ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২০ মে ২০২৪, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

কথা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী

পাইপলাইনের মাধ্যমে রংপুরে গ্যাস সংযোগ শীঘ্রই

নিজস্ব সংবাদদাতা, রংপুর

প্রকাশিত: ০০:১৪, ৪ অক্টোবর ২০২৩

পাইপলাইনের মাধ্যমে রংপুরে গ্যাস সংযোগ শীঘ্রই

পাইপলাইনের মাধ্যমে রংপুরে গ্যাস সংযোগ

কথা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। রংপুরের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল বেশ কয়েকটি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রংপুর বিভাগ, সিটি করপোরেশন, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড, রংপুর-ঢাকা ছয় লেন মহাসড়ক এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে রংপুরে গ্যাস সংযোগ। শিক্ষা বোর্ড চারদলীয় জোট সরকার আগেই দিনাজপুরে করেছে। রংপর বিভাগ, রংপুর সিটি করপোরেশন এবং বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে হাসিনার সরকার। রংপুর-ঢাকা ছয় লেন মহাসড়ক নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের পথে। এবার পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সংযোগ অতিদ্রুতই হতে যাচ্ছে। ২০১১ সালে রংপুর সফরে এসে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পরই রংপুরে পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয় তার সরকার। শুরু হয় বগুড়া থেকে রংপুর হয়ে নীলফামারী পর্যন্ত গ্যাস সঞ্চালনের পাইপলাইন স্থাপনের কাজ।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বগুড়া থেকে ১৫০ কিলোমিটার গ্যাস সঞ্চালনের পাইপলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। শেষ হয়েছে কমিশনিং প্রক্রিয়াও। এখন অপেক্ষা বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস সরবরাহের। রংপুরে পাইপলাইনের মাধ্যমে এ মাসের মধ্যে পরীক্ষামূলক গ্যাস সরবরাহ করার প্রস্তুতি নিয়েছে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ব্যাপক আকারে সরবরাহ শুরু হতে কয়েক মাস লাগবে। 
জিটিসিএল জানায়, ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে বগুড়া-রংপুর-সৈয়দপুর গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এটি চলতি বছরের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময়ের আগে মে মাসেই প্রকল্পের পুরো ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ করে জিটিসিএল।
চলতি বছরে গত ২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রংপুর জিলা স্কুল মাঠের জনসভায় রংপুর বিভাগে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা স্থাপনের অঙ্গীকার করেন। প্রধানমন্ত্রীর এ জনসভার পর রংপুর বিভাগে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ প্রকল্পে গতি বেড়েছে। এ মাসের মধ্যে পাইপলাইনের মাধ্যমে কয়েকটি শিল্প-কারখানায় পরীক্ষামূলকভাবে গ্যাস সরবরাহ করতে চায় জিটিসিএল। যদিও রংপুর বিভাগে স্থাপিত সব শিল্প-কারখানা বৈদ্যুতিক সংযোগের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তবে কারখানাগুলোতে গ্যাস জেনারেটর না থাকায় গ্যাসের সুফল পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। 
সংশ্লিষ্টরা জানান, এ কাজে অধিগ্রহণ করা ৩০৫ একর জমিতে বগুড়া থেকে রংপুর হয়ে  সৈয়দপুর পর্যন্ত ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের উচ্চচাপসম্পন্ন গ্যাস সঞ্চালন লাইন স্থাপন শেষ হয়েছে। এর মধ্যে পীরগঞ্জ টিবিএস-২০ এমএমএসসিএফডি (সিটি গেট স্টেশন), রংপুর টিবিএস-৫০ এমএমএসসিএফডি, সৈয়দপুর সিজিএস-১০০ এমএমএসসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন লাইন দিয়ে প্রতিদিন সরবরাহ সক্ষমতা ৫০ কোটি স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক ফিট গ্যাস।
রংপুরবাসীর স্বপ্নের এই সঞ্চালন লাইনের পাশাপাশি বিতরণ লাইন নির্মাণের পৃথক প্রকল্পও হাতে নিয়েছে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। প্রকল্পের আওতায় ১০০ কিলোমিটার থাকবে বিতরণ লাইন। এর মধ্যে রংপুর শহরে ৪৪ কিলোমিটার, পীরগঞ্জে ১০ কিলোমিটার এবং নীলফামারী ও উত্তরা ইপিজেড এলাকায় ৪৬ কিলোমিটার অংশ রয়েছে।
এদিকে পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্যাস কোম্পানি মিটারিং স্টেশন, ডিআরএস স্থাপনে বিদেশ থেকে মালামাল আমদানি, জমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ঠিকাদারও নিয়োগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে এসব কাজ সম্পন্ন হবে।
বগুড়া-রংপুর-সৈয়দপুর গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক আমিরুজ্জামান বলেন, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে পাইপলাইনের মাধ্যমে দু’একটি কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে করে স্থাপিত পাইপলাইনের কোনো ত্রুটি থাকলে সেটি চিহ্নিত করা যাবে। তবে এখন পর্যন্ত রংপুর বিভাগে শিল্প-কারখানায় গ্যাসচালিত জেনারেটর নেই। শুরুতে গ্যাস জেনারেটর রয়েছে এমন শিল্প-কারখানা পাবে বলে আশা করছি।
জিটিসিএর প্রকল্প কর্মকর্তা মো. জিয়াউল হক জানান, গেল সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখে  সৈয়দপুর পর্যন্ত পাইপলাইনে পরীক্ষামূলকভাবে গ্যাস সঞ্চালন করে দেখেছি। তবে কোনো কলকারখানা বা শিল্পোদ্যোক্তাকে এখনো গ্যাস সরবরাহ সংযোগ দেওয়া হয়নি। পাইপলাইনে সরবরাহ সঞ্চালন সংযোগ ঠিকঠাক রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই।
পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক ও রংপুর, নীলফামারী, পীরগঞ্জ শহর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় গ্যাস বিতরণ পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফজলুল করিম বলেন, বগুড়া থেকে রংপুর হয়ে সৈয়দপুর পর্যন্ত গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। আমরা পাইপলাইনে সরবরাহকৃত গ্যাস বিতরণ কার্যক্রমে রয়েছি। গ্যাস বিতরণ কার্যক্রমে আমাদের প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। গ্যাস বিতরণের জন্য মিটারিং স্টেশন, ডিআরএস স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে এসব কাজ সম্পন্ন হবে। এরপর সরকারের নির্দেশনা অনুসারে আমরা সংশ্লিষ্ট এলাকা কিংবা শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করতে পারব। এতে করে উত্তরাঞ্চলে ভারী শিল্প গড়ে ওঠার মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে। আপাতত শিল্প, কলকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এমনকি ক্ষুদ্র পর্যায়ের উদ্যোক্তারাও পাবেন এ গ্যাসের সুফল।
এদিকে, আপাতত ভারী শিল্প-কারখানা, ইপিজেড এবং রিফুয়েলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের থাকলেও ক্ষুদ্র শিল্পকেও দ্রুত সময়ে গ্যাস সরবরাহের দাবি স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের। তারা জানান, ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পরও শুধুমাত্র জ্বালানির অভাবে এতদিন শিল্পের বিকাশ ঘটেনি রংপুর অঞ্চলে। যে কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে শিল্প বাণিজ্যে অনেক পিছিয়ে রংপুর। তবে সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রংপুরে সরাসরি পাইপলাইনে গ্যাস আসার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় খুশি এই অঞ্চলের মানুষ।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। ঘোষণা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহে পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ হওয়ার পথে। আমরা রংপুরবাসী গ্যাস সরবরাহের প্রাথমিক প্রস্তুতিতে অত্যন্ত খুশি। শিল্পোদ্যোক্তাসহ ব্যবসায়ী মহলের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল এ অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের। এ জন্য বহুবার হরতাল, মিটিং মিছিলও হয়েছে। এখন সবার দাবি, আর প্রকল্পের মেয়াদ না বাড়িয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ কার্যক্রম শুরু করার। 
রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. আকবর আলী বলেন, পীরগঞ্জ থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত মহাসড়কের পাশে অনেক দেশী-বিদেশী শিল্পোদ্যোক্তা প্লট ক্রয় করে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে আমাদের এখানে আরও বেশি কলকারখানা গড়ে উঠবে। এতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সংকট কমে যাবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও বেশি দৃশ্যমান হবে। এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে।

×