সড়ক এখন মৃত্যুর মিছিলের প্রতিচ্ছবি এবং এই মৃত্যুর মিছিল নিয়ে জাতি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। সড়ক দুর্ঘটনা এখন এক নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর ঈদ, পূজা ও অন্যান্য সামাজিক উৎসবের সময় সড়কে প্রাণহানির সংখ্যা অনেকগুণ বেড়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের জীবনে এক আতঙ্ক হিসেবে রয়ে গেছে। আমরা নিরাপদ সড়ক চাই, কিন্তু পরিবহন সেক্টরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কি তাতে সম্মত? যদি তারা চাইত, তাহলে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনার এই ভয়াবহতা বৃদ্ধি পেত না। যখন ঘর থেকে গাড়ির উদ্দেশ্যে বের হই, তখন মনে হয়, আমি কি বাড়িতে ফিরে আসব, তা নিশ্চিত নয়। প্রতি বছর আমরা জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে নানা আলোচনা করি, কিন্তু সেই আলোচনাগুলোর বাস্তবায়ন কোথাও দেখা যায় না। এরই ফলস্বরূপ, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ প্রতিদিন আমাদের আহত এবং নিহত করছে। এক একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, যার কোনো সমাধান এখনও আমাদের দেশে কার্যকর হয়নি। ঢাকায় সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯টি রুটে উন্নত বাস পরিষেবা চালুর নির্দেশনা দেয়া হয়, যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল। তবে এই পদক্ষেপের অপব্যবহার করে নতুন এবং উন্নত বাসের বদলে পুরনো, ফিটনেসবিহীন বাসগুলো গোলাপি রং দিয়ে পরিবহন ব্যবসা করছে। এই বিষয়টি মনিটরিং করা জরুরি। যদি তদারকি না করা হয়, তবে রাজধানীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। সড়ক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা রোধে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, শত শত সুপারিশ এবং টাস্কফোর্স সত্ত্বেও সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হচ্ছে না।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মাসে দেশজুড়ে ৪৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৪৪৭ জন নিহত এবং ১,১৮১ জন আহত হয়েছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৫০১ সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮২ জন নিহত এবং ৭১৮ জন আহত হয়েছিলেন। এসব চিত্র দেখলে সড়কে চলাচল ভয়াবহ মনে হয় এবং তা আমাদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এখন ঘর থেকে বের হলে মনে হয়, আমি কি আর সুস্থভাবে বাড়ি ফিরব, তা নিশ্চিত নয়। অত্যন্ত দুঃখজনক! গত কয়েক বছরের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মানুষ নিহত হয়। তবে বিভিন্ন উৎসবের সময় এই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়।
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি শুধু একটি পরিবারে গভীর শোক ও ক্ষত সৃষ্টি করে না, বরং আর্থিকভাবে ওই পরিবারকে পঙ্গু করে দেয়, যা কোনোদিন পুষিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। কিছু কিছু দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু পুরো পরিবারকে পথে বসিয়ে ফেলে। ফলে ঐ পরিবারের অবস্থা খুবই করুণ হয়ে যায়। আর যারা পঙ্গু হয়ে যায়, তাদের পরিবারকে আজীবন এই ভার বহন করতে হয়। গণমাধ্যমে জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বছরে গড়ে বাংলাদেশের জিডিপির ৫ দশমিক ৩ শতাংশ ক্ষতি হয়। তবে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে মন্ত্রণালয়ে কোনো গবেষক নেই, কোনো গবেষণা নেই এবং বাজেটও বরাদ্দ নেই। তাই প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বেড়েই চলেছে। এ কারণে এই বিষয়ে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।
ফিটনেসবিহীন অনেক গাড়ি সড়কে চলাচল করছে, যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে-ট্রাফিক বিধি লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত বোঝাই করা, চালকদের অতি দ্রুতগতি, দীর্ঘ সময় ধরে বিরতিহীন গাড়ি চালানো, ছোট গাড়ির চালকদের মধ্যে সতর্কতার অভাব, দূরপাল্লার সড়ক ও জনবহুল এলাকায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন এবং সড়কের বেহাল অবস্থা। সড়ক পরিবহন আইনের ৪৩ ধারা অনুযায়ী, যানবাহনে অতিরিক্ত ওজন বহন করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। ৮৬ ধারা অনুযায়ী, এ অপরাধের শাস্তি হতে পারে এক বছরের কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড। এছাড়া চালকের নিবন্ধন থেকে ২ পয়েন্ট কাটা যাবে। কিন্তু তারপরও চালকরা অতিরিক্ত ওজন বহন করে যানবাহন চালাচ্ছেন। ওভারলোডিং দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাই এ বিষয়ে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এছাড়া চালকদের লাইসেন্স প্রদানে দুর্বলতা এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের অভাবও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। আইনের বাস্তব প্রয়োগও সড়কে তেমন কার্যকর হচ্ছে না। দুর্ঘটনার পর চালকরা জামিনে মুক্ত হয়ে যায় এবং দুর্ঘটনার দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি তেমনভাবে কার্যকর হচ্ছে না। এ কারণে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বাস টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভিডিও চিত্র প্রদর্শন এবং লিফলেট, পোস্টার, স্টিকার বিতরণ করা উচিত। সড়ককে মৃত্যুর পথে নয়, বরং নিরাপদ পথ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া পরিবহন মালিক, চালক, যাত্রী ও পথচারীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা মানুষের জীবনের মূল্য এবং পেশাগত দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।
দুর্ঘটনার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের সংশোধিত আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সড়কে নিরাপদ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। আইন কার্যকর করতে পুলিশের আরও তৎপরতা প্রয়োজন এবং নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকরাই দায়ী নয়, রাস্তার পাশে অবস্থিত দোকান, স্কুল, পথচারী এবং শিশুদের দৌড়ে রাস্তা পার হওয়াও এসব দুর্ঘটনায় অবদান রাখে।
ঈদ একটি ধর্মীয় উৎসব হলেও, এটি সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর জন্য একটি বিশেষ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতি বছর, ঈদ উৎসবে যাত্রীরা বাড়ি ফেরার জন্য সড়কগুলোতে সমাগম বাড়ায়, যার ফলে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি, বিশেষ করে ঈদের সময় সড়ক নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য আরও কিছু সতর্কতা প্রয়োজন। যেমন- ঈদ যাত্রার সময় সড়কে অতিরিক্ত যানজট সৃষ্টি হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। এজন্য বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা উচিত, যাতে প্রতিটি বাস, মিনিবাস, ট্রাক ও ব্যক্তিগত যান সঠিকভাবে চলাচল করতে পারে। পিক সময়ে সড়কগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো এবং সরল ও দ্রুতগতির ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এছাড়া ঈদ যাত্রার সময় সড়ক দুর্ঘটনার একটি প্রধান কারণ ফিটনেসবিহীন পুরনো গাড়ি। বিশেষত, অনেক পুরনো বাস ও ট্রাক সড়কে চলাচল করে থাকে, যা দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। এজন্য সরকারকে সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করার জন্য আরও তদারকি বাড়াতে হবে। ঈদ যাত্রার পূর্বে এসব যানবাহনগুলো পরীক্ষা করা এবং অবৈধ গাড়িগুলোকে রাস্তায় না চলতে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঈদের সময় যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের জানাতে হবে যে, সড়ক নিরাপত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং তারা যদি গাড়িতে যাত্রা করার সময় নিরাপত্তার কথা না ভাবেন, তবে বিপদ ঘনিয়ে আসবে। এজন্য সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কিত ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে যাত্রীদের সচেতন করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা এবং আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার জন্য জরুরি চিকিৎসা দল প্রস্তুত রাখতে হবে। ঈদের সময়ে হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত সেবা নিশ্চিত করতে হবে যাতে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়। ঈদযাত্রা শুরু হওয়ার আগে বাস টার্মিনালগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ভিড়ভাট্টা থেকে রক্ষা পেতে বাস টার্মিনালগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপত্তা কর্মী রাখতে হবে এবং প্রতিটি বাসের যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বাসের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা তদারকি করতে হবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
প্যানেল/মো.








