৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

লেখার জবাব হোক লেখাই

প্রকাশিত : ১৭ অক্টোবর ২০১৯
  • খন্দকার মাহ্বুবুল আলম

বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে হল থেকে তুলে নিয়ে গত ৬ অক্টোবর রাতে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা অত্যন্ত দুঃখজনক। মানবিক ও সভ্য সমাজে এমনটি কখনও আশা করা যায় না। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায়, এই মেধাবী ছাত্র এলাকার সবার প্রিয় এবং ভাল ছেলে হিসেবেও পরিচিত আছে তার। তা ছাড়া আবরার প্রত্যক্ষ কোন রাজনৈতিক দল বা এমন কোন কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত ছিল না বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়। সে বুয়েটের ‘তড়িৎ ও ইলেকট্রিক প্রকৌশল বিভাগে অধ্যয়নরত ছিল। জাতির সম্ভাব্য সম্পদ এই ছাত্রটি স্বীয় অবস্থান থেকে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠার আগেই কলুষিত ছাত্র রাজনীতির ভয়াল থাবায় অকালে ঝরে গেল, যা কোন ভাবেই মেনে নেয়ার মতো নয়।

তার অপরাধ আর কিছু নয়, ফেসবুক ‘স্ট্যাটাস’ দিয়ে সমকালীন বিষয়ের ওপর মতামত প্রকাশ করা। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি এই মেধাবী বুয়েট ছাত্র ‘আবরার’ ভারতকে শুভেচ্ছাস্বরূপ ইলিশ প্রদান করা এবং ফেনী নদীর পানি ভারতকে দেয়াসহ কথিত গ্যাস রফতানির খবরে সে তার ফেসবুকে ‘স্ট্যাটাস’ দিয়েছিল। যা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

কেউ কোন বিষয়ে মতামত প্রদান করতেই পারে। মতামত প্রদান করাও একটা অধিকার। এ জন্য কেউ কাউকে পিটিয়ে হত্যা করে ফেলতে পারে না। এমনটি অসভ্য বর্বর সমাজের পরিচায়ক হতে পারে, কোন সভ্য সমাজের নয়। কারও মতামত কারও কাছে সঠিক এবং গ্রহণযোগ্য হতে হবে এমনও নয়। এমন ক্ষেত্রে কারও ফেসবুক ‘স্ট্যাটাস’ বা মতামত অন্য কারও কাছে যুক্তিসঙ্গত বা গ্রহণযোগ্য না হলে ওই মতের বিরুদ্ধে আরও যৌক্তিক শক্তিশালী ভিন্নমত দেয়া যেতে পারে। অর্থাৎ লেখনীর বিরুদ্ধে লেখনীই হতে পারে অস্ত্র। তা হলে এভাবে ভিন্নমত চর্চার দ্বারা সঠিক মত গ্রহণের মাধ্যমে সমাজ এগোবে। নয়ত সমাজ স্থবির হয়ে পড়বে। এ জন্য কেউ কাউকে হত্যা করতে পারে না। যদি এমন কোন মত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যায় সেক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত আইন আছে, যে আইনে সংশ্লিষ্টদের বিচার হওয়া সম্ভব।

আমরা জানি উন্নয়নশীল সভ্য দেশগুলোতে ভিন্নমতের প্রতি তারা যেমন সহনশীল তেমনি সম্মানও দেখানো হয়। তাদের সামনে সেই সুযোগ করে দেয়া হয়েছে এবং সেই সুযোগ তারা গ্রহণ করে স্বাধীনভাবে, নির্বিঘেœ মতামতও প্রদান করে থাকে যে কোন বিষয়ে। এ জন্য কেউ কাউকে হত্যা করার বিষয়টি কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু আমরা পারি এবং করি। আবরার হত্যার মধ্য দিয়ে সেটিই প্রমাণিত হলো। যারা সত্যকে গ্রহণ করতে চায় না, তারাই ভিন্ন মতকে ভয় পায়। ভিন্নমত সংবলিত সমালোচনার দ্বারা মানুষ নিজেদের শুধরেও নিতে পারে। সেই সুযোগ কি আমাদের আছে? বরং তার উল্টোটাই ভোগ করতে হয়।

এই হত্যাকা-ের জন্য অনেকে কলুষিত ছাত্র রাজনীতিকে দায়ী করেছে। এমন ধারণা করার কারণ হচ্ছে ছাত্র রাজনীতির বাস্তবতা এবং অতীতেও বহু ছাত্রের মূল্যবান প্রাণ গেছে কলুষিত ছাত্র রাজনীতির করাল থাবায়। যে কারণে অনেকে দাবি তুলেছেন, ছাত্র রাজনীতি বন্ধের। তাও কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ছাত্র রাজনীতি মুক্ত না করে বরং ছাত্র রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে হবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এদেশের ছাত্র সমাজ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিল। সেই ছাত্ররা আজ গৌরবের এবং ইতিহাসের একটি বিরাট অংশ হয়ে আছে।

যেই ছাত্রদের হাতেই এমন মেধাবী একজন ছাত্রের হত্যাকা- ঘটল, সেই কতিপায় অপরাধী ছাত্রদেরই অন্য সহপাঠীরা এই হত্যাকা-ের জোরালো প্রতিবাদে মাঠে নেমেছে। এটাই স্বাভাবিক এবং এমন প্রতিবাদ হওয়ারও দরকার, তবে শৃঙ্খলাবদ্ধ নিয়ন্ত্রিত পন্থায়। এই ছাত্ররা নিজ থেকে নষ্ট হয় না, তাদের কতিপয় অসৎ স্বার্থান্বেষী নষ্ট করে। এ জন্য সর্বোপরি কলুষিত রাজনীতিই দায়ী। যারই ফলস্বরূপ প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই এই মেধাবী বুয়েট ছাত্রটিকে শত্রু ভাবা হয়েছে। যে কারণেই কলুষ রাজনীতির শিকার হলো আবরার।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ‘অপরাধীরা কে কোন্ দলের সেটা আমি কখনও দেখি না।’ তাঁর সে কথার প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক স¤্রাটকে তার দুর্নীতি ভয়ঙ্কর সব কর্মকা-ের জন্য গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে। এক্ষেত্রেও তাঁর সেই সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা হারানো পথের একটা দিশা দিতে পারে। আমরা আশা করি সবার সুন্দর আন্তরিক প্রচেষ্টায় একদিন সুন্দর ভোরের আলো দেখব। রাত যতই গভীর হয়, ভোর ততই কাছে আসে। জাতি সেই সুন্দর ভোরের অপেক্ষায়।

মধ্যম হালিশহর, চট্টগ্রাম থেকে

প্রকাশিত : ১৭ অক্টোবর ২০১৯

১৭/১০/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: