শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার বুক চিরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে বয়ে আসা খরস্রোতা ভোগাই নদীটি বর্ষাকালে যেমন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে আর শুষ্ক মৌসুমে নানা ধরনের শাকসবজি ফলানোর জন্য স্থানীয় কৃষকদের যেন বুক চিতিয়ে দেয়। তার বুক চিরে কৃষক সবজি চাষ করে সংসারের খরচ জোগানোর হাল ধরে বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন দেখেন। বর্তমান মৌসুমে ভোগাই নদীর পাড়ে নানা জাতের সবজি চাষ করে লাভবান হচ্ছেন এলাকার কৃষকরা।
নালিতাবাড়ী উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৮০ হেক্টর ফসলি জমিতে শাকসবজি চাষ করা হয়েছে। এই উপজেলায় এর লক্ষ্যমাত্রাও ছিল ১ হাজার ৮০ হেক্টর। পাশাপাশি ভোগাই ও চেল্লাখালী এই দুটি নদীর পাড়ের কৃষকরা ধান ও নানা জাতের সবজি চাষ করেছেন। এতে অনায়াসেই স্থানীয় বাজারে সবজির চাহিদা মিটছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার ভোগাই নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ এলাকার নদীর চর। আর সেই চর থেকে ফসল ফলিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে স্থানীয় কৃষকেরা। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ভেসে উঠা চরে শাকসবজি চাষ করেছেন তারা।
বর্তমানে যতদূর চোখ যায় তাতে দেখা যায় সবুজ আর সবুজ। নদীর পাড়ের কৃষকরা দেশি ও হাইব্রিড জাতের শাকসবজি চাষ করায় ভোগাই নদীর চরে যেন সবুজের সমারোহ চলছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ভোগাই নদীর পাড় ভেঙে গিয়ে প্রতিবছরই ভিটেমাটি ছাড়া হন অনেক কৃষক পরিবার। এতে হারিয়ে ফেলেন তাদের চাষযোগ্য জমিটুকু। এমতাবস্থায় দুর্ভোগ নেমে আসে তীরবর্তী বাসিন্দাদের। সেই দুর্ভোগ থেকে উত্তরণের জন্য এই নদীর চরেই শাকসবজি চাষ করে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনেন কৃষকেরা।চর থেকে ঢলের পানি নেমে যাওয়ার পর পলিমাটি পড়ে উর্বর হওয়ায় কম খরচেই বেশি ফলন পাওয়া যায়। বর্তমান মৌসুমে শাকসবজি চাষের ফলে সবুজ অরণ্যের মতো ছেয়ে গেছে ভোগাই নদীর চর। ভালো সবজির ফলন পেয়ে কৃষকরাও খুশি। নালিতাবাড়ী উপজেলার ভোগাই নদীর তীরবর্তী নয়াবিল ইউনিয়নের চারআলী, নাকুগাঁও, কালাকুমা, ঘাকপাড়া, করেঙ্গাপাড়া, শিমুলতলা। আর দক্ষিণ তথা ভাটির দিকে মরিচপুরান ইউনিয়নের কোন্নগর, ফকিরপাড়া, বেনীরগোপ গ্রাম রয়েছে। এ ছাড়া পার্শ¦বর্তী নকলা উপজেলার উরফা, পিছলাকুড়ি ও তারাকান্দা এলাকায় ভোগাই নদীর জেগে উঠা চরে দেশি-বিদেশি এবং হাইব্রিডসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষ করেছেন কৃষকেরা। ভালো ফলনের পাশাপাশি চলতি মৌসুমে কাক্সিক্ষত দরে বিক্রি হচ্ছে কৃষকের এসব শাক ও সবজি জাতের ফসল।
উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের নাকুগাঁও গ্রামের কৃষক আল আমীন জানান, ‘কোথাও সামান্য করে জমি চাষ আবার কোথাও চাষ ছাড়াই আলু, পেঁয়াজ, রসুন, বেগুন, টমেটো, মিষ্টি কুমড়া, মুলা, গাজর, শসা লাউ, কাঁচামরিচ, কুমড়া, ডাঁটা শাক, মুলা শাক, কলমি শাক, লাউ শাক, পালং শাকসহ বিভিন্ন শাকসবজি চরে চাষ করেছেন তারা। ইতিমধ্যে ফসল উঠতে শুরু করেছে। আশানুরূপ ফলনের পাশাপাশি দামও পাচ্ছেন ভালো। এভাবে উজান থেকে ভাটি পর্যন্ত কয়েকশ’ কৃষক ভোগাইয়ের চরে চাষ করেছেন রবি মৌসুমের নানা জাতের শাকসবজি। কেউ বাণিজ্যিক কেউবা পরিবারের পুষ্টি চাহিদা মেটাতেই এসব ফসল চাষে ঝুঁকেছেন।’
নালিতাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মশিউর রহমান বলেন, ‘উপজেলার ভোগাই ও চেল্লাখালী নদীর পাড়ে ধান ও সবজি চাষে ঝুঁকছে কৃষক। স্থানীয় চাহিদা মেটাতে কৃষকের এই উদ্যোগে কৃষি বিভাগ পাশে আছে। এমনকি শাকসবজি চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে কৃষি অফিস নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কৃষকদের নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে আসছেন।’
প্যানেল / জোবায়ের








