ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২

শিশুদের ডিজিটাল আসক্তি

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

প্রকাশিত: ১৮:৫৩, ৭ অক্টোবর ২০২৫

শিশুদের ডিজিটাল আসক্তি

তথ্যের অবাধ প্রবাহ, প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ডিজিটাল প্রযুক্তিকে মানুষের হাতের মুঠোয় এমনভাবে পৌঁছে দিয়েছে যে এগুলো ছাড়া জীবন পরিচালনা করা অসম্ভব। শিশুরাও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু প্রযুক্তির ভালো-মন্দ শিশুরা তেমন বোঝে না। বুঝে না বুঝে মনের  অজান্তেই হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারময় ভার্চুয়াল জগতে। মা-বাবা এমনকি স্কুল ফাঁকি দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিমজ্জিত থাকছে এই অন্ধকার জগতে।  ফলে বিশাল এক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। সংসার সামলাতে বাবা-মায়ের চাকরি করা এখন একটি বাস্তব বিষয়। ফলে অনেক বাবা-মাকে তার সন্তান থেকে দীর্ঘ সময় ধরে দূরে থাকতে হয়। এই সময়টা শিশুর একাকিত্বের একমাত্র সঙ্গী প্রযুক্তি। বাইরে যখন খেলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ নেই তখন মোবাইল ফোন কিংবা ট্যাব তাদের জীবন সঙ্গী। অর্থাৎ সন্তান তার বাবা-মার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে যা শিশু অধিকার সনদের পরিপন্থি। মোবাইল ফোনের মধ্যে থাকা ট্রান্সমিটিং ডিভাইস থেকে যে অদৃশ্য রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি তরঙ্গ (রেডিয়েশন) নির্গত হয়, তার লেভেল প্রতি কিলোগ্রামে ১.৬ ওয়াটের বেশি হলে মানবদেহে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। দেখা দেয় অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে ‘স্ক্রিন অ্যাডিকশন’। গবেষণায় প্রতীয়মান যে, অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা দিনে পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা ডিজিটাল যন্ত্র নিয়ে মেতে থাকছে। ফলে বাইরে বেড়াতে যাওয়া, খেলাধুলা করা, মুখোমুখি বসে আড্ডা দেওয়া ইত্যাদি সব ধরনের ফেসুটুুফেস ইন্টারুঅ্যাকশনে আগ্রহ কমে যাচ্ছে। 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক এর ১১তম ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজেস (আইসিডি)-তে স্মর্টফোন এবং কম্পিউটারে গেম খেলার নেশাকে গেমিং ডিজঅর্ডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে গেমিং আসক্তিকে একটি প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিটি পরিবারই আজ চিন্তিত তাদের সন্তানদের আচার-আচরণ ও খিটখিটে মেজাজ নিয়ে। শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ টিভির পর্দা, মোবাইল ফোন কিংবা ট্যাবলেটের মতো ছোট স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। তাই এসব গেম নিয়ে সমাজতত্ত্ববিদ, মনোরোগ চিকিৎসক এবং সাইবার বিশেষজ্ঞগণের চিন্তার কোনো অন্ত নেই। কারণ এ ধরনের ভাইরাস গেম হিংসাত্মক আচরণকে প্রশ্রয় দেয়। এমনকি গেমের নিয়ম মানতে গিয়ে মৃত্যুও হয়েছে অনেকের। পাবজির মতো গেম খেলায় শিশুমনে কিরূপ প্রভাব পড়ছে তা কারও অজানা নয়। আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির তিন মনোবিজ্ঞানীর পরিচালিত তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডের এক হাজার ৩২৩ জন ছেলে-মেয়ের ওপর সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব ছেলে-মেয়ে দৈনিক দুই ঘণ্টার বেশি টিভি বা ভিডিও গেম দেখে, তারা গড় হারের দেড় থেকে দুই গুণের বেশি মনঃসংযোগ সমস্যায় পড়ে। শিশু মনোবিজ্ঞানী ডগলাস জেনটাইলের মতে, ভিডিও গেমগুলোতে দ্রুত দৃশ্য বদল, আলো, শব্দ, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলের সর্বক্ষণ পরির্বতন ও কম্পন এমনভাবে হয়ে থাকে যে শিশুদের মনে ও মস্তিষ্কে তা স্থায়ী হয়ে যায়। এই অবস্থায় শিশুরা যখন ক্লাসরুমে যায় তখন সেখানে এ ধরনের কিছু না পেয়ে শিক্ষকের নিরস পাঠদানের প্রতি মনঃসংযোগ থাকে না। ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেটের অজুহাতে লেখাপড়া, খেলা ও বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে দিনরাত ডুবে থাকছে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের অন্ধকার জগতে। 
ইংল্যান্ডে শিশু বিশেষজ্ঞ স্যালি পেইন তার এক গবেষণায় দেখিয়েছেন ডিজিটাল ট্যাব এবং স্মার্ট ফোন ব্যবহারের অবাধ সুযোগ পেয়ে শিশুদের মধ্যে পেন বা পেন্সিল ধরার এবং তা ব্যবহারের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। একসময় শিশুরা দেখতো তার বাবা-মা পেন দিয়ে বাজারের ফর্দ লিখতেন, এখন তারা দেখে বাবা-মা মোবাইল ফোনে টেক্সট করছে। ২০১৬ সালের অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে যেসব ছাত্ররা হাতে লেকচার নোটস লেখেন, তারা পরে সেগুলো অনেক ভালো মনে রাখতে পারে এবং তাদের ধারণা অনেক পরিচ্ছন্ন থাকে। কিন্তু কম্পিউটার বা ট্যাবে যারা নোটস নেন, তারা অনেক লিখতে পারলেও মনে রাখতে পারে না। ডিজিটাল আসক্তিতে শিক্ষার্থীরা মানসিক ও শারীরিকভাবেও চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মধ্যে বিষণ্নতা, খিটখিটে স্বভাব, উগ্রতা, হঠাৎ রেগে যাওয়া, অপরাধপ্রবণতা, উদ্বেগ, একাকী থাকতে ইচ্ছা করা, বুদ্ধির বন্ধুত্ব, ভালো কথার নেগেটিভ রিঅ্যাক্ট করা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মানসিক উন্মাদনা, কল্পনাশক্তি হ্রাস, স্কুলে যেতে ইচ্ছা না করা, পড়াশোনায় অমনোযোগী, চোখের সমস্যা, ঘুম কম, অতিরিক্ত ওজন ও আত্মকেন্দ্রিক হওয়া ইত্যাদি লক্ষণীয়। আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সম্প্রতি অনেক দেশ যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ইংল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডসসহ আরও কিছু দেশে স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে বা এর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলোর মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্মার্টফোনে আসক্তি রোধ করা, মনোযোগ বৃদ্ধি করা এবং পড়াশোনায় ব্যাঘাত কমানো। 
প্রযুক্তি যেমন বিজ্ঞানের একটি অবিস্মরণীয় আবিষ্কার তেমনি এর ঝুঁকিও অনেক। আর তা যদি হয় শিশুর ক্ষেত্রে, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য হুমকি। একটি শিশু যখন খুব সহজেই হাতের মুঠোয় স্মার্টফোন পেয়ে যায় তখনই সে নানা খারাপ সমবয়সীদের সঙ্গে মিশতে থাকে। যা তাকে ধীরে ধীরে বিপথে নিয়ে যেতে পারে। সেজন্যে কোন বয়সে কতক্ষণ ডিজিটাল ডিভাইসের সঙ্গে কাটানো উচিত তা নির্ধারণ করা উচিত। স্বাস্থ্য ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে প্রথম ৩ বছর পর্যন্ত শিশুর জন্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার থেকে বিরত থাকা ভাল। ডিভাইসের পরিবর্তে শিশুকে মুখে ছড়া, গান, গল্প শোনানো উচিত। ৩-৮ বছরের শিশুর জন্য মাঝে মাঝে ১০-১৫ মিনিটের জন্য বড়দের তত্ত্বাবধানে গান, ছড়া, গল্প বা শিশু উপযোগী বিষয়গুলো দেওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সারাদিনে ৩-৫ বছরের শিশুর জন্য সর্বোচ্চ ৪০ মিনিটের মধ্যে স্ক্রিনিং (মোবাইল, টিভি, ট্যাব, কম্পিউটার বা এ ধরনের যে কোনো ডিভাইস হতে পারে) এর সময়সীমা রাখতে হবে। ছোট শিশুর জন্য যে কোনো কিছু স্ক্রিনে দেখার সময় সেটা থামিয়ে শিশুর সঙ্গে ঐ বিষয় নিয়ে কিছুক্ষণ পর পরই কথা বলা ভালো। সেটা দ্বিমুখী যোগাযোগ নিশ্চিত করে। ৫-৮ বছরের শিশুর যদি অনলাইনে ক্লাস করতে হয়, তখন খেয়াল রাখতে হবে যেন একটানা সর্বোচ্চ ৪০ মিনিটের বেশি সে স্ক্রিনের সামনে না থাকে। প্রয়োজনে ১০-১৫ মিনিট বিরতির পর আবার ৪০ মিনিট থাকতে পারবে। সারাদিনে এই সময়সীমা ২ ঘণ্টার মধ্যে থাকা ভালো। যে কোনো শিশুর জন্য প্রথম থেকে ডিভাইস ব্যবহার একটি নিয়মের মধ্যে রাখতে হবে। শিশু বড়দের দেখেই শিখবে, তাই বড়দেরও ডিভাইস ব্যবহারে সময়সীমা মেনে চলা উচিত।
প্রযুক্তি ছাড়া আমরা সকলেই অচল। সারাদিনের সব কাজে আমরা প্রযুক্তির কাছে দায়বদ্ধ। আমাদের দৈনন্দিন কাজের সবকিছুর সঙ্গেই এর সম্পর্ক অতি নিবিড়। বড়দের পাশাপাশি ছোটরাও এই প্রযুক্তির কাছে বন্দি। অবশ্য, অনেক ক্ষেত্রেই শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নানাভাবে তাকে সাহায্য করে। ছোট বাচ্চারা একা একা অক্ষর চিনতে পারে ট্যাবের সাহায্যে। খেলার ছলে বাসায় বসে নিজের পড়া শেষ করতে পারে। ক্লাসের পড়া থেকে শুরু করে নানা ধরনের অনুশীলনী এবং হোমওয়ার্ক/প্রজেক্টের কাজের তথ্য জোগাড় করতে পারে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে। সাধারণ জ্ঞানের ক্ষেত্রেও ইন্টারনেট ও প্রযুক্তি শিশুকে সাহায্য করে। বাইরের দেশগুলোয় কী হচ্ছে তা সে জানতে পারে। তাকে সামাজিক হয়ে উঠতে সাহায্য করে এই প্রযুক্তি। বলা যায় বাবা-মার অনুপস্থিতিতে প্রযুক্তিই তাদের কাছে আশীর্বাদ। কিন্তু অতিমাত্রায় মোবাইল ও ডিভাইস আসক্তি শিশুর ভবিষ্যৎ মেধা বিকাশে যে বড় অন্তরায় তা স্পষ্ট। তাই ভার্চুয়াল জগতের ব্যবহারিক কৌশলগুলোকে শিশুবান্ধব করে সমস্ত ডিজিটাল ডিভাইসগুলোকে তাদের জন্য শিক্ষামুখী নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর এবং আনন্দময় প্ল্যাটফর্ম হিসাবে পরিচালনা করা উচিত।

লেখক : অধ্যাপক এবং তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

প্যানেল/মো.

×