ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

স্প্যান বসানোর কাজ শেষ

যমুনায় বঙ্গবন্ধু রেল সেতুর ৪.৮ কিমি এখন দৃশ্যমান

বাবু ইসলাম, সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ০০:১৬, ২৩ এপ্রিল ২০২৪

যমুনায় বঙ্গবন্ধু রেল সেতুর ৪.৮ কিমি এখন দৃশ্যমান

সিরাজগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতুর দুই প্রান্তের সংযোগের কাজ সম্পন্ন

প্রমত্ত যমুনা নদীর ওপর নির্মাণাধীন বাংলাদেশ রেলওয়ের মেগা প্রকল্প এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যের স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতুর সর্বশেষ স্প্যানটি বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। সর্বশেষ স্প্যানটি বসানোর পর যমুনা নদীর ওপর সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল প্রান্তের সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। সেতুর চার দশমিক আট কিমি এখন পুরোটাই দৃশ্যমান।

‘বঙ্গবন্ধু শেখ  মুজিব রেলওয়ে সেতু’র প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান সোমবার দুপুরে জনকণ্ঠকে বলেছেন, সেতুর সুপার স্ট্রাকচার স্থাপন কাজ পুরোটাই শেষ হয়েছে। নির্মাণ কাজও ৮৫ শতাংশ সম্পন্ন। এখন স্লিপারবিহীন রেলপথ স্থাপন, উভয় প্রান্তের রেলস্টেশন আধুনিকায়নসহ রেলসেতুর কিছু কাজ বাকি রয়েছে। রেলসেতুতে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণও শেষের দিকে।

ডিসেম্বর মাসে পুরো কাজ শেষ হয়ে যাবে আশা করা হচ্ছে। এরপর পরীক্ষামূলক সব কাজ শেষ করে উত্তরাঞ্চলবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের এই রেলসেতু চলতি বছরের ডিসেম্বরে চলাচলের জন্য প্রস্তুত হবে এবং উদ্বোধনী প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে আশা করছেন এই প্রকল্প কর্মকর্তা। 
প্রমত্ত যমুনা নদীর গভীরতা ও ¯্রােতের সঙ্গে যুদ্ধ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতুর ভৌত অবকাঠামোর কঠিনতম কাজ নদীর তলদেশে  ৫০টি পাইল বা পিলার স্থাপন করার মধ্য দিয়ে রেলসেতুর মূল অবকাঠামোর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। পিলারের ওপর স্থাপন করা হয় পিয়ার। আর এই পিয়ারের ওপর সুপার স্ট্রাকচার  ৪৯টি স্প্যান স্থাপনের পর চার দশমিক আট কিমি দীর্ঘ সেতুর পুরোটাই এখন দৃশ্যমান।
রেল মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু রেলসেতুটি চালু হলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সারাদেশের রেলযোগাযোগ ও রেলওয়ে পরিবহন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। অভ্যন্তরীণ রেল যোগাযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি ট্রান্সএশিয়ান রেলপথে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জন করবে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে দেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার  হবে।
যমুনা নদীর ওপর নির্মিত বঙ্গবন্ধু সেতুর ৩০০ মিটার উজানে দেশের দীর্ঘতম ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনের সেতু নির্মাণ কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেতু নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে ৭২ ভাগ অর্থ ঋণ দিচ্ছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)।

জাপানের আইএইচআই, এসএমসিসি, ওবায়শি করপোরেশন, জেএফই ও টিওএ করপোরেশন এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার থেকে আনা বিশেষভাবে তৈরি মরিচারোধী বড় বড় স্টিলের কাঠামো দিয়ে তৈরি করা স্প্যান সেতুর ওপর বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু রেলসেতুতে দেশে প্রথমবারের মতো ব্যবহার হচ্ছে জাপানি আধুনিক ডাইরেক্ট রেল ফ্যাসেনার প্রযুক্তি।

এই প্রযুক্তিতে স্প্যানের ওপর সরাসরি বসানো হচ্ছে রেললাইন। এতে সেতুর ওপর রেললাইনের স্থায়িত্ব বাড়ার পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ খরচও কম হবে। বিভিন্ন পর্যায়ে কাজের অগ্রগতি ৮৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। 
প্রমত্ত যমুনা নদীর ওপর তিনশ মিটার দূরত্বে পাশাপাশি দুটি সেতু। একটি চলমান বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু, অপরটি নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু। বাংলাদেশ রেলওয়ের মেগা প্রকল্প দেশের বৃহত্তম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু ডুয়েল গেজ ডাবল ট্রাক সংবলিত রেলসেতু। এই সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হলে সেতুর ওপর দিয়ে ২০২৪ সালে ডিসেম্বর মাস নাগাদ ব্রডগেজ ও মিটারগেজ দুই ধরনের ট্রেনই ঘণ্টায় ১২০ কিমি গতিতে পারাপার হতে পারবে।

জাপান ও বাংলাদেশের যৌথ অর্থায়নে ১৬ হাজার ৭শ ৮১ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প এখন বাস্তবায়নের পথে। দেশ-বিদেশের সাত হাজারেরও বেশি  শ্রমিক আর প্রকৌশলীর অক্লান্ত পরিশ্রমে টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ প্রান্তে দুটি প্যাকেজের আওতায় চলছে এই রেলসেতুর নির্মাণ কাজ। রেলসেতু চালু হলে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনে আরও গতি আসবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হবে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এই সেতু চালুর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ খাতে সড়কপথের পাশাপাশি রেল যোগাযোগে আমূল পরিবর্তন হবে, খুলে যাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অপার সম্ভাবনার দুয়ার। 
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবু ইউসুফ সূর্য বলেন, বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র ৩৮টি ট্রেন চলাচল করতে পারে। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু চালু হওয়ার পর ৮৮টি ট্রেন চলাচল করতে পারবে। অপর প্রান্তের ট্রেনকে পারাপারের জন্য রেল থামিয়ে বসে থাকতে হবে না। কারণ এটি ডবল লাইনের হওয়ায় একইসঙ্গে একাধিক ট্রেন চলতে পারবে। এতে এ অঞ্চলে ব্যবসার প্রসার ঘটবে।

রেলসেতুটি নির্মাণ শেষ হলে আন্তঃদেশীয় যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি চলাচল করতে পারবে। এতে আমদানি-রপ্তানি খরচ কমে যাওয়াসহ বঙ্গবন্ধু সেতু ও মহাসড়কের ওপর চাপ কমবে। রেলসেতুটি নির্মিত হলে বঙ্গবন্ধু সেতুর ঝুঁকিও হ্রাস পাবে। একইসঙ্গে উত্তরবঙ্গ থেকে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সহজ হবে, কমবে পরিবহন খরচ, যা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সামাজিক জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
সিরাজগঞ্জ-২ (সদর-কামারখন্দ) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ড. জান্নাত আরা হেনরী বাংলাদেশ রেলওয়ের মেগাপ্রকল্প যমুনা নদীর ওপর রেলসেতু নির্মাণ প্রসঙ্গে বলেছেন- তাঁর নাড়িপোতা সয়দাবাদ ইউনিয়নে রেলসেতুর নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের পথে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন- রেলসেতুর নির্মাণ কাজ দ্রুততম সময়ে শেষ হবে।

এটি হবে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের মেলবন্ধন। রেলসেতুটি নির্মাণ শেষ হলে আন্তঃদেশীয় যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি চলাচল করতে পারবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে সড়কপথের পাশাপাশি রেলপথেও পণ্য পরিবহন সহজতর হবে এবং খরচও সাশ্রয় হবে। উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সামাজিক জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনবে।
প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে সেতুটিতে ৫০টি পিয়ার এবং দুটি পিয়ারের মাঝখানে একটি করে মোট ৪৯টি স্প্যান বসানো ও কাজ শেষ। প্রতিটি স্প্যানের দৈর্ঘ্য গড়ে ১শ মিটার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান সোমবার জনকণ্ঠকে বলেছেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম মেগা প্রকল্প দীর্ঘতম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণের কাজ ৮৫ শতাংশ শেষ হয়েছে।

এখন ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই সেতুর সুপার স্ট্রাকচার পুরোটাই দৃশ্যমান। তবে এখনো রেলসেতুর উভয় পারের রেলওয়ে স্টেশন আধুনিকায়ন, স্লিপারবিহীন রেলপথ স্থাপনসহ  কিছু কাজ বাকি রয়েছে। রেলসেতুতে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণও শেষের দিকে। ডিসেম্বর মাসে পুরো কাজ শেষ হয়ে যাবে বলে আশা করছি। এরপর পরীক্ষামূলক সব কাজ শেষ করে উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের এই রেলসেতু চলাচলের জন্য প্রস্তুত হবে এবং উদ্বোধনী প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে আশা করছেন এই প্রকল্প কর্মকর্তা। 
তিনটি প্যাকেজে আন্তর্জাতিক তিনটি জয়েন্ট ভেঞ্চার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে ডব্লিউডি-১ প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে জাপানের ওবাইসি-আইএইচআই ও এসএমসিসি নামে তিনটি জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি। ডব্লিউডি-২ প্যাকেজের কাজ করছে জাপানের আইএইচআইও এসএমসিসি কোম্পানি এবং ডাব্লিউডি-৩ প্যাকেজের কাজও করছে জাপানের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যমুনা নদীর ওপর নির্মাণাধীন রেলসেতুতে সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল প্রান্তে সহস্রাধিক দেশী-বিদেশী প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।

×