ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৪ মার্চ ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার

ফাহিমা তাসনিম

প্রকাশিত: ১৭:৩২, ১৪ মার্চ ২০২৬

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার

শিক্ষা একটি জাতির ভিত্তি ও জাতীয় অগ্রগতির জীবনশক্তি। একটি সুপরিকল্পিত ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থাই পারে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে। বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নের পথে ধাবমান- অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত, প্রযুক্তি ও যোগাযোগ সবখানে অগ্রগতির চিহ্ন আজ দৃশ্যমান। তবে এই উন্নয়নকে টেকসই ও অর্থবহ করতে হলে যে ভিত্তিটি সবচেয়ে বেশি সুদৃঢ় করা প্রয়োজন, তা হলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষাকে উপেক্ষা করে কোনো দেশই তার উন্নয়ন পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে না। সমাজবিজ্ঞানী আর এম ম্যাকাইভার যথার্থই বলেছেন, অশিক্ষিত জনতা কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের কাঙ্খিত মৌলিকত্ব অর্জনে অনেকাংশে ব্যর্থ। প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার প্রতিটি ধাপেই সংস্কার আজ সময়ের দাবি। 
প্রথমত, সংস্কারের সূচনা হতে হবে প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই। শিক্ষার মূল ভিত্তি স্থাপিত হয় এই স্তরেই। পরিতাপের বিষয় হলো, এখানেই সবচেয়ে বেশি অবহেলা পরিলক্ষিত হয়। যার শুরুটা হয় শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানাবিধ অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার মাধ্যমে। ফলে দীর্ঘকাল ধরেই দেশে যোগ্য ও মানসম্মত শিক্ষকের সংকট বিদ্যমান। শিক্ষক নিজেই যদি যোগ্য না হন, তবে সঠিক শিক্ষাদান কিভাবে সম্ভব? অথচ এই শিক্ষকরাই গড়ে তুলবে আগামীর দেশ গড়ার কারিগরদের।
এছাড়াও অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত সমস্যা প্রকট। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব, শ্রেণিকক্ষের অবস্থা জরাজীর্ণ এবং শিক্ষা উপকরণের স্বল্পতা বিদ্যমান। তবে সবচেয়ে সংকট হলো- শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা বা শেখার মান যাচাই না করেই এক শ্রেণী থেকে অন্য শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করা। এর ফলে তারা শুদ্ধ ভাবে পড়তে, লিখতে কিংবা গণিত ও বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে না পারলেও কাগজে-কলমে সনদ অর্জন করে ফেলে। এই দুর্বল ভিত্তির নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তাদের পরবর্তী জীবনে, যখন তারা জটিল বা উচ্চতর শিক্ষার মুখোমুখি হয়। দ্বিতীয়ত, পাঠ্যক্রমের আমূল ও যুগোপযোগী সংস্কার অপরিহার্য। দেশের প্রচলিত পাঠ্যক্রম বর্তমান বিশ্বের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে অনেকটাই অক্ষম। 
বর্তমান যুগ দ্রুত পরিবর্তনশীল। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) ও বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন আঙ্গিকে ভাবতে বাধ্য করছে। আমাদের পাঠ্যক্রম এখনো সেই মান্ধাতার আমলেই রয়ে গেছে। যার অনেকাংশই মুখস্থ নির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। বাস্তবমুখী দক্ষতা, উদ্ভাবনী ও বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা কিংবা নৈতিক ও নাগরিক শিক্ষার মতো বিষয়গুলোকে পাঠ্যক্রমে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও কর্মজীবন ও বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পিছিয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সন্তোষজনক নয়। গবেষণার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত, পাঠ্যসূচি সেকেলে এবং মুখস্থ নির্ভর, শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ অত্যন্ত দুর্বল। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, উদ্ভাবন কিংবা সৃজনশীল চিন্তাশক্তি বিকাশের পরিবেশ এখনো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। 
বর্তমানে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী প্রতিটি তরুণ-তরুণীর কাছে ক্যারিয়ার গঠনের সুযোগ যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো দেশে গবেষণাভিত্তিক ক্যারিয়ার বা বিষয়ভিত্তিক বাস্তব কর্মসংস্থানের অভাব। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মৌলিক প্রজেক্ট বা গবেষণার সুযোগ দিতে পারলেও তা থেকে কর্মসংস্থানে রূপান্তর খুবই সীমিত। ফলে অসংখ্য শিক্ষার্থী তাদের অর্জিত শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পেশা খুঁজে পাচ্ছে না। এমতাবস্থায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিসিএস বা সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতায় ঝুঁকছে। বাস্তবতা হলো, বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রায় তিন লক্ষাধিক প্রার্থীর বিপরীতে ক্যাডার পদে নিয়োগ পান মাত্র ২০০০-৩৫০০ জন। অর্থাৎ, প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার জন পরীক্ষার্থী তীব্র প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েও কাক্সিক্ষত চাকরি থেকে বঞ্চিত হন। এই অসম প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থী হতাশা ও বিষণ্নতায় নিমজ্জিত হচ্ছেন এবং নতুন উদ্যমে কিছু করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছেন। 
সর্বশেষ, শ্রমশক্তি জরিপ (খধনড়ঁৎ ঋড়ৎপব ঝঁৎাবু) ২০২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট বেকারের সংখ্যা ২.৬২ মিলিয়ন। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার জনই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী, অর্থাৎ, তারা ‘শিক্ষিত বেকার’ হিসেবে তালিকাভুক্ত। এই পরিসংখ্যান আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার করুন চিত্রই তুলে ধরে, যা সমগ্র সমাজ ও অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত।
এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কি? শিক্ষা সংস্কার মানে কেবল পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন নয় । এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ শিক্ষক নিয়োগ, সঠিক নীতি নির্ধারণ, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার, গবেষণার প্রসার এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সর্বোপরি প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি। প্রাথমিক স্তরে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, এটিই হচ্ছে একজন মানুষের মেধা বিকাশের ভিত্তি। পাশাপাশি প্রণয়ন করতে হবে যুগোপযোগী ও দক্ষতা ভিত্তিক কারিকুলাম। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগও গ্রহণ করতে হবে। এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ড দুর্বল হলে উন্নয়নের সকল অর্জনই হবে ভঙ্গুর ও ক্ষণস্থায়ী। তাই এখনই সময় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলার। যেন শিক্ষার্থীরা হতাশাগ্রস্ত না হয়ে নতুন উদ্যমে শিক্ষা অর্জন করে দেশ ও জাতিকে পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে, একটি কথা মনে রাখা জরুরি-‘শিক্ষাব্যবস্থা যেমন হবে, রাষ্ট্রও ঠিক তেমনই হবে।’ এই সত্য উপলব্ধি করে এখনই বাংলাদেশ শিক্ষা সংস্কারের পথে দৃঢ়ভাবে হাঁটতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্যানেল/মো.

×