ও লুণ্ঠনের অর্থনীতির দেশে রাষ্ট্র ও সরকারের সচেতনতা আপনার সচেতনতার পরিপূরক মাত্র, প্রধান নিয়ামক নয়। যতদিন পর্যন্ত খাদ্যের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা বিষয়ে উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় পরিবেশ তৈরি না হচ্ছে ততদিন আপনাকে আমাকে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই খাদ্যের ভেজাল ও ক্ষতি বিষয়ে সচেতনতা ও সতর্কতার বোধকে আরও শাণিত করতে হবে। আসুন, আমরা এ সতর্কতাকে নিয়মে-অভ্যাসে পরিণত করি। এভাবেই আমরা ঈদ ও অন্য দিনগুলোকে আনন্দময় এবং সুস্বাস্থ্যের করে তুলি।

লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, ফার্মেসি বিভাগ;

সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

abmfaroque@yahoo.com

শীর্ষ সংবাদ: