২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১৭ ফাল্গুন ১৪২৬, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

শেকড়ের সন্ধানে কলের গান

প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারী ২০২০
  • মো. জোবায়ের আলী জুয়েল

১৮৭৭ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন (১৮৪৭-১৯৩১ খ্রি.) শব্দযন্ত্র আবিষ্কার করে নাম দেন ফোনোগ্রাফ। একদিন তিনি টেলিফোন যন্ত্রের ট্রান্সমিটার মুখের সামনে ধরে গান গাইছিলেন। হঠাৎ কণ্ঠস্বরের শব্দের শক্তিতে ট্রান্সমিটারের সূক্ষ্ম ইস্পাতের টুকরাটি তাঁর আঙ্গুলে স্পর্শ করল। এডিসন ভাবতে লাগলেন ব্যাপার কি? তাঁর মনে হলো ইস্পাত পিনটির গতিবিধি রেকর্ড করে রেখে ওটাকে যদি একই সমতলে আবার উল্টো ঘুরানো হয়, তাহলে জিনিসটিকে দিয়ে নিশ্চয় কথা বলানো যাবে।

এডিসন পেন্সিল দিয়ে নকশা আঁকতে শুরু করলেন। নকশা এঁকে কাগজটি তার যন্ত্র নির্মাতা জন ক্রুজিকে দিয়ে বললেনÑ এই যন্ত্রটি তৈরি করে নিয়ে এসো।

জনক্রুজি যন্ত্রটি তৈরি করে নিয়ে এলো। বড় কাঠের বাক্সে অদ্ভুদ একটা যন্ত্র। দুইপাশে দুইটো ঠেস। তার ওপরে একটি লোহার দ-। মাঝে ধাতুর তৈরি গোলাকার বস্তু। দ-ের একপাশে হাতল সমেত একটি চাকা। হাতলটা ঘুরিয়ে দিলে গোলাকার বস্তুটি সামনের দিকে ধীরে ধীরে ঘোরে। এ গোলাকার বস্তুর ওপর দিকে টেলিফোনের ট্রান্সমিটারের মতো একটা যন্ত্র। যন্ত্রটাতে একটা ডায়াফ্রাম আছে। এটির শেষ দিকটি তীক্ষè। ডায়াফ্রামটা হালকাভাবে গোলাকার বস্তুটার ওপর বসানো। যন্ত্রটি এডিসনের হাতে দিয়ে জনক্রুজি জিজ্ঞেস করল- এটা দিয়ে কী হবে? এডিসন বললেন- এ যন্ত্র কথা বলবে আর গান গাইবে। জনক্রুজি এবং কারখানার অন্যদের কথাটি বিশ্বাস হলো না, ভাবল মনিব বুঝি তাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছেন।

এডিসন কাজ শুরু করলেন। প্রথমবার ব্যর্থ হলেন। দ্বিতীয় বার আবার শুরু করলেন। একটা নতুন পাত সিলিন্ডারের খাঁজে খাঁজে সমান করে বসিয়ে দিলেন। আস্তে করে পিনটাকে চকচকে টিনের পাতের ওপর বসিয়ে হাতলটা ঘুরিয়ে দিলেন। আর যন্ত্রের চোঙের কাছে গিয়ে একটি ছড়া আবৃত্তি করলেন। এর পর ডায়াফ্রামটা পেছন দিকে সরিয়ে নিয়ে শুরুতে পিনটা বসিয়ে হাতল ঘুরিয়ে দিলেন। ল্যাবরেটরির সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সুচের অগ্রভাগ টিনের পাতের ওপর চলতে লাগল। অকস্মাৎ যন্ত্রটি কথা বলে উঠল। এডিসনের কণ্ঠের সেই ছড়া আবৃত্তি- মেরী হ্যাড এ লিটল ল্যাম্ব (মেরীর ছিল একটি ছোট মেষ)। গ্রামোফোনে মানুষের এ কথাটিই প্রথম রেকর্ড হলো। বিস্ময়ে ল্যাবরেটরির সবাই চেঁচিয়ে উঠল, অলৌকিক! অলৌকিক! যন্ত্রটা কথা বলে।

পরেরদিন নিউইয়র্কে প্রবল উত্তেজনা। সবার মুখে একটি কথা- এডিসন এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন, যা কথা বলে। এডিসন হলেন বিভিন্ন সংবাদ পত্রের আকর্ষণ।

১৮৭৮ সালে এডিসন তাঁর আবিষ্কৃত গ্রামোফোনের পেটেন্ট পেলেন। কয়েক বছরের চেষ্টার ফলে তিনি মনের মতো করে গ্রামোফোন তৈরি করলেন। পরে এ যন্ত্রের সঙ্গে একটি চোঙাও লাগিয়ে দিলেন। এডিসনের তখন বয়স মাত্র ৩০ বছর। সৃষ্টি হলো ফোনোগ্রাফ বা আধুনিক কলের গ্রামোফোন রেকর্ড।

১৮৮১ সালে আলেক জান্ডার গ্রাহামবেল এবং টেইনটার মিলিতভাবে ফোনোগ্রাফের উন্নতি সাধনে সক্ষম হন। তাঁরা রেকর্ড করার জন্য টিনের পাতের বদলে মোম ব্যবহার করেন। তাতে শব্দ কিছুটা স্পষ্ট হয়। তবু ফোনোগ্রাফের শব্দ বিক্ষেপে ভুলত্রুটি থেকেই যায়।

এ সময়ে এমিল বার্লিনার নামে এক জার্মান যুবক ওয়াশিংটনে বাস করতেন। তিনি কাপড়ের দোকানের কর্মচারী ছিলেন। বিজ্ঞানের উপর তাঁর অত্যন্ত আগ্রহ ছিল। টমাস এডিসনের ফোনোগ্রাফকে আরও উন্নত ও কার্যক্ষম করে তোলার জন্য ১৮৮৭ সালে এমিল বার্লিনার এগিয়ে আসেন।

বেশকিছু দিন চেষ্টার পর ১৮৮৮ সালে বার্লিনার এক নতুন ধরনের রেকর্ড উদ্ভাবনে সক্ষম হন। তিনি রেকর্ড সিলিন্ডারের আকৃতির পরিবর্তন ঘটিয়ে প্লেটের মতো সমতল রেকর্ডের প্রবর্তন করেন। ফোনোগ্রাফের ডায়াফ্রামের সঙ্গে চোঙা লাগিয়ে স্বর বিস্তারের ব্যবস্থা ছিল বার্লিনারেরই আবিষ্কার। যা টমাস এডিসনের ফোনোগ্রাফেরই উন্নত সংস্করণ।

এডিসনের সময় থেকে বার্লিনারের সময় পর্যন্ত ফোনোগ্রাফ বাজতে একটি হাতল অনবরত ঘোরাতে হতো। বার্লিনার চাইলেন এই অসুবিধা থেকে মুক্তি পেতে। স্প্রিং এর সাহায্যে রেকর্ড ঘোরানো যায় কি-না এ ব্যাপারে বার্লিনারের সহকর্মী এফ ডব্লিউ গেইসবার্গ পরামর্শ দেন। এফ ডব্লিউ গেইসবার্গের পরামর্শ বাস্তবায়নে বার্লিনার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তিনি শত চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরবর্তী সময়ে লেদ ওয়ার্কসপের কর্মচারী এলরিজ জনসন সফল হন। ১৮৯৮ সালের এলরিজ জনসনের উদ্ভাবিত স্প্রিং চালিত ফোনোগ্রাফ সবার মন জয় করে নেয়। সে সময় থেকে ফোনোগ্রাফকে আদর করে গ্রামোফোন বা কলের গান নামে ডাকা হতে থাকে।

গ্রামোফোন আবিষ্কারের পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে অনেক গ্রামোফোন কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। এফ ডব্লিউ গেইসবার্গ গ্রামোফোন জগতের সঙ্গে বাংলাকে পরিচিত করেন। তিনি গ্রামোফোন কোম্পানির প্রথম রেকডিং ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ১৯০০ হতে ১৯০৭ সালের মধ্যে তিনি বহুবার ভারতের কলকাতাসহ অন্যান্য স্থান সফর করেন। এ শব্দধারণ প্রক্রিয়া চালু করার উদ্দেশে গৃহীত তার উদ্যোগে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের বিভিন্ন স্থানের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

১৯০২ সালের ৮ নবেম্বর গোটা ভারত ভূমিতেই গ্রামোফোন রেকর্ডিংয়ের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। এই দিনটিতেই গেইসবার্গ প্রথম বাঙালী শিল্পীর কণ্ঠে প্রথম বাংলা গান রেকর্ড করেন। সেই প্রথম গানটি ছিল কীর্তনের ‘কাঁহা জীবন ধন’ কণ্ঠ দিয়েছিলেন ক্ল্যাসিক থিয়েটারের চতুর্দশী নর্তকী মিস শশী মুখী। ওই একই তারিখে দ্বিতীয় গানের রেকর্ডিং হয় ক্ল্যাসিক থিয়েটারের আরেক নর্তকী মিস ফনী বালার কণ্ঠে। পরবর্তীতে ১০ নবেম্বরে আরও কিছু শিল্পীর গানের রেকর্ড করার সুযোগ মেলে কিন্তু এরা কেউই তখন গানের জগতের বড় শিল্পী ছিলেন না। সে সুযোগ এলো কলকাতার বাঙালী রমণী গওহর জানের কল্যাণে। রূপের ছটা আর রেওয়াজি কণ্ঠের দৌলতে গওহর জান সেকালের সৌন্দর্য পিপাসু ও সঙ্গীত রসিক মানুষের মন কেড়েছিলেন। গোটা ভারতবর্ষে তখন তাঁর নাম ডাক ছড়িয়ে পড়েছিল। এই গওহর জানই ছিল গেইসবার্গের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার নিঃসন্দেহে। ১৯০২ সালের ১১ নবেম্বর গেইসবার্গ গওহর জানের কণ্ঠে গান রেকর্ড করেন। সাত ও দশ ইঞ্চি ব্যাসের রেকর্ডে তাঁর গানগুলো ধারণ করা হয়। গওহর জান হিন্দুস্তানী ভাষায় দাদরা তালে প্রথম গানটি রেকর্ড করেছিলেন। গওহর জানের ধারণ কৃত তাঁর প্রথম বাংলা গানটি ছিল ‘ভালো বাসিবে বলে ভালো বাসিনে’। পরেরদিন আবারও গওহর জানের কণ্ঠে গান রেকর্ড করা হয়। এই রেকর্ডই তাঁকে অল্প দিনের মধ্যে খ্যাতি এনে দেয়। কলকাতার সকল সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় তাঁর ছবি ছাপা হয়। এভাবেই গোটা ভারত বর্ষে অতি শীঘ্র গ্রামোফোন রেকর্ডের এক বিশাল বাজারে পরিণত হয়। উল্লেখ করা যেতে পারে সে আমলে গওহর জান একজন সফল চলচ্চিত্রের নামকরা নায়িকাও ছিলেন।

১৯০২ সালের ১৪ নবেম্বর বাংলা রঙ্গমঞ্চের দুই নামকরা শিল্পী হরিমতী ও সুশীলা ও গেইসবার্গের নজরে পড়েন। তাদের দিয়েই গেইসবার্গ একের পর এক থিয়েটারের বাদক দলের সমন্বয়ে এই দুই শিল্পীর গানের রেকর্ড করে নেন।

রেকর্ডিংয়ের প্রথম পর্যায়ে গানের পুরুষ শিল্পী তেমন পাওয়া যায়নি। একমাত্র অভিজাত পরিবারের সন্তান গায়ক লালচাঁদ বড়াল ছাড়া। লালচাঁদ গ্রামোফোনের শিল্পী হিসেবে অল্প সময়ের মধ্যে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর রেকর্ডের চাহিদা ছিল আকাশচুম্বি প্রায় শিল্পী গওহর জানের কাছাকাছি। ১৯০৭ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে এই গুণী শিল্পীর অকাল মৃত্যু হয়।

গেইসবার্গ রেকর্ডিংয়ের জন্য মাত্র ছয় সপ্তাহ কলকাতায় অবস্থান করেছিলেন। এই সামান্য সময়ে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কার্য সম্পাদান করেছিলেন। সাত ও দশ ইঞ্চি মিলিয়ে তিনি মোট সে সময় ৬৫২ খানা কণ্ঠ ও যন্ত্র সঙ্গীতের রেকর্ড করেন। গেইসবার্গের শুভ সূচনায় এক দশকের মধ্যে গ্রামোফোন হয়ে উঠল সমগ্র ভারত বর্ষের আমজনতার জনপ্রিয় বিনোদনের সামগ্রী। এভাবেই সমগ্র ভারতবর্ষে অতিশীঘ্র গ্রামোফোন রেকর্ডিং এক বিশাল বাজারে পরিণত হয়। ১৯০০ সালের মধ্য কলকাতার জোড়া সাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ফোনগ্রাফ যন্ত্র পৌঁছে যায়। ১৯০৩ সাল নাগাদ সাহিত্যসেবী ‘বিষাদ সিন্ধু’ রচয়িতা কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া গ্রামে মীর মোশাররফ হোসেনের বাড়িতে ও কলের গান পৌঁছে যায়। সম্ভবত এর আগে কোন মুসলমান ঘরে কলের গান পৌঁছানোর নির্দিষ্ট কোন তথ্য অদ্যাবধি পাওয়া যায় না।

বিংশ শতকের প্রথম দশকে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি জনপ্রিয় বিদেশী গ্রামোফোন কোম্পানি হচ্ছেÑ হিজ মাস্টারস ভয়েজ (ব্রিটিশ), কলম্বিয়া (আমেরিকা) এবং পঠে (ফ্রান্স)।

গ্রামোফোনের রেকর্ড তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রথম ভারতীয় উদ্যোক্তা হলেন হেমেন্দ্র মোহন বসু (১৮৬৪-১৯১৬ খ্রি.)। ময়মনসিংহের জয়সিদ্ধ গ্রামে তাঁর জন্ম। তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে লেখাপড়া করেন। হেমেন্দ্র মোহন সুগন্ধী দ্রব্যের প্রতি বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। তাই ১৮৯৪ সালে তিনি ‘বোস পারফিউমারস’ বাণিজ্যিক সনদে সুগন্ধী দ্রব্য প্রস্তুত করা শুরু করেন এবং অতি অল্প সময়ে এতে সফলতা অর্জন করেন। শীঘ্রই তিনি তাঁর পণ্য সামগ্রীতে ‘কুন্তলীন কেশ তৈল’ ও অন্যান্য প্রসাধনী দ্রব্যযুক্ত করেন এবং কলকাতার ৬ নম্বর শিব নারায়ণ দাস লেনে একটি কারখানা স্থাপন করেন।

১৮৯৬ সালে হেমেন্দ্র মোহন বসু তার প্রস্তুত পণ্যদ্রব্য ‘কুন্তলীন কেশ তেল’Ñ এর নামানুসারে এক সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তন করেন। এটি ছিল ছোট গল্প রচনা প্রতিযোগিতা। বার্ষিক এই প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাবার জন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘কর্মফল’ গল্পটি লিখে পাঠান। ছদ্মনামে পাঠানো শরৎ চন্দ্রের প্রথম গল্প ‘মন্দির’ কুন্তলীন সাহিত্য পুরস্কারে পেয়েছিল। হেমেন্দ্র মোহন বসু প্রতিবছর প্রতিযোগিতার জন্য প্রাপ্তগল্পগুলো সংকলন করে সেকালে ‘কুন্তলীন সাহিত্য পুরস্কার’ নামে গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বিজ্ঞাপন রচনায়ও বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তাঁর রচিত এমনি একটি বিজ্ঞাপন-

‘কেশে মাখো কুন্তলীন

অঙ্গ বাসে দেল খোস,

পানে খাও তান্বলীন

ধন্য হোক এইচ বোস’

পরবর্তীকালে অনেক পুরস্কারের সঙ্গে, সে সাহিত্য পুরস্কারই হোক বা অন্য কোন বিষয়ই হোক, বিজ্ঞাপন পণ্যের নাম সংযুক্ত হতে দেখা যায়।

সুগন্ধি ব্যবসায়ের পাশাপাশি সাইকেল কারখানা, ছাপাখানা, মোটরগাড়ি ও ক্যামেরা বিক্রি প্রভৃতি নানা রকমের ব্যবসায়ের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।

হেমেন্দ্র মোহনের পরবর্তী অর্জন গ্রামোফোন রেকর্ডস। ১৯০০ সালে তিন পাশ্চাত্য থেকে গ্রামোফোন তৈরির প্রযুক্তি আমদানি করে কলকাতায় একটি গ্রামোফোন রেকর্ডিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর মাধ্যমে গ্রামোফোন রেকর্ড প্রস্তুত ও বিতরণ শুরু করেন। এ ক্ষেত্রেও তিনি ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম এবং এ ব্যবসায় তাঁর সাফল্য পূর্ববর্তী সকল অর্জনকে ছাড়িয়ে যায়। বাজারে তাঁর রেকর্ড ‘এইচ বোস’স রেকর্ড’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

তাঁর তৈরি রেকর্ডের মাধ্যমেই জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের আবৃত্তি, বাণী ও সাক্ষাতকার ধারণ করা সম্ভব হয়, বোস’স রেকর্ড বাংলা, হিন্দী ও উর্দুতে অনেক অনুষ্ঠান ধারণ করেন। রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে তাঁরই রচিত গান ও কবিতার রেকর্ড ও বের করেন।

১৯০৭ সাল থেকে এইচ বোস’স রেকর্ড এর অসংখ্য ডিস্ক বাজারে মুক্তিপায় এবং এর চাহিদা ক্রমশ এতই বৃদ্ধি পায় যে, হেমেন্দ্র মোহন বসু অবিভক্ত ভারতের একজন খ্যাতিমান ও সম্মানিত ব্যক্তিতে পরিণত হন, কারণ তিনি ছিলেন একজন বাঙালী উদ্যোক্তা এবং স্বদেশী আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের ওপর অনেক রেকর্ড প্রকাশ করেছিলেন। ১৯১৬ সালের ২৮ আগস্ট তিনি মারা যান।

গ্রামোফোন তৈরি ও বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে প্রথম উদ্যোক্তা ছিলেন কলকাতার মানিক লাল শাহা (এম, এল, শ্ব)। এর আগে তিনি ছিলেন একজন সফল হারমোনিয়াম নির্মাতা।

মানিকলাল শাহা লন্ডনের নিকল ফেরেস লি.-এর নিকল রেকর্ডস ও নিকল ফোনের প্রথম ও প্রধান এজেন্ট ছিলেন। তিনি শেষ পর্যন্ত বিখ্যাত ইন্ডিয়ান রেকর্ডস ম্যানিফ্যাকচারিং কোম্পানি লি. প্রতিষ্ঠা করেন। বিংশ শতকের বিশের দশক থেকে গ্রামোফোন ও গ্রামোফোন রেকর্ডস বাঙালী পরিবারে একটি মর্যাদা পূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়। যখন স্টেরিও গ্রামোফোন স্থান দখল করেছিল তখন পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত এ প্রবণতা অব্যাহত ছিল।

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের জমিদার পরিবারের সন্তান বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ স্যার আব্দুল হালিম গজনবী হলেনÑ প্রথম বাঙালী মুসলমান, যিনি গ্রামোফোন সামগ্রীর ব্যবসায় নেমে প্রভূত সাফল্য অর্জন করেন।

এছাড়াও মীনা পেশোয়ারি নামক এক অবাঙালী ধনী মুসলমান ১৯২৬ সালে ‘শাহন শাহ’ রেকর্ড কোম্পানি নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

চন্ডীচরণ সাহা, বিভূতিভূষণ ও জিতেন্দ্র নাথ ঘোষ তিরিশের দশকের গোড়ার দিকে গড়ে তোলেন স্বদেশী রেকর্ড কোম্পানি ‘মেগাফোন’, ‘হিন্দুস্তান’ ও ‘সেনোলা’।

পরবর্তীতে এদের সাফল্য ও প্রেরণায় আরও বেশ কয়েকটি দেশীয় রেকর্ড কোম্পানির জন্ম হয় যেমন- পাইওনিয়ার, ভারত, রিগ্যাল, মেল-ও-ডি এবং কোহিনুর। দেশভাগের আগ পর্যন্ত এই দেশী কোম্পানিগুলো সাফল্যের মুখ দেখেছিল।

গ্রামোফোন বা কলের গান ৮০ বছরের ইতিহাসে এক মহা গৌরব ও অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেছিল। গ্রামোফোনকে কেন্দ্র করে বাংলায় যে সঙ্গীতশিল্পী সৃষ্টি হয়েছিল তাঁদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্যরা হলেনÑ গওহ জান, লালচাঁদ বড়াল, কে মল্লিক (কাশেম মল্লিক), ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ, ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খাঁ, ভীস্মদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমল দাশ গুপ্ত, তুলসী লাহিড়ী, আব্বাস উদ্দীন আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম, পঙ্কজ কুমার মল্লিক, কুন্দ লাল সায়গল, আঙ্গুর বালা, ইন্দু বালা, শচীন দেব বর্মণ, কানন বালা দেবী, জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ গোস্বামী, বেগম আখতার, সুধীর লাল চক্রবর্তী, কমলা ঝরিয়া, জগন্ময় মিত্র, যুথিকা রায়, পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল এবং আরও অনেক শিল্পী।

কাজী নজরুল ইসলামকে গ্রামোফোনের (কলের গান) শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলা যায়। ১৯২৬ সাল থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত (নজরুল অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত) কাজী নজরুলই ছিলেন গ্রামোফোনের প্রধান গীত রচয়িতা, সুর ¯্রষ্টা ও সঙ্গীতের প্রশিক্ষক।

নজরুল আনুষ্ঠানিকভাবে হিজ মাস্টার্স ভয়েস (এইচএমভি) গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানিতে যোগ দেন ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে। নজরুলের নিজস্ব কণ্ঠে গাওয়া বেশ কয়েটি গান গ্রামোফোন থেকে সেই সময় রেকর্ড বের হয়।

আনুষ্ঠানিকভাবে এইচএমভিতে যোগদানের পর নজরুলের লেখা ও সুরে গান গেয়ে অনেক গায়ক-গায়িকা অর্থ ও খ্যাতির শিখরে পৌঁছেন। সেই সঙ্গে এই কোম্পানিও আয় করেছে প্রচুর অর্থ। তবে এইচএমভি’র মধ্য মনি ‘সুরের জাদুকর’ নজরুলের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন সে সময় হয়নি।

গ্রামোফোন রেকর্ডের সুর সংযোজন ও সঙ্গীত পরিচালনায় আর যাঁদের স্মরণ করতে হয় তাঁরা হলেন- তুলসী লাহিড়ী, রাইচাঁদ বড়াল, কমল দাশ গুপ্ত, হীরেন বসু, সুর সাগর হিমাংশু দত্ত, অনুপম ঘটক, দুর্গা সেন, তিমির বরণ, সুধীরলাল প্রমুখের নাম। নজরুলের লেখা ও সুর করা গানের রেকর্ড এইচএমভি, মেগাফোন, টুইন, কলম্বিয়া, সেনোলা-পাইওনিওর, হিন্দুস্তান, শাহান শাহ, ভিয়েলোফেন এসব কোম্পানি থেকে শুধু বের হয়নি সমাদরও পেয়েছে। এর পরবর্তী যাঁরা গীতিকার হিসেবে গ্রামোফোন কোম্পানি তে নাম করেন তাঁরা হলেন- প্রণব রায়, হীরেন বসু, শৈলেন রায়, অজয় ভট্টাচার্য, সুবোধ রায়, মোহিনী চৌধুরী, পবিত্র মিত্র এবং আরও অনেকে। এক সময় গ্রামোফোন ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। সৌখিন ব্যক্তিরা বিভিন্ন শিল্পীর গানের রেকর্ড সংগ্রহ করে রাখতেন। সে সময় বাংলার ঘরে ঘরে গ্রামোফোনে গান শোনাটাই ছিল বিনোদনের সেরা মাধ্যম।

জ্ঞানের অসামান্য অগ্রগতির ফলে নতুন প্রযুক্তির কাছে হার মেনে গ্রামোফোন বা কলের গান বেশ কয়েক দশক আগেই বাঙালীর জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে।

এখন শুধু স্মৃতির বেদনা হয়ে পড়ে আছে কলের গান।

অত্যাধুনিক ডিজিটাল যন্ত্রপাতির যুগে গ্রামোফোন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নব প্রজন্ম আর প্রকৃত গ্রামোফোন বা কলের গান চিনবে না। বাংলার ঘরে ঘরে কলের গান আর কখনও বাজবে না।

এখন গ্রামোফোন বা কলের গানের চেহারা বদলিয়ে আধুনিক রেকর্ড প্লেয়ার, ডিস, স্টেরিও এবং সিডি করা হয়েছে। এগুলোর পূর্বের রূপই হলো গ্রামোফোন বা কলের গান।

প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারী ২০২০

১৭/০১/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: