ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১

ফিনিক্স পাখির কথা

খুররম মমতাজ

প্রকাশিত: ০০:১২, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩

ফিনিক্স পাখির কথা

শেখ হাসিনা

একজন কন্যা যখন দূর প্রবাসে তাঁর পিতার অকালমৃত্যু সংবাদ পান অকস্মাৎ- বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো- কেমন হয় তাঁর মনের অবস্থা? বিশেষত যদি সেই পিতাকে পৈশাচিক উল্লাসে হত্যা করে হায়েনার মতো এক পাল সৈন্য- পিতার সঙ্গে নিহত হন তাঁর সব ভাইয়েরা এবং আত্মীয়স্বজন-প্রিয়জন? তাহলে তাঁর অন্তরে যে শোক, যে হাহাকার ও বেদনার নদী বয়ে যায়, তার প্রকাশ ও পরিমাপ কি সম্ভব!

পুরাণের ফিনিক্স পাখি মৃত্যুহীন জীবনের অধিকারী। তার পুনর্জন্ম হয়। জীয়ন কাঠির ছোঁয়ায় বারবার সে উঠে আসে, ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে- ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে।
ধানমণ্ডি বত্রিশ নম্বর- এখানে বঙ্গবন্ধু জাদুঘর। জাদুঘরের খুব কাছেই আমার বাসা- পাঁচ মিনিটের পথ। তবু আমি বহুদিন, বহু বছর বাড়িটার ভিতরে যাইনি- দেখতে চাইনি সেই রক্তাক্ত সিঁড়ি যেখানে পড়ে ছিলেন বঙ্গবন্ধু, পড়ে ছিল তাঁর নিথর গুলিবিদ্ধ দেহ। বহুকাল পরে আমার কিছু বিদেশী বন্ধু এলো- তারা জাদুঘরটা দেখতে চায়, তখন যেতেই হয়েছিল।
জাদুঘর দেখা শেষে বন্ধুরা বিষণ্ণ মুখে ভিজিটর খাতায় তাদের অনুভূতি লিখছিল। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম আচ্ছন্নের মতো আর ভাবছিলাম সেই কালরাতে যদি বঙ্গবন্ধু-কন্যা এখানে থাকতেন, তাঁকেও হারাতাম আমরা। আমাদের সৌভাগ্য তিনি সেই সময় দেশে ছিলেন না, জার্মানিতে ছিলেন। এমন নৃশংসতা ও দুর্ভাগ্যের মাঝেও ভাগ্য তাঁর সহায় হয়েছিল।
একজন কন্যা যখন দূর প্রবাসে তাঁর পিতার অকালমৃত্যু সংবাদ পান অকস্মাৎ- বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো- কেমন হয় তাঁর মনের অবস্থা? বিশেষত যদি সেই পিতাকে পৈশাচিক উল্লাসে হত্যা করে হায়েনার মতো এক পাল সৈন্য- পিতার সঙ্গে নিহত হন তাঁর সব ভাইয়েরা এবং আত্মীয়স্বজন-প্রিয়জন? তাহলে তাঁর অন্তরে যে শোক, যে হাহাকার ও বেদনার নদী বয়ে যায়, তার প্রকাশ ও পরিমাপ কী সম্ভব!
সেই বেদনার মহাকাব্য আজও লেখা হয়নি কোনো কবি, কোনো লেখক কিংবা কোনো ঔপন্যাসিকের কলমে। হয়তো তাঁদের কলম থেমে গেছে, হার মেনেছে কল্পনা, তাঁদের ভাণ্ডারে যত শব্দরাশি সব হেমন্তের ঝরাপাতার মতো বিবর্ণ ও অর্থহীন হয়ে গেছে, বাস্তবের এই ট্র্যাজেডির কাছে। শুধু তো শোকই নয়, সঙ্গে শঙ্কাও ছিল সেদিন। স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল খুনিদের লক্ষ্য ও ষড়যন্ত্র সুদূরপ্রসারী। তারা বঙ্গবন্ধুর লিগেসিকে ভয় পায়, নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায় তাঁর রক্ত ও বংশের ধারাকে- যে কারণে শিশু রাসেলকেও সেদিন নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে ঘাতকের দল। ঘাতকদের পিছনে কে বা কারা সক্রিয় ছিল, তাদের রক্তমাখা হাত ও ষড়যন্ত্র কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত- তা জানবার কোনো উপায় তখন ছিল না।
তাই প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল বঙ্গবন্ধু-কন্যার আত্মরক্ষার, আত্মগোপনের ও একটি নিরাপদ আশ্রয়ের। সেই আশ্রয় তিনি পেয়েছিলেন প্রতিবেশী দেশ ভারতে। যে ভারত মাত্র চার বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের সময় লাখ লাখ শরণার্থীর জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছিল, সেই দেশটি আবার বাংলাদেশের একজন বিশেষ আশ্রয় প্রার্থীকে সাদরে আশ্রয় দিল। শুরু হলো তাঁর পিতৃহীন, দেশহীন, উন্মুল-উদ্বাস্তু জীবন। একজন মানুষের মনোবল দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে যাওয়ার জন্য এমন অপ্রত্যাশিত দুঃসহ একটি পারিবারিক বিপর্যয়ই যথেষ্ট। কিন্তু তিনি হিমালয় কন্যা। তিনি জানতেন তাঁর পিতা হিমালয়ের সঙ্গে তুলনীয় বিশাল ব্যক্তিত্ব। পরাজয় তাঁর জন্য নয়- ভগ্ন হৃদয়ের ভস্ম থেকে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।  
আমরা যারা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা’ উপন্যাস পড়েছি, তারা জানি সেই উপন্যাসে অনেক যাদুবাস্তব ঘটনা আছে। ঘটনাগুলো বাস্তব নয়, আবার শুধুই কল্পনা বলেও উপেক্ষা করা যায় না। কখনো কখনো এসব জাদুবাস্তব ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের এত সাদৃশ্য দেখা যায় যে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। উপন্যাসের এমন একটি ঘটনা দু’চার লাইনে এখানে উল্লেখ করি- যা হয়তো ফিনিক্স পাখির কথায় প্রাসঙ্গিক।
এক বীর যুদ্ধ শেষে তাঁর বাড়ির দোরগোড়ায় এসে গুলিবিদ্ধ হলেন। শত্রু তাঁকে হত্যা করল। তাঁর শরীর থেকে রক্তের ধারা গড়িয়ে নামল। ধারাটি ধীরে ধীরে কিছুদূর গেল, তারপর আর থামলো না। যেতে যেতে সারা গ্রাম ঘুরে এলো সেই রক্তের ধারা। ঘুরে এসে এবার বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। তারপর ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকে দেয়াল ঘেঁষে কার্পেট বাঁচিয়ে এঁকেবেঁকে সাবধানে গিয়ে রক্তের ধারাটি থামল তাঁর মায়ের পায়ের কাছে। মা তখন রান্নাঘরে রান্না করছিলেন...। এই জাদুবাস্তব ঘটনা মার্কেসের কল্পনার সৃষ্টি।
আমাদের বাস্তব ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর কন্যা তাঁর রক্তেরই ধারা, তাঁর উত্তর প্রজন্ম। কন্যা তাঁর মা’কে খুঁজে পাননি। কেননা মা’কেও হত্যা করেছিল ঘাতকরা। দেশমায়ের কাছে ফিরে এলেন তিনি। দলের হাল ধরলেন, দেশের হাল ধরলেন। ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সময় পার হয়ে আবার তাঁর দল ক্ষমতা পেল। তিনি হলেন বাংলাদেশ নামের জাহাজের ক্যাপ্টেন। খুনি-ঘাতকেরা এই সময় হাত গুটিয়ে বসে ছিল না। তারা শক্তি সঞ্চয় করেছে, গোপনে হাত মিলিয়েছে একাত্তরে পরাজিত শত্রুর সঙ্গে। ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট অন্ধকারের প্রেতাত্মারা আবার গর্ত থেকে বেরিয়ে এলো- আবার আঘাত হানল তারা ।
ঊনত্রিশ বছর আগে পিতা ছিলেন তাদের টার্গেট, এবার কন্যা হলেন গ্রেনেড ও গানম্যানের নিশানা। পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলার সেই ভিডিও দেখলে রক্ত হিম হয়ে যায়। ঠান্ডা মাথায় এভাবে নিরীহ নিরপরাধ মানুষ হত্যা আমরা আগে দেখেছি একাত্তরের পঁচিশে মার্চ কালরাতে- পাকিস্তানি সৈন্যরা ঘটিয়েছিল সেই গণহত্যা। হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাসী হন্তারকের দল আরও একবার পৈশাচিক উল্লাস করল। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ রক্তে লাল হয়ে গেল।
এত এত মানুষকে হত্যা করেও ঘাতকের মূল লক্ষ্য কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিল। দলের নেতা-কর্মীর মানব ঢাল আর মানুষের ভালোবাসা তাদের নেত্রীকে বাঁচিয়ে দেয়। গ্রেনেড ব্যর্থ হওয়ার পর খুনি স্নাইপাররা গুলি ছুঁড়েছিল তাঁকে লক্ষ্য করে। এবার তাঁকে বাঁচান তাঁর দেহরক্ষী- নিজ দেহে একের পর এক বুলেট নিয়ে এই বিশ্বস্ত দেহরক্ষী আড়াল করে রাখেন তাঁর প্রাণপ্রিয় নেত্রীকে। এমন আত্মত্যাগের ঘটনা বিরল। সেদিনও ঘাতকের বুলেট তাঁকে ছুঁতে পারেনি, গ্রেনেডের শত শত স্পিন্টার তাঁর ক্ষতি করতে পারেনি। তিনি উঠে এসেছেন ধ্বংস আর মৃত্যুর ভিতর থেকে বারবারÑ ফিনিক্স পাখির মতো- যে পাখি মৃত্যুহীন। তিনি শেখ হাসিনা।
আজ তাঁর জন্মদিন।   
লেখক :  বীর মুক্তিযোদ্ধা, মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার

×