ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১

বাংলাদেশের পুনর্জন্মের দিন আজ

এনামুল হক শামীম

প্রকাশিত: ২১:৪০, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩

বাংলাদেশের পুনর্জন্মের দিন আজ

শেখ হাসিনা

বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে যেমন স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হতো না, তেমনি তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার জন্ম না হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ পুনরুদ্ধারও ছিল অসম্ভব। বাংলাদেশ পথ হারিয়েছিল ১৯৭৫ সালে, আপন পথ খুঁজিয়েছে শেখ হাসিনার হাত ধরে। বঙ্গবন্ধুর বীরকন্যা, দেশরত্ম শেখ হাসিনার জন্মদিন আজ। এই দিনটিকে বাংলাদেশের পুনর্জন্মের দিন বললেও বেশি বলা হবে না। বিগত চার দশকে তিনি হয়ে উঠেছেন সত্যিকার অর্থেই আমজনতার অতি আপনজন। তাঁর সংগ্রামমুখর জীবন বাংলাদেশেরও উত্থান-পতনের ধারাবাহিতার ইতিহাস। সহজ সারল্যে ভরা তার ব্যক্তিগত জীবন। পোশাকে-আশাকে, জীবন-যাত্রায় কোথাও কোনো প্রকার বিলাসিতা বা কৃত্রিমতার ছাপ নেই। পিতার মতোই বাংলার মাঠঘাট থেকে উঠে আসা একজন বাঙালি মেয়ে। মেধা, যোগ্যতা, সততা, সাহস দিয়ে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। 
কবি হাসান হাফিজুর রহমান শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, ‘আপনিই তো বাংলাদেশ।’ ১৯৯১-এর নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শহীদ জননী বেগম সুফিয়া কামাল তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমাকে থাকতে হবে এবং বাংলাদেশকে বাঁচাতে হবে।’ আমাদের প্রিয় নেত্রী তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টেছিলেন। তিনি ছিলেন বলেই বাংলাদেশের নজরকাড়া অর্জন এখন সারা দুনিয়ায়। নজর কেড়েছেন তিনিও। আসীন হয়েছে বিশ^ নেতৃত্বের আসনে। জাতিসংর্ঘের অধিবেশন ও অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৫তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন পর্যবেক্ষণ করলেই সে চিত্র পাওয়া যায়।

সবার মধ্যমণি ছিলেন বদলে দেওয়া বাংলাদেশের রূপকার জননেত্রী শেখ হাসিনা। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার পর যার নেতৃত্বে স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে হাঁটছি। শেখ হাসিনার হাতে দেশের নেতৃত্ব থাকলে ২০৪১ সালের আগেই বাংলাদেশ হবে একটি অন্যতম অর্থনীতির দেশ। 
তিনি আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার, আঁধারভেদী আলোকশিখা। বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের ত্রাতা। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের কোটি কোটি বিপন্ন মানুষের মর্মবাণী আজ উচ্চারিত হচ্ছে তার কণ্ঠে। স্বজন হারানোর চিরবেদনায় কাতর হয়েও তিনি মানুষের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার অদম্য পথ চলাই তাকে গন্তব্যের শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে দিয়েছে। দীর্ঘদিন শেখ হাসিনার পাশে থেকে উপলব্ধি করেছি, দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়ন ভাবনাই তার জীবনের ব্রত। হেনরি কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশ আজ ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার আশ্রয়দাতা। তাদের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসারও জোগানদাতা। তাই বঙ্গবন্ধুকন্যা আজ ‘মাদার অব হিউমিনিটি’। সরকারি অর্থায়নে পাকাঘরসহ বাড়ি দিচ্ছেন ভূমিহীনদের। যা বিশ্বের নতুন নজির।
উন্নয়নের এই মহাসড়কের যাত্রাটা সব সময় কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এসেছে অনেক বাধা-বিপত্তি। সবকিছু গুঁড়িয়ে দিয়েছেন অদম্য সাহসিকতায়। পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল বাংলাদেশকে জঙ্গিরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করার। সেই ষড়যন্ত্রের মুখে কুঠারাঘাত করেছেন তিনি। জঙ্গির বংশকে করেছেন সমূলে নির্মূল। তাঁর গতিশীল নেতৃত্বের কারণেই করোনা মহামারির মধ্যেও দেশের অর্থনীতির চাকা সচল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এশিয়ার প্রায় সব দেশের ওপরে। সঠিক নেতৃত্ব, সময়োচিত পদক্ষেপ, মানুষের জন্য আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা, অর্থনীতিকে বাঁচাতে প্রণোদনা ঘোষণা এবং বাস্তবায়নের কারণে দেশে অনাহারে একজন মানুষেরও মৃত্যু হয়নি, খাদ্যের জন্য হাহাকার হয়নি।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি, একাত্তরের ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করা, সংবিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ব্লু ইকোনমির নতুন দিগন্ত উন্মোচন, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধের মীমাংসা, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে মহাকাশ জয়, সাবমেরিন যুগে বাংলাদেশের প্রবেশ, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, কর্ণফুলী টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, নতুন নতুন উড়াল সেতু, মহাসড়কগুলো ফোর লেনে উন্নীত করা, এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত, দারিদ্র্যের হার হ্রাস, মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭৪ বছর ৪ মাসে উন্নীত,  যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন, সাক্ষরতার হার ৭৫.৬০ শতাংশে উন্নীত করা, বছরের প্রথম দিনে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে নতুন বই পৌঁছে দেওয়া, মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা ও স্বীকৃতি দান, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, প্রত্যেকটি জেলায় একটি করে সরকারি/বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ, নারীনীতি প্রণয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ, ফাইভ-জি মোবাইল প্রযুক্তির ব্যবহার চালুসহ অসংখ্য ক্ষেত্রে কালোত্তীর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। 
একবিংশ শতকের অভিযাত্রায় বাঙালি জাতির কাণ্ডারি হওয়ার ইতিহাস শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখতেন, সেই স্বপ্ন রূপায়ণের দায়িত্ব নিয়ে বাঙালি জাতির আলোর দিশারি হওয়ার ইতিহাস তিনি। ১৯৮১ সালে সম্মেলনে তাঁকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ছয় বছর প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে ওই বছরই তিনি মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর সরকার গঠন করে এবং সে বছরের ২৩ জুন প্রথমবারের মতো তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে বিজয় অর্জন করে। শেখ হাসিনা দ্বিতীয় বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।  ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দিনি যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

শিল্প সংস্কৃতি ও সাহিত্য অন্তপ্রাণ শেখ হাসিনা লেখালেখিও করেন। তার লেখা এবং সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০টিরও বেশি। প্রকাশিত অন্যতম বইগুলো হচ্ছে- শেখ মুজিব আমার পিতা, সাদা কালো, ওরা টোকাই কেন, বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম, দারিদ্র্য দূরীকরণ, আমাদের ছোট রাসেল সোনা, আমার স্বপ্ন আমার সংগ্রাম, সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, বিপন্ন গণতন্ত্র, সহেনা মানবতার অবমাননা, আমরা জনগণের কথা বলতে এসেছি, সবুজ মাঠ পেরিয়ে ইত্যাদি। আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্বে থাকা শেখ হাসিনা ৪২ বছর ধরে নিজ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আপোসহীন নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশের রাজনীতির মূল স্রোতধারার প্রধান নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। শুধু উপমহাদেশেই নয়, কেড়েছেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের নজর। 
একটি কাক্সিক্ষত স্বপ্ন নিয়ে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে তা পূরণ হয়েছে। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার আন্দোলনে যুক্ত হন। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামে তিনি এখন অনেকটাই সফল। বাকি যেটুকু রয়েছে তা বাস্তবায়নে তাঁকে এগিয়ে যেতে হবে। পিতার মতোই তিনি বাংলাদেশ ও বাঙালিদের কল্যাণ কামনা করেন। জনগণের মঙ্গল কামনায় সব সময় তিনি নিয়োজিত থাকেন। তিনি এমন একজন রাজনীতিক যিনি মহাকাশে স্যালেটাই পাঠান, আবার নিভৃত পল্লীতে একজন বিধবা স্বামী পরিত্যাক্ত মহিলা ভাতা পেলেন কিনা সেই খবরও রাখেন?

আসুন শেখ হাসিনার আলোকবর্তিকা সামনে রেখে সবাই মিলে জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করি। অন্ধকার অনামিষার পথ পাড়ি দেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অপ্রতিরোধ যাত্রায় দুর্গম পথে এগিয়ে যাই। আজকের দিনে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। শুভ জন্মদিন বঙ্গবন্ধুর বীরকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আল্লাহ আপনার দীর্ঘায়ু দান করুন-আমিন।  

লেখক : উপমন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়; সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

×