ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১

আলফা ইন্স্যুরেন্স বঙ্গবন্ধু ও সে সময়ের রাজনীতি

ড. মো. আবু তাহের

প্রকাশিত: ২০:৫৮, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

আলফা ইন্স্যুরেন্স বঙ্গবন্ধু ও সে সময়ের রাজনীতি

১ মার্চ যথাযোগ্য মর্যাদায় দেশব্যাপী ৪র্থ বারের মতো জাতীয় বিমা দিবস

গত শতাব্দীর ’৬০-এর দশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার স্বার্থে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে বেছে নিয়েছিলেন। মূলত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বিমা শিল্পকে হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছেন সমগ্র দেশবাসীকে সংঘবদ্ধ করতে। এক কথায় বিমা শিল্পের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর চাকরি ও তৎকালীন আন্দোলন- সংগ্রামের মেলবন্ধন রয়েছে

১ মার্চ যথাযোগ্য মর্যাদায় দেশব্যাপী ৪র্থ বারের মতো জাতীয় বিমা দিবস পালন করা হচ্ছে। উক্ত দিবস উপলক্ষে ১ মার্চ সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মতি দিয়েছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬০ সালে ১ মার্চ তৎকালীন আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে এ অঞ্চলের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। তারিখটিকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকার ১ মার্চকে জাতীয় বিমা দিবস ঘোষণা করে। ২০২০ সাল থেকে ১ মার্চ জাতীয় বিমা দিবস পালন করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, জীবন বীমা কর্পোরেশন (তৎকালীন আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি) ৭, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, ঢাকার অফিসে বসেই বঙ্গবন্ধু প্রণয়ন করেছিলেন বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা। বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে বিমা শিল্পের সম্পৃক্ততায় জাতির পিতার অমর স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর বিদবসটি পালন করা হয়।

জীবন বীমা কর্পোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ে অফিস প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত টেবিল, চেয়ার, টেলিফোন, গ্লাস ইত্যাদি এখনো যথাযথভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে জীবন বিমা কর্পোরেশন এবং বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআর এ) সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ৮০, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় বঙ্গবন্ধু টাওয়ার নির্মাণ হলে সেসব সেখানে স্থানান্তর করা হবে।
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট জন্ম দেয় ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির সাত মাসের মাথায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু কারাবরণ করেন। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন, পাকিস্তানের এই অদ্ভুত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে আর যাই হোক বাঙালির স্বার্থ রক্ষা হবে না। প্রয়োজন বাঙালির অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য স্বাধীন রাষ্ট্রের। শুরু করেন ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রাম।

সর্বোপরি ৬ দফার ভিত্তিতে বাঙালি জাতিকে সংগঠিত করে স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর করে তোলেন। তিনি শুধু স্বপ্ন দেখেননি, মানুষকে সম্পৃক্ত করে সে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে গেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই একমাত্র জাতীয়তাবাদী নেতা, যিনি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রজ্বলন ঘটিয়ে অন্ধকারের শক্তি সাম্প্রদায়িকতাকে পরাস্ত করে সকলের ঐক্যবদ্ধতায় স্বাধীন ও স্বার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।

রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম ঠেকাতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা ১৯৫৮ সালের ৮ অক্টোবর মার্শাল ‘ল’ জারি এবং জেনারেল আইয়ুব খানকে উক্ত মার্শাল ‘ল’ অ্যাডমিনিস্টেটর নিয়োগ করেন। মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে ইস্কান্দার মির্জার গদি উল্টে দিয়ে আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট পদ দখল করেন এবং নিজেকে চিফ মার্শাল ‘ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ঘোষণা করেন। ১৯৫৯ সালের ৭ আগস্ট ঊষবপঃরাব ইড়ফরবং উরংয়ঁধষরভরপধঃরড়হ ঙৎফবৎ (ঊইউঙ) জারি করে বন্ধ করে দেন আওয়ামী লীগের রাজনীতি।

এমনকি Public Office Disqualification Order (PODO) জারি করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজনৈতিক নেতাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করেন। ১৯৫৯ সালে ১৭ ডিসেম্বর শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগার  থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার শর্তে উল্লেখ করা হয়, তিনি  ঢাকার বাইরে গেলে স্থানীয় পুলিশকে অবহিত করতে হবে। মূলত পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা বঙ্গবন্ধুকে সবসময় অনুসরণ করত। যার দালিলিক প্রমাণ ইতোমধ্যে ‘Secret Documents of Intelligence Branch on Father of Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman’ শীর্ষক বিভিন্ন খ-ে প্রকাশিত হয়েছে।

এমতাবস্থায় জেনারেল আইয়ুব খান ঘোষিত মার্শাল ’ল এড়িয়ে বঙ্গবন্ধু কিভাবে রাজনীতির কর্মকা- জারি রাখা যায় সে পথ খুঁজতে থাকেন। এমন সময় হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর বন্ধু পাকিস্তানের আলফা ইন্স্যুরেন্স মালিক আবদুল্লাহ ইউসুফ হারুন এগিয়ে এলেন। বঙ্গবন্ধুকে ১ মার্চ ১৯৬০ আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে ‘কন্ট্রোল অব এজেন্সি’ (আঞ্চলিক প্রধান) নিয়োগ দিলেন।

এরপর আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিলেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম. এ. আজিজ (আজিজ মিঞা), নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ময়মনসিংহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। শুরু হয় ইন্স্যরেন্স কোম্পানির কার্যক্রমের আড়ালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকা- অর্থাৎ এক কথায় ‘রথ দেখা, কলা বেচা’।

আলফা ইন্স্যুরেন্সে শেখ মুজিবুর রহমানের আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে যোগদান এবং ইন্স্যুরেন্স ব্যবসার আড়ালে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে জনগণকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করে তোলেন, যা তৎকালীন রাজনীতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। অনেকে মনে করেন, আলফা ইন্স্যুরেন্সে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ সৃষ্টির পিছনে এক অনবদ্য ভূমিকা রেখেছে। 
উক্ত সময়কালে পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে উল্লখ করা হয়- ‘১৯৬১ সালের ২৭ নভেম্বর সকাল ৮টায় করাচী থেকে আসা এস. এ. এম. হাসান, ম্যানেজার, আলফা ইন্স্যুরেন্স এবং শেখ মুজিবুর রহমান প্লেনে করে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বিমানবন্দরে পৌঁছালে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের চট্টগ্রামের সেক্রেটারি এম. এ. আজিজ (আজিজ মিঞা) নিজ মালিকানাধীন ইবিসি ৩১৮৯ নম্বর গাড়ি নিয়ে হাজির হন বিমানবন্দরে।

সেখান থেকে রেস্ট হাউস। তারপর অন্ততঃপক্ষে এক ডজন মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ, পরিদর্শন করেন আন্দরকিল্লা আলফা ইন্স্যুরেন্সের প্রধান অফিস এবং খাতুনগঞ্জের রামজয় লেনের নতুন এজেন্সি। পরদিন ২৮ নভেম্বর সকাল সাড়ে ছয়টায় কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন আজিজ মিঞার গাড়িতে করে। উঠলেন মোস্তাক আহমদ চৌধুরীর হোটেল কক্স-এ। সেখানেও এক ডজনেরও বেশি মানুষের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ। ফিরে এসে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক জহুর আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে কথাবার্তা হয়।’
পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ আওয়ামী লীগ ও আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কার্মকা- পর্যবেক্ষণপূর্বক কেন্দ্রের কাছে এক রিপোর্ট পাঠায়। উক্ত রিপোর্টের সারমর্ম এখানে উল্লেখ করা হলোÑ ‘শেখ মুজিবুর রহমান আলফা ইন্স্যুরেন্সে কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন। একইসঙ্গে অনেকের সঙ্গে ঘন ঘন মিটিং করছেন, ওয়ার্ড পর্যায়ে সফর করছেন। কিন্তু কথাবার্তায় ইন্স্যুরেন্স, ভিতরে ভিতরে আওয়ামী লীগকে উজ্জীবিত করা হচ্ছে, সেটা তারা বোঝেন ও বিশ্বাস করেন। কিন্তু তাদের হাতে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকায়  ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।’
উক্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর পাকিস্তান সরকার আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির আঞ্চলিক প্রধান শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে। তবে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি জেলে থাকাকালীন সময় শেখ মুজিবকে বেতনসহ ছুটি অনুমোদন দিয়েছে। আওয়ামী লীগের এ দুর্দিনে পশ্চিম পাকিস্তানের আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মালিক মুসলিম লীগের নেতা হয়েও বঙ্গবন্ধুকে বিশেষভাবে সম্মান দেখিয়েছেন। বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে কিছুটা হলেও যা সহায়তা করেছেন। 
উল্লেখ্য, গত শতাব্দীর ’৬০-এর দশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক কর্মকা- অব্যাহত রাখার স্বার্থে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে বেছে নিয়েছিলেন। মূলত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বিমা শিল্পকে হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছেন সমগ্র দেশবাসীকে সংঘবদ্ধ করতে। এক কথায় বিমা শিল্পের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর চাকরি ও তৎকালীন আন্দোলন- সংগ্রামের মেলবন্ধন রয়েছে।

একটি কল্যাণকর রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিমা অন্যতম অনুুষঙ্গ। তাই স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স  (জাতীয়করণ) আদেশ, ১৯৭২ জারি করে ৪৯টি দেশী-বিদেশী বীমা কোম্পানিকে জাতীয়করণের মাধ্যমে সুরমা, রূপসা, তিস্তা ও কর্ণফুলী নামক ৪টি বীমা কর্পোরেশন গঠন করেছিল। একই সঙ্গে চারটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে ‘জাতীয় বীমা কর্পোরেশন’ গঠন করে।

পরবর্তীতে বীমা শিল্পের উন্নয়নে ‘ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন আইন, ১৯৭৩’ প্রণয়ন করে। ৪টি কর্পোরেশন ভেঙ্গে ‘জীবন বীমা কর্পোরেশন’ এবং ‘সাধারণ বীমা কর্পোরেশন’ নামে দুটি পৃথক বীমা কর্পোরেশন গঠন করে, যা অদ্যাবধি বিভিন্ন ধরনের বীমা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। 

বীমা শিল্পের উন্নয়নে জাতির পিতার দেখানো পথ অনুসরণ করে বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে বীমার গুরুত্ব ও সুফল জনগণের নিকট পৌঁছানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে পুরনো বীমা আইন, ১৯৩৮কে রহিত করে ‘বীমা আইন-২০১০’ এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের আইন-২০১০’ প্রণয়ন পূর্বক তৎকালীন বিমা অধিদপ্তর বিলুপ্ত করে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) গঠন করা হয়েছে।

জাতীয় ‘বিমানীতি-২০১৪’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন ইস্যুতে বিমা খাতের বিকাশে সরকার অনেক যুগোপযোগী পদক্ষেপ (প্রবাসী কর্মী বিমা, শস্য বিমা ইত্যাদি) গ্রহণ করেছে, যার সুফল জনগণ ইতোমধ্যে ভোগ করছে।

লেখক : অধ্যাপক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

×