ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২

শিক্ষকতার চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ 

খুরশীদুজ্জামান আহমেদ 

প্রকাশিত: ১৮:৪৯, ৭ অক্টোবর ২০২৫

শিক্ষকতার চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ 

প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে শিক্ষকদের অবদানকে সম্মান জানাতে ও তাদের অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। ২০২৫ সালের এই দিবসে মূল প্রতিপাদ্য ছিল- Recasting teaching as a collaborative profession অর্থাৎ ‘শিক্ষকতা পেশা : মিলিত প্রচেষ্টার দীপ্তি’। প্রতিপাদ্যটি বাংলাদেশের চলমান শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও মূল ধারণা 
এ বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল সুর হলো— শিক্ষকদের বিচ্ছিন্নতা থেকে বের করে এনে একটি সহযোগী ও সম্মিলিত পেশাগত পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করা। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও শিক্ষকরা প্রায়শই এককভাবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন। তাদের পেশাগত উন্নয়ন, মানসিক সুস্থতা কিংবা পাঠদান পদ্ধতির আধুনিকায়নে সহকর্মী, পরামর্শদাতা বা স্কুল নেতাদের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল শিক্ষার মানের ওপর প্রভাব ফেলে না, শিক্ষকদের পেশায় ধরে রাখার ক্ষেত্রেও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। ২০২৫ সালের এই দিবসের লক্ষ্য ছিল শিক্ষাদানকে এমন একটি পেশা হিসেবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা, যেখানে পারস্পরিক সমর্থন, জ্ঞানের আদান-প্রদান এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধকে উৎসাহিত করা হয়। এর মাধ্যমে যেন শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং তা যেন সরাসরি শিখন প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এই প্রত্যাশা।
বাংলাদেশের জন্য ২০২৫ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্যটি বিশেষভাবে অর্থবহ। দেশের শিক্ষাক্রমের সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষকদের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর। এই ব্যবস্থায় শিক্ষকরা শুধু জ্ঞানদাতা নন, বরং সহায়ক বা ফ্যাসিলেটর। এখানে দলগত কাজ, প্রজেক্টভিত্তিক শিখন এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত, যা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে শিক্ষকদের মধ্যে নিবিড় বোঝাপড়া ও সহযোগিতা অপরিহার্য। দেশের শিক্ষাক্রমের অধীনে একজন শিক্ষককে বিজ্ঞান, গণিত, শিল্প ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকরা যদি একটি ‘চর্চার সম্প্রদায়’ বা ‘Community of Practice’ গড়ে তোলেন, তবে তারা একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারবেন, রিসোর্স শেয়ার করতে পারবেন এবং সম্মিলিতভাবে সমস্যা সমাধান করতে পারবেন। এই সহযোগী মনোভাবই নতুন শিক্ষাক্রমের মূল শক্তি। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৫.৮ লাখ শিক্ষক রয়েছেন। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের জন্য এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (PEDP4) আওতায় প্রায় ৪.৫ লাখ প্রাথমিক শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, মাধ্যমিক স্তরেও ধাপে ধাপে সকল শিক্ষককে প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। এই প্রশিক্ষণগুলোর উদ্দেশ্য কেবল জ্ঞান বিতরণ নয়, বরং শিক্ষকদের মধ্যে সহযোগিতামূলক মানসিকতা তৈরি করা, যা নতুন শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য।

চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ

বাংলাদেশে শিক্ষকদের সহযোগী পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলার পথে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—
১. কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতা : অনেক স্কুলে শিক্ষকদের মধ্যে সহযোগিতার কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো নেই। যার যার বিষয় নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৬৭% শিক্ষক সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত পেশাদারী আলোচনা করার সুযোগ পান না। ২. সময়ের অভাব : পাঠদান এবং প্রশাসনিক কাজের চাপে শিক্ষকরা একে অপরের সঙ্গে পেশাগত আলোচনার জন্য পর্যাপ্ত সময় পান না। 
৩. মেন্টরশিপের অভাব : নতুন শিক্ষকরা অভিজ্ঞ শিক্ষকদের কাছ থেকে শেখার বা পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ খুব কমই পান। বাংলাদেশে শিক্ষকদের পেশা ছেড়ে যাওয়ার হার (Teacher attrition rate) ৫.৫%। এর অন্যতম কারণ হলো প্রয়োজনীয় সমর্থন ও পরামর্শের অভাব। একটি কার্যকর মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম এই হার কমাতে সাহায্য করতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যেমন—
প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ : স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের জন্য সাপ্তাহিক বা মাসিক সমন্বয় সভার আয়োজন করতে পারে, যেখানে পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি এবং চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু : অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মেন্টর হিসেবে নিযুক্ত করে নতুন শিক্ষকদের সহায়তার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রযুক্তির ব্যবহার : অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে নেটওয়ার্ক তৈরি করে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারেন। সরকারি সহায়তা : শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে সহযোগিতামূলক কার্যক্রমকে আরও গুরুত্ব দেওয়া এবং উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষকদের জন্য জ্ঞান বিনিময়ের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে। বর্তমানে শিক্ষকদের জন্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও, সেগুলোর ফলো- আপ এবং শিক্ষকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ খুবই সীমিত। এই দিকটিতে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এই বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসটি প্রথমবারের মতো প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হয়নি। এর পরিবর্তে, এটি ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় আফ্রিকান ইউনিয়নের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা প্যান-আফ্রিকান কনফারেন্স অন টিচার এডুকেশন (PACTED)-এর অংশ। এই স্থান নির্বাচনটি আফ্রিকার মহাদেশীয় শিক্ষা কৌশল (CESA) এবং আফ্রিকান এডুকেশন ডিসেম্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা শিক্ষাকে টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি নতুন বৈশ্বিক এবং মহাদেশীয় প্রতিশ্রুতিকে তুলে ধরেছে। এখানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল অনুষ্ঠানেও ‘বিচ্ছিন্নতা থেকে সম্মিলিত শক্তিতে: সহযোগিতার দৃষ্টিতে শিক্ষকতা পেশার পুনর্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈশ্বিক আলোচনা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
পরিশেষে, শিক্ষকদের শুধু সম্মান জানালেই চলবে না, তাদের পেশাগত কাজের জন্য একটি সহায়ক ও সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা যেমন সকলের দায়িত্ব তেমনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। শিক্ষকরা যেন তাদের পেশায় আস্থা ও ভরসা পান। ২০২৫ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশকে শিক্ষকদের বিচ্ছিন্নতা দূর করে তাদের সম্মিলিত শক্তিতে রূপান্তরিত করার দিকে মনোনিবেশ করা উচিত। কারণ একদল সহযোগী ও অনুপ্রাণিত শিক্ষকই পারেন দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার জন্য। 
লেখক : প্রধান শিক্ষক, কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক 
পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়

প্যানেল/ম

×