ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

জাহাজ ভাঙ্গার নীতিমালা

প্রকাশিত: ০৫:৪৬, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৬

জাহাজ ভাঙ্গার নীতিমালা

কোন বিধিবিধান ও নিয়মনীতি ছাড়াই গত চার দশক ধরে চলে আসছে জাহাজ ভাঙ্গার কাজ। সরকার এই খাতকে শিল্প হিসেবে মর্যাদা দিলেও এর জন্য কোন নীতিমালা ছিল না। অবশেষে সরকারের পক্ষ থেকে এ শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের অপেক্ষায় এখন। দেশের ক্রমবর্ধমান অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্পায়নের স্বার্থে সরকার জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প বিকাশে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলে আসছে। কিন্তু বাস্তবে তা দৃশ্যমান নয়। এই শিল্পের জন্য ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো এবং শুল্কায়নের ক্ষেত্রে থাকা সব বাধা দূর করার জন্য এখনও কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বিশ্বে যে পরিমাণ জাহাজ ভাঙ্গা হচ্ছে তার ষাট ভাগই হচ্ছে বাংলাদেশে। শিল্পটি ক্রমশ গুরুত্ব লাভ করছে এ দেশে। চট্টগ্রামের সীতাকু-ে সাগর তীরে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই শিল্পের বিস্তৃতি ঘটেছে। প্রায় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে এই খাতে। এ থেকে সরকার প্রতিবছর প্রচুর রাজস্ব আদায় করছে। ভূমি ইজারা থেকে আরও দু’শ’ কোটি টাকার মতো আদায় হচ্ছে। এই শিল্পে কর্মরত প্রায় আড়াই লাখ শ্রমিক। তবে এই শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্টিল, রি-রোলিং ও অটো রি-রোলিংসহ চারটি শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা পঞ্চাশ লাখেরও বেশি। বেকারত্ব দূরীকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প বিরাট সহায়ক ভূমিকা পালন করে চলেছে। জাহাজ ভাঙ্গা ও রি-সাইক্লিংকে সরকারীভাবে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এর উন্নয়নে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পাঁচ বছর আগে শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করার নির্দেশ দিয়েছেন। বলা যায় দেশের শিল্পোন্নয়নের বর্তমান পরিবেশে পুরনো ও অচল জাহাজ ভেঙ্গে দেশে স্টিল মিলগুলোর কাঁচামাল সরবরাহ অনেকদিন ধরেই চলে আসছে। বিদেশ থেকে স্ত্র্যুাপ আমদানি করাটা বেশ ব্যয় বহুল ব্যাপার। নির্মাণ শিল্পের জন্য অপরিহার্য এমএস রড, ডিফর্মড বার ইত্যাদি সরবরাহ বজায় রাখতে হলে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের স্ক্র্যাপ ব্যবহার করতে হয়। দেশে খনির লোহার আকর ব্যবহার করে নতুন করে স্টিল মিল স্থাপন দুরাগত ব্যাপার। এ বিষয়টি মনে রেখেই জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পকে বিচার করতে হয়। লৌহ শিল্পখাতের শতকরা আশিভাগ লোহা আসে জাহাজ ভাঙ্গা থেকে। রি-রোলিং মিলগুলো মূলত এই শিল্পের ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে। এতে বিনিয়োগ হয়েছে ত্রিশ হাজার কোটি টাকার বেশি। রড রফতানিতে বাংলাদেশের অবারিত আয়ের সুযোগ রয়েছে। এ রফতানির মাধ্যমে কুড়ি হাজার কোটি টাকা বাড়তি আয় সম্ভব। তথাপি দেশে রড আমদানি থেমে থাকছে না। আবার এই শিল্প থেকে হাল্কা প্রকৌশল শিল্পের অধিকাংশ কাঁচামাল যোগান দেয়া হয়ে থাকে। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা এবং অর্থায়নের অভাবে প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশীয় হাল্কা প্রকৌশল শিল্পের বিকাশ ঘটছে না। দেশে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক দিক। দেশে প্রায় ছয় শ’ রড তৈরির কারখানা রয়েছে। এগুলোর কাঁচামালের ষাট থেকে সত্তর শতাংশই আসে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প থেকে। যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের অন্তত এক কোটি লোক জড়িত। পরিবেশবাদীদের পদক্ষেপ ও প্রস্তাবনা এ শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কর্মরত শ্রমিকরা যাতে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে। সেই পদক্ষেপ নেয়া জরুরী। এসব বিবেচনায় এ শিল্পে শ্রমিক ও পরিবেশবান্ধব নিয়মনীতির প্রয়োগ সর্বাগ্রে জরুরী। শিল্পের নানামাত্রিক ঝুঁকি যথাসম্ভব কমিয়ে আনা না গেলে আখেরে লাভের চেয়ে ক্ষতিই হবে বেশি। শিল্পকে শিল্প হিসেবে কার্যকর করে তার শনৈঃ শনৈঃ উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নেয়াই হবে যুৎসই কাজ।