ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

প্রতিশোধ নিতে বন্ধুকে হত্যা, প্রেমিকাকে ধর্ষণের পর খুন

রাজশাহীর হোটেলে জোড়াখুন, দেড় বছর পর তথ্য উদ্ঘাটন

প্রকাশিত: ০৪:৩৯, ২৮ অক্টোবর ২০১৭

রাজশাহীর হোটেলে জোড়াখুন, দেড় বছর পর তথ্য উদ্ঘাটন

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী ॥ রাজশাহীর নাইস হোটেলে তরুণ-তরুণী খুনের দেড় বছর পর চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। প্রতিশোধ নিতে চার বন্ধু মিলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণীকে ধর্ষণের পর তাকেসহ প্রেমিক ছাত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত চারজনকে গ্রেফতার করে এ তথ্য পেয়েছে। যাদের মধ্যে দুইজন রাজশাহীর মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা স্বীকার করেছে বলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন। মহিদুল বলেন, পুলিশের খাতায় শেষ হওয়া মামলার ছায়া তদন্ত করে পিবিআই। তাদের তদন্তে বের হয়ে আসে এই জোড়া খুনের লোমহর্ষক তথ্য। ঝুলন্ত লাশের হাত বাঁধা ও রুমের মধ্যে একাধিক ব্যান্ডের সিগারেটের শেষ অংশ তাদের সন্দেহ এনে দেয়। এ সন্দেহ থেকে তারা তদন্ত শুরু করে। এ ঘটনার সঙ্গে ওই চারজন ছাড়াও আরও কেউ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে বলে জানান মহিদুল। গত বছর ২২ এপ্রিল রাজশাহীর অভিজাত নাইস হোটেলের একটি কক্ষ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মিজানুর রহমান মিজান ও পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী সুমাইয়া নাসরিনের লাশ উদ্ধার করা হয়। মিজানুরের লাশ ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝোলান ছিল। আর সুমাইয়ার লাশ বিছানায় পড়েছিল। ঘটনার পরের দিন ২২ এপ্রিল সুমাইয়ার বাবা আব্দুল করিম বাদী হয়ে নগরের বোয়ালিয়া থানায় হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। এতে তরুণ হত্যার পর হোটেল কর্মচারীদের সহযোগিতায় তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ করা হয়। রাজশাহী নগরের বোয়ালিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সেলিম বাদশা প্রথমে মামলাটি তদন্ত করেন। তবে পাশাপাশি মামলাটির ছায়া তদন্ত করেছিল পিবিআই। পুলিশ পরিদর্শক মামলাটি তদন্ত শেষে সুমাইয়াকে ধর্ষণের পরে হত্যা করে মিজানুর নিজেই আত্মহত্যা করেছেন বলে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরে পিবিআই চারজনকে গ্রেফতার করে। এরা প্রতিশোধ নিতে খুন করে প্রেমিক-প্রেমিকাকে। চার খুনীরা হলেনÑ রাজশাহীর বরেন্দ্র কলেজের ছাত্র আহসান হাবিব ওরফে রনি (২০), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাহাত মাহমুদ, রাজশাহী কলেজের ছাত্র আল আমিন ও বোরহান কবির উৎস। এদের মধ্যে রনি পাবনার ফরিদপুর উপজেলার এনামুল হক সরদারের ছেলে। রাহাতের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলর খোর্দ্দ গজাইদ গ্রামে। তার বাবার নাম আমিরুল ইসলাম। আর আল আমিন রাজশাহীর পবা উপজেলার জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের টিপু সুলতানের ছেলে এবং উৎস নাটোরের লালপুর উপজেলার উত্তর লালপুর গ্রামের শফিউল কালামের ছেলে। পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মহিদুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতার চারজনের মধ্যে রনি ও উৎসব আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা স্বীকার করেছে। রাহাত ও আল আমিনকে আবারও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানান তিনি। মহিদুল বলেন, আহসান হাবিব রনি রাজশাহীর বরেন্দ্র কলেজের ছাত্র হলেও ঘটনার পর থেকে সে ঢাকায় অবস্থান করছিল। গত ১৮ অক্টোবর তাকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনার দিন নিহত মিজানুর ও রনির একটি ফোন কলের সূত্র ধরে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এর পরের দিন তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজশাহী নগরের একটি ছাত্রাবাস ও সোনাদিঘী এলাকা থেকে রাহাত মাহমুদ, আল আমিন ও উৎসকে গ্রেফতার করা হয়। ২০ অক্টোবর তাদের আদালতে হাজির করা হলে রবি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। অপর তিনজনকে চারদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ২৩ অক্টোবর তাদের তিনজনকে আদালতে হাজির করা হলে উৎস ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়ে ধর্ষণ ও দুইজনকে হত্যার কথা স্বীকার করে। রাজশাহী মহানগর হাকিম জাহিদুল ইসলাম রনির এবং কুদরাত-ই-খোদা উৎসবের জবানবান্দী রেকর্ড করেন। রনি স্বীকার করেন, হোটেল কক্ষে মিজানুরকে প্রথমে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এর পর তারা সমুাইয়াকে সবাই মিলে ধর্ষণ করেন। পুলিশের মেয়ে বলে ঘটনা ফাঁস হওয়ার ভয়ে তারা তাকেও মুখে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে। জবানবন্দীতে হাবিব আরও বলে, রাহাত মাহমুদের সঙ্গে প্রথমে সুমাইয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরে মিজানুরের সঙ্গে নতুন করে তার প্রেমের সম্পর্ক হয়। এ নিয়ে রাহাত তার ওপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য পরিকল্পনা করে। রাহাত নগরের বিনোদপুরের একটি ছাত্রাবাসে থাকত। সেখানে তিনি আহসান হাবিবকে ডেকে নিয়ে তার পরিকল্পনার কথা বলেন। মিজানুরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কথা শুনে আহসান হাবিব বলেন, মিজানুরকে তিনি চেনেন। সে ল্যাংড়া। এরই মধ্যে মিজানুরের সঙ্গে দেখা করার জন্য সুমাইয়া রাজশাহীতে আসে। মিজানুর তাকে নাটোরের বনপাড়া থেকে এগিয়ে নিয়ে আসে। সে সময় মিজানুর আহসান হাবিবকে ফোন করে জানতে চান শহরের কোন হোটেলে উঠলে ভাল হয়। আহসান হাবিব তাকে হোটেল নাইসে উঠার পরামর্শ দেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১ এপ্রিল রাত ৮ থেকে ১০টার মধ্যে হোটেল কক্ষে তারা মিজানুর ও সুমাইয়াকে হত্যা করে। আদালতে আহসান হাবিব বলেছে, হোটেলের ওই কক্ষে ঢুকে তারা প্রথমে শুধু সুমাইয়াকে পান। তারপর তারা মিজানুরকে ফোন করে ডাকার জন্য সুমাইয়াকে চাপ দেন। বাধ্য হয়ে সুমাইয়া মিজানুরকে ফোন করে ডাকেন। জবানবন্দীতে উৎস বলে, পাশের ভবনে এসির উপর দিয়ে গিয়ে তারা জানালা দিয়ে সুমাইয়ার রুমে প্রবেশ করে। মিজান রুমে আসার পর তার সঙ্গে রাহাতের কথা কাটাকাটি হয়। এর এক পর্যায়ে রাহাত টি টেবিলের পায়া খুলে মিজানের মাথায় আঘাত করে। এতে তার মাথা ফেটে রক্ত বের হয়ে যায়। এর পর সুমাইয়ার ওড়না দিয়ে গালায় ফাঁস দিয়ে রাহাত ও রনি মিজানকে হত্যা করে।