১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ৫ ফাল্গুন ১৪২৬, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

মহামান্য রাষ্ট্রপতির হ্যাপি নিউ ইয়ার ভাষণ

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী ২০২০
  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

২০২০ মুজিববর্ষ

২০২১ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

কাকতালীয়ভাবে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষ এলো স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি সঙ্গে নিয়ে। কাকতালীয়ই বটে। এবং তাও আবার জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা যখন রাষ্ট্রক্ষমতায়।

অতঃপর আমরা নিশ্চিন্তে শততম ১৭ মার্চ উদ্যাপন করব।

অতঃপর আমরা নিশ্চিন্তে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করব।

অতঃপর সেই লক্ষ্যে গত ১০ জানুয়ারি জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ এয়ারফোর্সের যে বিমানে করে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার স্বপ্নের স্বাধীন সোনার বাংলার মাটিতে পা রেখেছিলেন ঠিক তেমনি একটি বিমানে করে বঙ্গবন্ধুর ই-রেপ্লিকা তেজগাঁও বিমানবন্দরের প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে নামে। কালো রঙের, অবিকল সে রকম একটি বিমান বাংলাদেশ ক্রয় করেছে। ক্রয় করার ক্ষমতা এখন বাংলাদেশের আছে বলেই।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানী মিলিটারি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর আক্রমণ শুরু করলে জাতির পিতা ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা দেন। তাঁর ঘোষণা তৎকালীন ইপিআর-এর ওয়ারলেসের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী প্রচারিত হয়। তারপর হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি ক্যান্টনমেন্ট কারাগারে বন্দী করে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার জন্য বিচার শুরু করে এবং ফাঁসির দন্ড প্রদান করে এবং বঙ্গবন্ধুর কারাকক্ষের পাশে কবরও খোদাই করা হয়। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তোমরা আমাকে হত্যা করো আর যাই করো বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই। আমার দেহটি বাংলার মাটিতে পাঠিয়ে দিও। ততদিনে বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয় এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় বিজয় অর্জিত হয়েছে। তখন বিশ্ববিবেক এবং বিশেষ করে ভারতের তৎকালীন মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধীর প্রভাবে পাকিরা বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ’৭২-এর ৮ জানুয়ারি মিয়ানওয়ালি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে জাতির পিতা ব্রিটিশ এয়ারফোর্সের বিমানে করে প্রথমে লন্ডন যান। সেখানে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান। সেখান থেকে দিল্লী এলে পালাম বিমানবন্দরে তাকে অভিনন্দন এবং স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি ও মিসেস গান্ধী। এখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিসেস গান্ধী বলেছিলেন, আমি ওয়াদা করেছিলাম : ১) শরণার্থীদের সসম্মানে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাব এবং ২) বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনব। আর বাংলাদেশের নেতা বঙ্গবন্ধু ওয়াদা করেছিলেন, তিনি বাঙালী জাতিকে স্বাধীন করবেন এবং তিনিও তা করেছেন। আমরা দুজনেই আমাদের ওয়াদা পূরণ করেছি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-কেউ কেউ প্রশ্ন করে, ভারতের সঙ্গে আমাদের মিল কিসের? আমি বলি- আমাদের মিল আদর্শের মিল, নীতির মিল, মানবিকতার মিল।

এর পর বঙ্গবন্ধু দিল্লীতে কিছু সময়ের জন্য মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন এবং ওই বৈঠকেই স্বাধীন বাংলার মাটি থেকে ভারতীয় সৈন্য ফেরত নেবার ওয়াদা আদায় করেন। ইন্দিরা গান্ধী ২০ মার্চ ১৯৭২ বাংলাদেশ সফরে আসেন এবং তার আগে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চের উপহার হিসেবে ১২ মার্চ ’৭২ ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। এটি ছিল একটি নজিরবিহীন ঘটনা। বিশ্বের বহু দেশে মিত্রশক্তি সঙ্গে সঙ্গে চলে গেছে এমন নজির খুব কম। এটা সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্যই।

গত ১০ জানুয়ারি কাউন্টডাউনের মুহূর্তে ব্রিটিশ এয়ারফোর্সের ধূসর রঙের বিমানটি যখন প্যারেড গ্রাউন্ডে অবতরণ করল তখন উপস্থিত সবার মধ্যে এক অভাবনীয় নীরবতা বিরাজ করছিল। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা এবং বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র ও শেখ হাসিনার ছেলে ও তার আইটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনা ধানম-ির অপর একটি বাড়িতে তার মা বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও অন্যান্যসহ ৯ মাসের বন্দী জীবনের বর্ণনা দেন। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী মিলিটারিরা আত্মসমর্পণ করলেও বেগম মুজিব, শেখ হাসিনা ও অন্যরা মুক্ত হন ১৮ ডিসেম্বর। পাকিস্তানের একটি মিলিটারি দল ১৬, ১৭ এই দুদিন নিজেদের মধ্যে কি যেন পরামর্শ করছিল। ধারণা করা হয়, তারা সবাইকে হত্যা করার চক্রান্ত করেছিল। ভারতীয় বাহিনীর নজরে এলে একজন মেজরের নেতৃত্বে এক ব্যাটালিয়ন সোলজার পাকি মিলিটারিদের ডিজআর্ম করে তাদের মুক্ত করে।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তার ভাষণটি শুরু করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ১৫ আগস্টের কালরাতে শাহাদাত বরণকারী অন্যান্য ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে এবং শেষ করেন বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মাদক ও জঙ্গীবাদমুক্ত পরিবেশে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে দলমত ও পক্ষের পার্থক্য ভুলে জাতীয় গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নের অভিযাত্রায় শামিল হবার মাধ্যমে লাখো শহীদের রক্তঋণ পরিশোধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে সঙ্গত কারণেই প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকারের বিগত দিনের কার্যক্রম বিশেষ করে চলমান কর্মযজ্ঞ এবং আগামীদিনের লক্ষ্য তুলে ধরেন। যেমন কতক যুগান্তকারী অর্জন:

* মধ্যম আয়ের দেশ

* জিডিপি ৮.১৫%

* মূল্যস্ফীতি ৫.৫%

* খাদ্য উৎপাদন ৩.৮০ কোটি মেট্রিক টন

* মাথাপিছু আয় ১৯০৯ মার্কিন ডলার

* গড় বয়স ৭২ বছর

* স্বাক্ষরতা ৭৩%

* বিদ্যুত উৎপাদন ২৩,০০০ মে.ও

২০২১ সালে ২৪,০০০ মে.ও

২০৩০ সালে ৪০,০০০ মে.ও

২০৪১ সালে ৬০,০০০ মে.ও

* আমাদের এই ছোট্ট দেশে এখন মাছ ও শাকসবজি উৎপাদনে তৃতীয় ও চতুর্থ

* বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

তাক লাগানো অবকাঠামো উন্নয়ন

* অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের বিস্ময় রোল মডেল।

* নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু। জানা যায়, এরই মধ্যে পদ্মা সেতুর সার্বিক নির্মাণ কাজ ৭৫% এবং কেবল সেতুর কাজ ৮৫% সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, ২০২১ ফেব্রুয়ারি/মার্চের মধ্যে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হবে। তবে গাড়ি চলাচলের জন্য আরও ৫/৬ মাস অপেক্ষা করতে হবে।

* ঢাকার মেট্রোরেল। ধারণা করা হচ্ছে, এটির নির্মাণ কাজও ২০২১ সালের মধ্যে শেষ হবে

* কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ কাজ ৫৫% শেষ হয়েছে

এছাড়াও রয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র, কক্সবাজারে বিদ্যুত কেন্দ্র। এমনিভাবে দেশের সর্বত্র যেভাবে মহাকর্মযজ্ঞ চলছে তা না দেখলে বোঝা যাবে না।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি সরকারের এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন তাঁর ভাষণে। যে বিষয়টির ওপর মহামান্য রাষ্ট্রপতি বেশি জোর দিয়েছেন, তা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশ। তাঁর এ বক্তব্যের বিশ্লেষণ করলে যে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে তা হলোÑ যেহেতু একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে সেহেতু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথেই বাংলাদেশের অগ্রগতি। এর বাইরে অন্য কোন পথ আমাদের অগ্রগতিকে থামিয়ে দিচ্ছে, অতীতে দিয়েছে, এখনও যারা সে পথের কথা বলে তারা বাংলাদেশের ভাল চায় না।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথ তাহলে কি:

* গণতন্ত্র

* সমাজতন্ত্র বা সামাজিক ন্যায়বিচার

* ধর্মনিরপেক্ষতা, সকল ধর্মের স্বাধীনতা। অর্থাৎ প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ ধর্ম বাধাহীনভাবে পালন করবেন, কেউ অন্য ধর্মের ওপর আঘাত হানবে না।

* দেশের প্রতি ভালবাসা

* মানুষের প্রতি ভালবাসা- বঙ্গবন্ধুর ভাষায় ‘ইজ্জত দিয়ে কথা কইয়েন’

* দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা

* রাজাকারমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা

* মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা

* সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা

* জ্ঞানসমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠা

* বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ প্রতিষ্ঠা

* বহির্বিশ্বের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়

* উৎপাদনমুখী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা

* মানবিকতাসমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠা

* বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসা

অর্থাৎ প্রগতিশীলতার পথ, এই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথ। এই পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে অতীতে মিলিটারি জিয়া, মিলিটারি এরশাদ, মিলিটারি মইনুদ্দিন, হাফ-মিলিটারি খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের অর্ধেকটা সময় নষ্ট করেছেন। একটিও এগিয়ে যাবার পথ দেখাতে পারেননি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, মাতারবাড়ি বিদ্যুতকেন্দ্র, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর; এ ধরনের একটি প্রকল্পও হাতে নিতে পারেননি। তাদের মাথায় ঢুকেইনি যে বাংলাদেশে এগুলো হতে পারে। তাই তো বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা দূরের কথাÑ ২৪ ঘণ্টায় দুই ঘণ্টা রীতিমতো বিদ্যুত দিতে পারেনি, জিডিপি ৫% এর উপরে তুলতে পারেনি বরং মূল্যস্ফীতি মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, নিম্নবিত্ত থেকে হতদরিদ্র পর্যায়ে নামিয়ে দিয়েছে। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নেতৃত্ব দিয়ে জাতির পিতার কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে গেছেন, মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।

এবং ক্ষুধামুক্ত,সন্ত্রাসমুক্ত,জঙ্গীমুক্ত পরিবেশে আগামী ১৭ মার্চ জাতির পিতার শততম জন্মবার্ষিকী বা মুজিববর্ষ উদ্যাপনের পাশাপাশি ২০২১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় আরেকধাপ এগিয়ে যাবেন। এভাবে ২০৩০ সাল, ২০৪১ সাল এবং ২১০০ সালের ডেল্টা প্রকল্পের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ এগিয়ে যাবেই।

ঢাকা- ২৪ জানু ২০২০

লেখক : সংসদ সদস্য, মুজিববর্ষ উদ্যাপন

জাতীয় কমিটি,

সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জাতীয় প্রেসক্লাব

[email protected]

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী ২০২০

২৫/০১/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: