ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০

বাতাসে ভাসছে বিষ, ব্যাহত উদ্ভিদের পরাগায়ণ

গিয়াস উদ্দিন ফরহাদ, নোয়াখালী 

প্রকাশিত: ২০:৪৭, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

বাতাসে ভাসছে বিষ, ব্যাহত উদ্ভিদের পরাগায়ণ

পোড়ানো হচ্ছে আর্বজনা। ছবি: জনকণ্ঠ

নোয়াখালীতে অতিমাত্রায় বাড়ছে বায়ু দূষণ। বায়ুতে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার দৈনিক আদর্শ মান ৬৫ মাইক্রোগ্রাম। জেলায় বায়ুতে প্রতি ঘনমিটারে রয়েছে ২০৪ দশমিক শূন্য ১ মাইক্রোগ্রাম। যা আদর্শ মানের তিন গুণের বেশি। 

মানবদেহে ফুসফুসের জটিলতা, প্রজননসহ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে জেলার ৯টি উপজেলার বাসিন্দারা।

এদিকে জেলা শহর মাইজদী, চৌমুহনী, সোনাইমুড়ী, চাটখিল, বসুরহাটসহ বিভিন্ন পৌর শহর ও বড় বড় হাট বাজারের হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে বাড়ছে বায়ুদূষণ সংশ্লিষ্ট রোগীর সংখ্যা। একই সঙ্গে উদ্ভিদের পরাগায়ন সমস্যার কারণে ব্যাপক ফলন বিপর্যয়সহ পরিবেশ-প্রতিবেশও হুমকিতে পড়বে বলে মনে করেন পরিবেশবিদেরা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) ‘৬৪ জেলার বায়ুদূষণ সমীক্ষা ২০২১’ নামের একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে গাজীপুর দূষণে শীর্ষে রয়েছে বলে জানানো হয়। এতে নোয়াখালী জেলা পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।

স্থানীয়দের তথ্য মতে, চৌমুহনী চৌরাস্তার বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন চত্বর থেকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড পর্যন্ত ৫৯ কিলোমিটার দীর্ঘ আঞ্চলিক মহাসড়কটি ফোর লেনে উন্নীত করার ফলে প্রতিনিয়ত সড়কের পাশের পাকা ভবনগুলো ভাঙচুর, সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ধুলাবালির সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া পৌর শহরগুলোর যত্রতত্র বর্জ্য-ময়লা-আবর্জনা পোড়ানোর ধোঁয়ায় বায়ু দূষণ হচ্ছে প্রতিদিন।

এ ছাড়া জেলার বেগমগঞ্জ-কুমিল্লা, চৌমুহনী-ফেনী ও চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর সড়কেও চলছে উন্নয়নকাজ। ফলে খোঁড়াখুঁড়ি, বহুতল ভবন ভাঙা, ইট-বালু ও পাথরের স্তূপ থেকে তৈরি হওয়া ধুলা থেকে অতিষ্ঠ জনজীবন।

সোনাইমুড়ী পৌরসভার কালুয়াই এলাকার বাসিন্দা মো, হারুন বলেন, পৌর এলাকার ময়লা-আবর্জনার বর্জ্য পোড়ার ধোঁয়ায় শিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত রোগ নানাবিধ সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ময়লার দুর্গন্ধে বমি আসে।

নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর সড়কের চৌমুহনী পৌরসভার বাসিন্দা হাসান করিম বলেন, ময়লা পোড়ানোর গন্ধে আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে যায়। পৌরসভার বর্জ্যগুলো সংরক্ষণ ও ধ্বংসের জন্য আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থাপন করলে সাধারণ মানুষ হয়ত কিছুটা স্বস্তি পাবে।

জেলা শহরের দত্তবাড়ির মোড় এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী ও কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়ক উন্নয়নের কাজ করায় প্রতিনিয়ত ধুলাবালিতে হোটেলে বসা যায় না। এক গ্লাস পানি খেতে এলেও গ্রাহকেরা কয়েকবার গ্লাস পরিষ্কার করে। ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রমে গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে। প্রতিদিন দুবার করে সড়কে পানি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একবারও পানি দিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহরিয়ার মু. আরিফুর রহমান বলেন, ধুলাবালি হাঁপানিসহ ফুসফুসজনিত বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি ও প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। শুধু মানবদেহে নয়, উদ্ভিদের ফুল-ফলের পরাগায়ণ ব্যাপকভাবে ব্যাহত করছে।

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ধূলাবালুর কারণে হাসপাতালে হাঁচি-কাশি ও ফুসফুসজনিত রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েছে। বায়ু দূষণের কারণে ফুসফুসের সমস্যা নিয়ে রোগীর ভর্তিতে অনেক হাসপাতালকেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

নোয়াখালী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, নোয়াখালী-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়ক ফোর লেন নির্মাণকাজের মধ্যে নোয়াখালী অংশের ৬৫ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ফোর লেনের কাজ শেষ হবে বলে আশা করেন তিনি।

সড়কে পানি দেওয়ার বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, নির্মাণাধীন সড়কে পানির দেওয়ার জন্য প্রতিদিন দুটি গাড়ি কাজ করছে। যেখানে ধুলাবালি বেশি, সে স্থানগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে পানি দেওয়ার কথা। পানি দিচ্ছে না কেন, বিষয়টির খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান বলেন, জেলায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ চলছে। ফোর লেনের কাজ শেষ হয়ে গেলে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ধুলাবালুর সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থার জন্য পৌর কর্তৃপক্ষ আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তৈরি হয়ে গেলে বর্জ্য পোড়ানোর ফলে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, তার স্থায়ী সমাধান হয়ে যাবে।
 

এসআর

×