ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ২৪ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১

আলো-আঁধারের পথ বেয়ে

ড. মো. আবদুর রহিম

প্রকাশিত: ২১:১২, ২২ জুন ২০২৪

আলো-আঁধারের পথ বেয়ে

আলো-আঁধারের পথে শেখ হাসিনা

এ বছর বাংলাদেশের প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ‘প্লাটিনাম জয়ন্তী’ উদ্যাপন করছে। এ দীর্ঘ যাত্রাপথে রাজনৈতিক দলটিকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সইতে হয়েছে। পঁচাত্তর বছরের রাজনৈতিক দলটির সাফল্যের যেমন দীর্ঘ খতিয়ান রয়েছে, তেমনি অনেক হারানোর বেদনা এবং ব্যর্থতার গ্লানিও রয়েছে। দল গঠনের বিষয়ে কারাবন্দি শেখ মুজিবের কাছে মতামত নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন- ‘আর মুসলিম লীগের পেছনে ঘুরে লাভ নেই’।

তিনি নিজে ছাত্র সংগঠন ছেড়ে ‘রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান’ করার পক্ষে তাঁর মত জানিয়ে দেন। প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত শেখ মুজিব অনেক আগেই পূর্ববাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনের মূল কেন্দ্রে চলে গিয়েছিলেন- তা পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা রিপোর্টেই প্রতিভাত হয়। তরুণ শেখ মুজিব রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কর্মনিষ্ঠার ছাপ রেখেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ব্রিটিশ পর্বেই। এবার বাঙালির মুক্তির নতুন মিশন শুরু করলেন প্রকৃত বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

আসলে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের দৌরাত্ম্যে পাকিস্তানে রাজনৈতিক দলগুলো অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। জেনারেল আইয়ুব খানের শাসনামলে ভারত ভ্রমণকালে এক পাকিস্তানি সাংবাদিক বলেছিলেন- ‘পাকিস্তানে দুটি মাত্র রাজনৈতিক দল আছে, একটি সেনাবাহিনী অন্যটি আমলাতন্ত্র’। কাজেই কার্যকর একটি রাজনৈতিক দলের অপেক্ষায় ছিলেন সাধারণ মানুষের মধ্যে- যে দলটি তাদের কথা বলবে। জনআকাক্সক্ষা পূরণের জন্য জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গঠিত হয় আওয়ামী লীগ।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিছক একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি আদর্শের নাম। আওয়ামী লীগের জন্মের সঙ্গে আপোসহীন রাজনৈতিক চেতনা এবং নতুন একটি রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম হলো- সেই দর্শন হলো নিপীড়িত-নির্যাতিত এবং বঞ্চিত সাধারণ মানুষের সার্বিক মুক্তির দর্শন। যার ভিত্তি ছিল এই বাংলার সামাজিক মূল্যবোধের মূলমন্ত্র- অসাম্প্রদায়িকতা এবং মানবতাবাদ। তৎকালীন সময়ের তথাকথিত রাজনৈতিক ‘এলিটিজমের’ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক ধারা পরিহার করে দলটি রাজনীতিকে গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করে।

আওয়ামী লীগের আগে এ অঞ্চলে কোনো রাজনৈতিক দল সাধারণ মানুষের ভাবনাকে এত সুন্দরভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপান্তর করতে পারেনি। সাধারণ মানুষের ভাবনা আর আকাক্সক্ষাকে সঙ্গী করেই আওয়ামী লীগ দীর্ঘ পঁচাত্তর বছর ধরে সাম্য, মুক্তি, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়েছে- তবে সে পথে ফুল বিছানো ছিল না। দীর্ঘ এ যাত্রাপথে অতিক্রম করতে হয়েছে অনেক চড়াই-উতরাই। দলটিকে নিজেদের দলের ভেতরে ও বাইরে যুগপৎভাবে সংগ্রাম করতে হয়েছে।

মুসলিমদের পৃথক আবাসভূমি গঠনের ধারণা থেকে যে পাকিস্তানের জন্ম, সে দেশের অধিবাসীদের মন থেকে সম্প্রদায়গত ভাবনা সহজেই মুছে যায়নি। এমন কী পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ক্যারিশম্যাটিক লিডার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসেই মুসলিম লীগকে ‘ন্যাশনাল লীগ’ নামকরণ করে দলটিকে সকল ধর্ম-সম্প্রদায়ের জন্য উন্মুক্ত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি (ডন ২৭ নভেম্বর ১৯৪৭)।

স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকে স্বাধীন দেশে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের নৃশংসতা, ৩ নভেম্বরের জেলহত্যা, একুশে আগস্টের ভয়াবহতা, শেখ হাসিনাকে উনিশবার হত্যাচেষ্টা, ওয়ান ইলেভেনের মতো কালো দিবস আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সৃষ্টি হয়েছিল। জেনারেল জিয়ার শাসনামলে আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। রাজনীতিবিদদের জন্য (মূলত আওয়ামী লীগ নেতাদের জন্য) রাজনীতি কঠিন হয়ে যায়।

এরশাদের শাসনামলে অত্যাচার নির্যাতন জেল-জুলুম সমান্তরালভাবে চলেছে দলটির নেতাকর্মীদের ওপর। ২০০১ সালের পর যে ভয়াবহতা নেমে এসেছিল দলটির শীর্ষ নেতা থেকে তৃণমূল কর্মীর ওপর, তা নজিরবিহীন। তখন আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মী প্রাণ দিয়েছেন। 
পঁচাত্তর বছরের প্রাচীন এ দলটি বর্তমানে অদ্ভুত এক সংকটকাল অতিক্রম করছে। আপাতদৃষ্টে ক্ষমতাসীন দলটির কোনো সংকট নেই মনে হলেও দলটির মূল সংকট ‘নব্য আওয়ামী লীগার’ ‘অরিজিনাল আওয়ামী লীগার’ দ্বন্দ্ব। আওয়ামী লীগের অনেকে এখন সংসদে বিরোধী দলের আসনে। বিরতিহীনভাবে চারবার ক্ষমতায় থাকায় দুর্নীতিবাজ সুযোগসন্ধানী অনেকেই আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করে এবং তাদের পারফরমেন্স দ্বারা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেয়। এরাও নিজেদের ‘ত্যাগী’ নেতা মনে করে।

এরা ‘নিজেদের আদর্শ’ আর ‘লজ্জা-সরম’ ত্যাগ করে আওয়ামী লীগে এসেছে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য। এদের দৌরাত্মে আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের প্রকৃত কর্মীরা লজ্জিত ও বিব্রত। সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ী এবং আমলা নির্ভরতায় আওয়ামী লীগ অতীত ঐতিহ্য হারাতে বসেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। দলের কোনো কোনো নেতা সংসদে ও সংসদের বাইরে এসব বিষয়ে বক্তব্য রেখেছেন।বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দলকে ক্ষমতায় রাখার স্বার্থে দলের সভাপতি শেখ হাসিনাকে অনেক সময় ‘জেনে শুনে বিষ’ পান করতে হয়েছে।

তিনি গণভবনে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে এক বৈঠকে দুঃখ করে বলেছিলেন ‘আমি নীলকণ্ঠ। নীলকণ্ঠের মতো বিষ পান করেও তা হজম করতে পারি’। আগাছা যেমন একটি বড় গাছকে গ্রাস করে নেয়, অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় না রাখতে পারলে রাজনীতিতে সৎ ও ত্যাগী নেতার জন্ম হবে না। দল কখনো ক্ষমতার বাইরে গেলে নব্য আওয়ামী লীগারদের অপকর্মের কারণেই যাবে বলে অনেকের ধারণা। আর বিপদটা বোঝা যাবে দল কখনো ক্ষমতার বাইরে গেলে। 
সাংস্কৃতিক আন্দোলনই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকা-ের অনুপ্রেরণার উৎস। বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি রক্ষার আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ সৃষ্টির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে কূপম-ূকতা থেকে মুক্ত করে আলোর পথের যাত্রায় শামিল করতে পারেনি। এখনো জঙ্গিবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা হুমকি হিসেবে দেখা দেয়।

‘সুষ্ঠু ভোট’ হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে কী না সে প্রশ্ন এখনো ওঠে। এটি আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় এবং অমার্জনীয় ব্যর্থতা। এর কারণ, আওয়ামী লীগে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা আর গবেষণা সঠিকভাবে হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের সহযোগী সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত করা প্রয়োজন। এখনো পর্যন্ত এদেশে আওয়ামী লীগের বিকল্প কোনো রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠেনি।

কাজেই দলটির প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হলে বাংলাদেশবিরোধী শক্তি জয়ী হবে, সে কথা মনে রাখা প্রয়োজন। ২০৪৮ সালে দলটির শতবর্ষ পূর্ণ হবে। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করার রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এটি সম্ভব হলে আওয়ামী লীগের হাতেই জন্ম এবং আওয়ামী লীগেই পূর্ণতা পাবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা।  

 
লেখক : অধ্যাপক, প্রাধ্যক্ষ, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×