ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৪ মার্চ ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২

তারেক রহমানের পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি

ড. এস.এম. হেমায়েত জাহান

প্রকাশিত: ১৭:৩৭, ১৪ মার্চ ২০২৬

তারেক রহমানের পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পরিবর্তন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আঙ্গিকে ঘটেছে। তবে একটিমাত্র প্রশ্ন সব সময় প্রধান হয়ে উঠেছে-ক্ষমতার প্রকৃতি কি বদলাবে, না শুধু ব্যক্তি  বদলাবে? এই প্রশ্নটি বরাবরই রাজনৈতিক আলোচনার মূল বিষয় হয়ে এসেছে। প্রতিটি ক্ষমতা পরিবর্তনের সময় এটি ভিন্নভাবে উঠে এসেছে। কিন্তু সঠিক উত্তর এখনো অমীমাংসিত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তার প্রথমবারের বক্তৃতা এবং নির্দেশনাগুলো নতুনভাবে এই পুরানো প্রশ্নটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এটি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরও গভীরভাবে চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
তারেক রহমানের ক্ষমতা গ্রহণের সময় যে বার্তাগুলো তিনি জনগণের কাছে পৌঁছিয়েছেন, তা একদিকে যেমন জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন, অন্যদিকে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখার প্রতিকৃতি হিসেবে নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে। তিনি কি শুধু পূর্ববর্তী রাজনৈতিক কাঠামোকে অনুসরণ করবেন, না কি নতুন একটি দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরিবর্তনের শপথ গ্রহণ করবেন? তাঁর বার্তা, পদক্ষেপ এবং কর্মসূচি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এক ধরনের আশার সঞ্চার করেছে। তবে এটি কি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এবং গভীর পরিবর্তন আনবে, তা ভবিষ্যতের পেছনে নির্ভর করে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বর্তমান সময়ে ক্ষমতার ধরন পরিবর্তন হবে কিনা। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন একদিকে যেমন একটি দেশের উন্নতি এবং জনগণের কল্যাণের সংকেত, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শক্তির বন্টনেও নতুন ধরনের টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে। তবে তার কিছু ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন দিক সূচনা করেছে, যা শুধু প্রতীকী নয়, বাস্তব ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত যেসব আচরণ ও চিত্র রয়েছে, তা প্রায় এক রকমই ছিল-সরকারপ্রধানের গাড়িবহর, সড়কের পাশে নিরাপত্তা বলয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাফিক জ্যাম, এসব তো ছিলই। ১৩-১৪টি গাড়ির বহর, পতাকাবাহী ভিআইপি গাড়ি এবং সড়কের দুই পাশে নিরাপত্তা বাহিনী-দৃশ্যগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এক প্রকার প্রদর্শন। এই বাস্তবতা মানুষের মধ্যে শাসক শ্রেণির প্রতি এক অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি করেছিল। যেখানে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত এই প্রক্রিয়ায় নিজেদের অংশীদার মনে করতো না।
এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিছু সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপন্থি। যেখানে তিনি দায়িত্ববোধকে প্রধানত তুলে ধরেছেন, আর শাসন ব্যবস্থা আর বিলাসিতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো-পতাকাবিহীন গাড়ি ব্যবহার, ১৩-১৪ গাড়ির বদলে ৪টি গাড়ির বহর, ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা এবং সরকারি গাড়ির বদলে নিজের গাড়ি ব্যবহার। এই পরিবর্তনগুলো একদিকে যেমন প্রতীকী, তেমনি তা প্রশাসনিক দিক থেকেও একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এসব পদক্ষেপে যে প্রতীকী বার্তা রয়েছে, তা স্পষ্ট- ক্ষমতা প্রদর্শন নয়, দায়িত্ব পালন। এই বার্তাটি তারেক রহমান এমন এক সময়ে দিয়েছেন, যখন জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তার পতাকাবিহীন গাড়ি ও কম সংখ্যক গাড়ির বহর সাধারণ মানুষের সঙ্গে একত্রীকরণ এবং শাসকের কাছাকাছি আসার ইঙ্গিত দেয়। ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা- এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ‘আইন সবার জন্য সমান’ এই নীতির প্রকাশ পায়। দীর্ঘদিনের ভিআইপি সংস্কৃতির কারণে সাধারণ মানুষের মনে যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এমন পদক্ষেপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া, মন্ত্রিসভার বৈঠক সচিবালয়ে আয়োজনের সিদ্ধান্ত। যেখানে অতীতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এসব বৈঠক আয়োজিত হত। এর ফলে জনগণের জীবনযাত্রার ওপর চাপ কমাবে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে এক ধরনের মানবিক দিক প্রকাশ পাবে। এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা থেকে বিরত থাকার ঘোষণা একধরনের রাজনীতির সেবামূলক রূপান্তরের চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর এসব পদক্ষেপ শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং প্রশাসনিক বাস্তবতায়ও নতুন দিক উন্মোচন করেছে। সচিবালয়ে বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ। যা অতীতে মন্ত্রীদের বহর নিয়ে সড়ক নিয়ন্ত্রণের যে চাপ সৃষ্টি হতো, তা কমাতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি, এমপিদের শুল্কমুক্ত সুবিধা না নেওয়ার ঘোষণা রাজনৈতিক অর্থনীতির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি রাজনীতিকে বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণি থেকে সেবামূলক নেতৃত্বে রূপান্তর করার এক প্রচেষ্টা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে এক শক্তিশালী ব্যক্তি-কেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা বিরাজ করেছে। যেখানে নিরাপত্তা ও ক্ষমতা প্রদর্শন ছিল বড় ভূমিকা। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পদক্ষেপে এক ধরনের ‘মানবিক প্রশাসন’-এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে সহায়ক হতে পারে। পুরানো রাজনীতির ধারার পরিবর্তনের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা সত্যিই একটি বড় সাফল্য হতে পারে।
যতটা গুরুত্বপূর্ণ এই পদক্ষেপগুলো, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ এগুলোর ধারাবাহিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। যদি এসব পদক্ষেপ শুধু ব্যক্তিগত আচরণে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সম্ভব হবে না। যদি এসব পদক্ষেপ নীতিমালায় রূপান্তরিত হয়, যেমন- ভিআইপি চলাচল সংক্রান্ত স্থায়ী নীতিমালা, সরকারি সুবিধা সীমিতকরণ আইন এবং প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচন-তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে।
যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এসব সিদ্ধান্ত বেশ ইতিবাচক, তবে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল একটি দেশে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বহরের সংখ্যা কমানো, ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা এবং নিরাপত্তা বাহিনী কমিয়ে দেওয়া কিছুটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে এই ঝুঁকির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আধুনিক, গোয়েন্দা-নির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দাঁড়ায়, এই পরিবর্তন কেবল একটি সূচনা, নাকি সত্যিকার প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের শুরু? যদি প্রধানমন্ত্রীর এসব পদক্ষেপ ধারাবাহিকভাবে অনুসৃত হয় এবং এসব সিদ্ধান্ত নীতিমালায় পরিণত হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি এক যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে দেখা যেতে পারে। এভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি আগামী দিনে আরও জনপ্রিয়, গণতান্ত্রিক এবং মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যেখানে নেতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমবে এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পাবে। এটাই হলো নতুন বাংলাদেশ, যা সম্ভবত তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। 
দুর্নীতি বন্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিন্তা খুবই ইতিবাচক। দুর্নীতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং সামাজিক জীবনের একটি অত্যন্ত জটিল এবং বড় সমস্যা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি মোকাবিলায় বিভিন্ন নির্দেশ এবং পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেছেন, যা দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। তার এসব নির্দেশনা মূলত দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি কঠোর অবস্থান গ্রহণ এবং শাসনব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ করে তোলার আন্তরিক প্রচেষ্টা।
তারেক রহমানের নির্দেশ অনুযায়ী, দুর্নীতি দূরীকরণে সরকার একটি সুসংহত নীতি গ্রহণ করবে। যার মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি তহবিলের অপচয় রোধ করা হবে। তার নেতৃত্বে প্রশাসনিক সংস্কার ও তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। যেন দুর্নীতি করার জন্য কোনো সুযোগ না থাকে। এছাড়াও দুর্নীতি দমনে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে টেকনোলজি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং দুর্নীতিগ্রস্তদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি, দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য বিশেষ আদালত গঠন এবং তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুততর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে একমাত্র সরকারের ক্ষমতা নয়, জনগণের অংশগ্রহণকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এজন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার হিসেবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কথা বলেছেন। যাতে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার পরিবেশ তৈরি হয়। তার এই নির্দেশনা দুর্নীতি রোধে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের একটি প্রতিফলন। যা দেশের উন্নয়নকে আরো ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হতে পারে। ইতোমধ্যে তারেক রহমানের এসব পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। 
লেখক : অধ্যাপক, উপ-উপাচার্য, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী

প্যানেল/মো.

×