১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

সমাজ ভাবনা ॥ এবারের বিষয় ॥ বাংলা ভাষার শত্রুমিত্র


ফিরোজ মৃধা

বাংলাদেশ রক্তের বিনিময়ে অর্জিত একটি দেশ। পৃথিবীর বহু দেশ আছে যে দেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছে কিন্তু ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে এমন ইতিহাস আর কোন দেশের নেই। তাই আমরা আমাদের বাংলা ভাষাকে ও দেশকে নিয়ে গর্বিত। কিন্তু প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই ভাষার ব্যবহারে আমরা আজও দীনতার পরিচয় দিচ্ছি। ব্রিটিশদের ভূত আজও আমাদের ওপর আছর করে আছে। আমরা এখনও ব্রিটিশদের শাসন, কৃষ্টি কালচার অনুসরণ করে যাচ্ছি। আমাদের সরকারী অফিস, আদালতে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এখনও ইংরেজীর ব্যবহার বেশি হয়। গোড়াতেই যদি সমস্যা থাকে তাহলে সমাধান কোথা থেকে আসবে। আমাদের লেখাপড়ার ধরনও পাল্টে যাচ্ছে দিন দিন। বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের চেয়ে ইংরেজী মাধ্যমেই প্রতি ঝুঁকছি, এটাও এক ধরনের মানসিক দীনতার প্রকাশ। শহরের অনেক বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা ইংরেজীতে অনর্গল কথা বলতে পারে, অথচ শুদ্ধভাবে বাংলায় কথা বলাতেই তাদের সমস্যা। এই সমস্যা আমাদের উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে বেশি। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও পিছিয়ে নেই, তাদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা ছেলেমেয়েদের ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। আমাদের মনোভাব এমন হয়েছে যে ইংরেজী না জানলে বা ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত না হলে মর্যাদা কমে যাবে সমাজে। এই সুযোগে আনাচে-কানাছে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইংরেজী মাধ্যম স্কুল। এর তুলনায় শুদ্ধভাবে বাংলা ভাষা শিক্ষকেন্দ্র নেই বললেই চলে, এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে ভাষার জন্য প্রাণ দেয়া সালাম, রফিক, জব্বারের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন আমরা করতে পারছি না। আমাদের এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মুখে বাংলা ভাষা শুনলে অবাক লাগে, অর্ধেক ইংলিশ আর অর্ধেক বিকৃত বাংলা। এটা আসলে পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুসরণের ফল আর আমাদের মিডিয়ার অবদান। আমাদের এফএম রেডিও আর কিছু টেলিভিশন চ্যানেলের উপস্থাপনায় বাংলা ভাষার বিকৃত ব্যবহারের ফল। তাহলে কি আমরা আমাদের ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারছি না এই প্রজন্মের কাছ, আমাদের ভাষার জন্য প্রাণ দেয়ার রক্তাক্ত গর্বিত ইতিহাস কি ভুলে যাবে আগামী প্রজন্ম। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমাদের কাছে বাংলা ভাষার আদর বেড়ে যায়, সরকার, মিডিয়া ও কিছু বুদ্ধিজীবী হৈ চৈ করেন। আবার মাস চলে গেলেই সব কিছু আগের মতই নিয়ম মেনে চলে। অথচ বাংলার ভাষার ইতিহাস বাঙালী জাতির গর্বের ইতিহাস, প্রতিবাদের ইতিহাস, বাঙালী জাতির পরাধীনতার শৃঙ্খল ভঙ্গের ইতিহাস।

শুধু আইন করে সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রচলন করা যাবে না, এজন্য প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন, ভাষার প্রতি, দেশের প্রতি ভালবাসা। আর সর্বক্ষেত্রে বিকৃত করে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ ভাষার অপমান না করে চর্চাটাও শুদ্ধভাবে করতে হবে।

ময়মনসিংহ থেকে