ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শিল্পকলা

ড. মো. মোরশেদুল আলম

প্রকাশিত: ২২:৫৫, ১ মার্চ ২০২৪

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শিল্পকলা

.

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের জানান দিচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইন্টারনেট অব থিংসের অগ্রগতির দ্বারা চালিত বিশ্ব অর্থনীতির চলমান রূপান্তরকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বলা হয়। মানুষের সবচেয়ে বেশি শক্তির স্থান চিন্তা কল্পনা করার সক্ষমতা, কায়িক শ্রম নয়। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তির সহায়তা পেয়ে মানুষের চিন্তা কল্পনার জায়গা অনেকটাই সরল সংকীর্ণ হয়েছে। এটা ঠিক যে, অনিবার্যভাবে এটি আমাদের ভবিষ্যৎ পাল্টে দেবে। যে কারণে এটি যুগপৎ বিস্ময় ভীতি তৈরি করছে।

অতীতে যন্ত্র মূলত মানুষের শ্রমকে প্রতিস্থাপন করত। ক্যালকুলেটর কম্পিউটারের মাধ্যমে গণনা করা যায় ঠিক, কিন্তু চিন্তা করে মানুষই। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শক্তি চিন্তা দুই জায়গায় মানুষকে সরাসরি প্রতিস্থাপন করবে। তবে এখন পর্যন্ত আসা প্রযুক্তি অনেক কাজকে অপ্রয়োজনীয় করে দিলেও নতুনভাবে আবার কর্মক্ষেত্র তৈরি করেছে। লন্ডনভিত্তিক ডিজিটাল আর্টিস্ট অ্যানা রিডলার বলেন, এআইয়ের অক্ষমতা কোন্ কোন্ জায়গায় রয়েছে। এআই কনসেপ্ট বা ধারণা ব্যবহার করতে পারে না। সময়, স্মৃতি, চিন্তা, আবেগÑ এসয়ের মিশ্রণ মানুষের অনন্য দক্ষতা যা এআইয়ের কাজ থেকে তাদের কাজকে আলাদা করে। নিছক দেখতে সুন্দর এমন কিছু নয়, মানুষের এসব বৈশিষ্ট্য সত্যিকারেরচিত্রশিল্পতৈরি করে। অ্যানা এবং আরেক ডিজিটাল আর্টিস্ট ম্যাট ড্রাইহার্স্ট মনে করেন, এআইয়েরশিল্পী প্রতিস্থাপন’-এর ধারণা মানুষের শৈল্পিক প্রক্রিয়াকে অবমাননা করে। মেশিন লার্নিংয়ের কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্র চারপাশের পরিবেশ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিখতে পারে।

এতে করে অনেক সময় যন্ত্রগুলো আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে। গুগলের সাবেক চেয়ারম্যান এরিক স্মিডের মুখেও সতর্কবাণী শোনা গিয়েছিল। তিনি বলেছেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাছ থেকে শিখতে পারে। তাহলে ভেবে দেখুন, যদি এটি ভুল কিছু শেখে কিংবা ভুল সুপারিশ করে- তবে যে কোনো কিছু ঘটতে পারে, এমনকি যুদ্ধও লেগে যেতে পারে।মাত্র ৩০ থেকে ৪০ বছর আগেও সায়েন্স ফিকশনের বাইরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে খুব একটা ভাবা হতো না। সে সময় যন্ত্রকে আরও বুদ্ধিমান করে তোলার চিন্তাভাবনা চলতে থাকলেও সাধারণ মানুষের নিকট এটি ছিল এক অবাস্তব কল্পনার মতো। অনেকেরই বিশ্বা ছিল না যে, এআইয়ের এত উন্নতি সম্ভব। ফেসবুক, ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের রিকমন্ডেশন সিস্টেম, বুদ্ধিমান রোবট কিংবা চ্যাটবট, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, অ্যামাজানের ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যালেক্সা বা আইফনের সিরি সবই এআইয়ের অংশ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অনিকেত মিত্র একটা এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তিদের নিয়েমহাভারতকল্পনা করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাদের অনেককেই তরুণ বয়সে দেখিনি, আমার পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব নয়। তাই এআইয়ের সাহায্য নিয়েছি। কিন্তু এখন অডিয়োতেও এআইয়ের ব্যবহার চলে এসেছে। যে শিল্পীরা নেই, তাদের গলায় নতুন গান শুনছি। কিশোর কুমারের গলায় নতুন গান তৈরি করেছে অনেক প্ল্যাটফর্ম। অনিকেত মিত্র বলেন, আমি যেমনমহাভারত’-এর জন্য সমালোচিত হয়েছিলাম, তেমনই প্রচুর মানুষ প্রশংসাও করেছিলেন। আমার মনে হয়েছিল, এটা একটা পাওয়ারফুর টুল। তাহলে কেন ব্যবহার করব না! প্রযুক্তিকে অস্বীকার করা সুযোগ নেই। প্রযুক্তিকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে।

চলচ্চিত্র নির্মাতাদেরও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সুবিধা করে দিচ্ছে। প্রসঙ্গে অনিকেত মিত্র বলেন, আসল বিষয় হলো বাজেট। যদি বাজেট ইকুইপমেন্ট থাকে, তাহলে হয়তো আমিও শূটই করতাম ওই দৃশ্যের। বিশাল ইউনিটকে এক জায়গায় জড়ো করে লোকেশনে নিয়ে গিয়ে কয়েকদিন শূটের যথেষ্ট খরচ আছে। বিকল্প হিসেবে এআইয়ের কথা ভেবেছি। আমার ছবিতে অ্যাকশন দৃশ্যের জন্য ইতোমধ্যেই প্রচুর টাকা খরচ হয়েছে। তাই আবার ফ্ল্যাশব্যাকের দৃশ্যের জন্য খরচ করা কঠিন ছিল। এটি ছবির ওপরেও নির্ভর করে। কী ধরনের ছবি নির্মাণ করছেন, তার বিষয়ের ওপর নির্ভর করে তাতে কৃত্রিম প্রযুক্তির ব্যবহার করবেন কিনা তা বোঝা যাবে। পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গির ওপরে এআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। তবে কাজ করে বুঝেছি, এআই খুবই উপযোগী।...তবে সুবিধা যেমন হচ্ছে কিছু মানুষের, আবার কিছু ক্ষেত্রে সমস্যাও হবে। এরপরে সুপার হিউম্যান ইউনিভার্স নির্মাণের ইচ্ছা পোষণ করেন তিনি।এআই কখনোই আবেগের বিকল্প হবে না। প্রসঙ্গে পরিচালক অভিরূপ বসু বলেন, ‘হলিউডের পরিচালক জো রুসো এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় এআই সৃষ্ট চলচ্চিত্র দর্শকরা দেখতে পাবেন। তবে এর সঙ্গে আমি বলবশিন্ডলারস লিস্টবাফ্লাওয়ার অব দ্য মুন’-এর মতো ছবি বানাতে পারবে না। কারণ, বিভিন্ন আবেগের অভিজ্ঞতা না থাকলে ধরনের ছবি নির্মাণ কখনো সম্ভব নয়। এআই হয়তোটাইগার থ্রিবাট্রান্সফর্মারসতৈরি করে দিতে পারবে। আগে যেমন কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজারি (সিজিআই) ছিল, এখন নিজেদের স্টুডিওর গ্রিন স্ক্রিনেও অনেকে শূট করেন। পরিবর্তন আসবে; তবে যে ধরনের কনটেন্টে হিউম্যান এক্সপেরিয়েন্স লাগে, সে ধরনের কনটেন্ট এআই পারবে না।

প্রোগ্রামড ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং কখনো আবেগ তেরি করতে পারবে না। এআই হয়তো গ্রাফিক্স, ডিএফএক্স অনেকটা এগিয়ে দেবে। এটি হয়তো সিনেমা বানানোকে কিছু মানুষের নিকট সহজ করে তুলবে। ডল- টু, মিডজার্নি, নাইটক্যাফে এআই, স্টেবল ডিফিউশন ইত্যাদি বিভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে সেকেন্ডের মধ্যেই চাহিদা অনুযায়ী, যে কোনো থিমের ছবি তৈরি করা সম্ভব। কেউ কেউ মনে করছেন, এতে মানুষের সৃজনশীলতা হুমকির মুখে পড়ছে। অনেকেই শঙ্কিত হলেও, আবার অনেকে এসব ইমেজ জেনারেটর নিয়ে সৃষ্ট নেতিবাচক ধারণাকে ভিত্তিহীন মনে করছেন। ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠিত রিসার্চ কোম্পানি ওপেনএআই ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে মেশিন লার্নিং মডেল ডল- প্রকাশ্যে আনে। এই মডেলকে আরও উন্নত করে এআই ইমেজ জেনারেটর ডল- টু-এর প্রকাশ করা হয় ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে। এরপর সে বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর এটিকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে ক্রয়ের পাশাপাশি বিনামূল্যে অনেক ছবি তৈরি করতে পারছেন। একই বছরের জুলাই আগস্টে মুক্তিপ্রাপ্ত যথাক্রমে মিডজার্নি স্টেবল ডিফিউশন, এই দুই ইমেজ জেনারেটরসহ ডল- টু হয়ে উঠেছে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী।

এআই ইমেজ টুলগুলোর ব্যবহার সুবিধাজনক হওয়ায় অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরাও আশ্চর্য করে দেওয়া ডিজিটাল ক্যানভাস তৈরি করতে পারেন। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা এই সুপারচার্জড সৃজনী সম্ভাবনাকে বেশ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছেন। কনসেপ্ট আর্টিস্ট এবং ইলাস্ট্রেটর গ্রেগ রুটকোস্কি সোনালি আলো মিশ্রিত কাল্পনিক দৃশ্য আঁকার জন্য বিখ্যাত।

এআই টুল দিয়ে ছবি আাঁকার জন্য সফটওয়্যারগুলোতে তার নাম বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। ফলে মিডজার্নি এবং স্টেবল ডিফিউশনের মতো সফটওয়্যারে তার কাজের অনুরূপ কাজ সৃষ্টি করা হচ্ছে তার অনুমতি ছাড়াই। গ্রেগ বলেন, ‘এসব সফটওয়্যার ঠিকঠাক এসেছে কেবল এক মাসের মতো হলো। এতেই এত কাজ চুরি হয়েছে, আর বছর হয়ে গেলে কী হবে! এআই আর্ট দিয়ে ভরা ইন্টারনেটের দুনিয়ায় আমি নিজের কাজগুলোই সম্ভবত আর খুঁজে পাব না। এটি খুব উদ্বেগের বিষয়।এআই টুলগুলোকে ঠিক কোন্ কোন্ ডেটা বা কোড দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়Ñ তা কেবল ডিফিউশন প্রকাশ করলেও ওপেনএআই প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানায়। হ্যাভ আই বিন ট্রেইনড নামক একটি টুল প্রতিষ্ঠা করেছে শিল্পীগোষ্ঠী স্পনিং। স্টেবল ডিফিউশনে প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত ৫০০ কোটির অধিক ছবির মাঝে নিজের ছবি আছে কিনা তা খুঁজতে স্পনিং শিল্পীদের সহযোগিতা করে। এছাড়াও ভবিষ্যতে এরূপ প্রশিক্ষণ সেটে নিজেদের ছবি থাকবে কি না তা বাছাই করতেও শিল্পীদের এটি সাহায্য করে। কিন্তু কনসেপ্ট আর্ট অ্যাসোসিয়েশন জোর দিয়ে বলে যে, ক্ষতি এর মধ্যেই হয়ে গেছে। কারণ, ইতোমধ্যে শিল্পীদের অনুমতি ছাড়াই তাদের কাজের ওপর ভিত্তি করে টুলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

কেবল চিত্রকর্ম নয়, স্টেবল ডিফিউশনের প্রশিক্ষণ ডেটাবেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি ব্যক্তিগত মেডিক্যাল ফটোগ্রাফি এবং পর্নোগ্রাফিকেও ব্যবহার করেছে। কনসেপ্ট আর্ট অ্যাসোসিয়েশন (সিএএ) এর বোর্ড সদস্য এবং ইলাস্ট্রেটর কার্লা ওর্টিজ স্টেবিলিটি এআইয়ের বাণিজ্যিক অংশ ড্রিমস্টুডিও নিয়ে বেশি আপত্তি জানান। তিনি বলেন, ‘এই কোম্পানিগুলো অনুমতি ছাড়াই সবার কপিরাইট থাকা এবং ব্যক্তিগত ডেটা ব্যবহার করছে। আবার বলছে, নিয়ে আমাদের কিছু করার নেই।যুক্তরাজ্যের আইন কপিরাইট করা সৃজনশীল কাজগুলো ব্যবহার করে এআই কোম্পানিগুলোতে আরও বেশি স্বাধীনতা দিতে পারে এবং তা পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা যাবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিএএ। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কপিরাইট আইন নিয়ে আলোচনার জন্য সিএএ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছে এবং এআইয়ের ক্ষেত্রের এমন অপব্যবহার কীভাবে ঠেকানো যায় সে বিষয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। কপিরাইট লঙ্ঘন ছাড়াও আরও একটি বড় সমস্যার কথা বলেন আরজে পামার। এআই টুলগুলো সমগ্র সৃজনশীল গোষ্ঠীকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। স্টক ছবির পরিবর্তে জায়গা করে নিচ্ছে এআই টুল দ্বারা নির্মিত ছবি। বিখ্যাত ছবি লাইব্রেরি শাটারস্টক সম্প্রতি তাদের ছবিতে ডল- এর ব্যবহার করতে ওপেনএআইয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। পামার মনে করেন, অ্যালবামের প্রচ্ছদ, বই বা প্রবন্ধের জন্য আঁকা ইলাস্ট্রেশনের মতো চিত্রকর্মগুলো এআই থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে পারে; যা বাণিজ্যিক চিত্রকর্মের একটি উদীয়মান ক্ষেত্রকে দুর্বল করে দেবে। তবে এআই ইমেজ জেনারেটরের মালিকরা বলছেন, টুলগুলো শিল্পকে গণতান্ত্রিক করে তুলে।

স্টেবিলিটি এআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা এমাদ মোস্তাক বলেন, বিশে^ অনেকটাই সৃজনশীলভাবে কোষ্ঠবদ্ধ। কিন্তু সবাই যদি এআইকে কাজে লাগিয়ে প্রাযুক্তিকভাবে নিপুণ ছবি সৃষ্টি করতে পারে, এটিও তো সৃজনশীলতার অংশ। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গণিতবিদ মার্কুস ডু সটি মনে করেন, ‘ডল- সহ অন্যান্য ইমেজ জেনারেটরগুলো সম্ভবত এক প্রকার সম্মিলিত সৃজনশীলতার কাছাকাছি আসতে পারে। কারণ, লাখ লাখ ডেটাসেটের ধরন অনুসরণ করে নতুন ছবি তৈরি করতেই এই টুলগুলোর অ্যালগরিদম বানানো। মার্কুসের মতে, অ্যানা রিডলারের কাজগুলোট্রান্সফর্মেশনালসৃজনশীলতার কাছাকাছি পর্যায়ে পড়ে; যাতে সম্পূর্ণ নতুন ধাঁচে কিছু সৃষ্টি করা হয়। তবে সৃজনশীলতার এমন বিধিবদ্ধ সংজ্ঞা প্রদানে অ্যানা আপত্তি তোলেন। তিনি আরও বলেন, ‘এর মাধ্যমে চিত্রশিল্পকে অনুভূতি বা ধারণা প্রকাশ এবং সত্যের সন্ধান নয়, বরং আকর্ষণীয় ওয়ালপেপার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তামিল গীতিকার সংলাপ লেখক মাধান কার্কি বলেছেন, কোনো গল্প বা দৃশ্য লিখতে গেলেও আমি এআইকে সহকারী লেখক হিসেবে ব্যবহার করি। অ্যানিমেশন লিরিক ভিডিয়ো তৈরির ক্ষেত্রেও কাইবার বা জেন- এর মতো এআই টুলস খুব কাজে দেয়। এতে অনেক সময় বাাঁচে, খরচও কম হয়। তিনি এআই টুল ব্যবহার করেএন মেলেশীর্ষক এআই সৃষ্ট তামিল গানও তৈরি করেছেন। আধুনিক প্রজন্ম মিম তৈরি এবং শেয়ার করতে ভালোবাসে। মিম তৈরিতে এআই প্রধান সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন করছে। মাইক্রোব্লগিং সাইট টুইটারেউইয়ার্ড ডল- জেনারেশনসনামে একটি একাউন্ট রয়েছে, যেখানে মিমপ্রেমীরা মিম তৈরি শেয়ারের মাধ্যমে আনন্দে মেতে থাকেন।জেনারেটিভ এআইএর যুগে পা রাখতেই হইচই পড়ে গেছে প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। ইমেজ-জেনারেটর সফটওয়্যারগুলোর দক্ষতা শুধু ছবি তৈরির মাঝে সীমাবদ্ধ নেই, এখন ছবির পাশাপাশি চমৎকার সব ভিডিও তৈরি করা যাচ্ছে। যেমন : গুগলেরইমাজেন ভিডিওএবং ফেসবুকের প্যারেন্ট কোম্পানি মেটা তৈরি মেক--ভিডিও। নিত্যনতুন সৃজনশীলতা নিয়ে রীতিমত অবাক করেই চলেছে এআই সফটওয়্যারগুলো।

২০১৬ সালে গুগলের ডিপ মাইন্ড কম্পিউটারের আলফাগো প্রোগ্রাম আরও একটি জটিল বোর্ডগেমÑ গো এক সেরা খেলোয়াড়কে হারিয়ে দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কনসেপ্ট আর্টিস্ট এবং ইলাস্ট্রেটর আর. জে. পামার ডল- এর মাধ্যমে তৈরি সূক্ষ্ম গঠনশৈলীর ফটোরিয়েলিজম দেখে তিনি বেশ অস্বস্তির মুখে পড়েন। পামার বলেন, ভবিষ্যতে এটি কেবল আমার শিল্পের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা নয়, আমার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলোÑ মোটাদাগে সৃজনশীল মানুষের শিল্পগুলো নিয়ে। এআই প্রযুক্তিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিশাল ডেটাবেজকে একত্র করা হয়। এরপর এক প্রাযুক্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এআই ডেটাবেজের তথ্যের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলে, কিন্তু অবিকল নয় এমন নতুন কন্টেন্ট বা আধেয় তৈরি করে।

চলচ্চিত্রকে মনে হতে পারে অঙ্কের সূত্রের মতো এগোচ্ছে এবং পরিণতিও দর্শকের নিকট অনুমানযোগ্য হতে পারে। তবে মানব চলচ্চিত্র নির্মাতাদের লেখা পরিচালনার মতো সৃজনশীল কাজগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা জরুরি। জার্মান চিত্রশিল্পী লেয়ন ল্যোভেনট্রাউটের একটি উক্তি দিয়ে প্রবন্ধটি শেষ করতে চাই। তিনি বলেন, ‘শিল্পকলার জগতে দুটি উপাদানের মধ্যে মেলবন্ধনের সুযোগও আমার কাছে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। একদিকে শিল্পকলা, অন্যদিকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে শিল্পকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাওয়া সত্যি অভিনব। সেইসঙ্গে শিল্পের মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন পথে পাড়ি দেওয়া, শিল্পকলাকে আরও উদ্ভাবনী করা যাচ্ছে।

লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

×