ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১

প্রত্নশস্য- ধান

-

প্রকাশিত: ২০:৪৭, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩

প্রত্নশস্য- ধান

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের সমাজ, সভ্যতা, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সংস্কৃতি যে প্রধানত কৃষিভিত্তিক, তা আমরা কম বেশি সবাই জানি। কৃষি অদ্যাবধি বাংলাদেশের অন্যতম জীবনীশক্তি। তবে সেটি কতটা প্রাচীন, সে সম্পর্কে আমাদের তেমন কোনো সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না, প্রামাণ্য তো নয়ই। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্ভবত প্রথম প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ-নবাবদের নয়, ইতিহাস সাধারণ মানুষেরও বটে। যে সম্পর্কে তেমন কোনো প্রামাণ্য গ্রন্থ ও গবেষণা পাওয়া যায় না বললেই চলে।

সম্প্রতি প্রয়াত স্বনামখ্যাত ঐতিহাসিক সুপ-িত রঞ্জিত গুহ প্রথম আলোকপাত করেন সাবঅল্টার্ন বা প্রান্তজনের ইতিহাস সম্পর্কে। সে অবস্থায় শুধু নগরসভ্যতা কিংবা রাজা-বাদশাহ নয়, উঠে আসে প্রান্তিক জীবনের ইতিহাসও। তবে তাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভাস, সে সবের চাষাবাদ ও আহরণ পদ্ধতি এবং ক্রমবিকাশ সম্পর্কে তেমন সুস্পষ্ট ধারণা ও প্রমাণ সংগ্রহ করা যায়নি এতদিন পর্যন্ত। 
২০১০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. সুফী মুস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে একদল গবেষক ও শিক্ষার্থীর উদ্যোগে ঢাকার অদূরে নরসিংদীতে উয়ারী-বটেশ্বরে উৎখনন করে প্রথম বাংলাদেশের মানুষের গর্তবসতির সন্ধান পান। সেই সঙ্গে আবিষ্কৃত হয় সেই সময়ের বেশকিছু মানব সভ্যতার নিদর্শন, যা ছিল প্রধানত কৃষিভিত্তিক। কিন্তু এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত তেমন পাওয়া যায় না। তখন গর্তবসতি ও প্রত্নউদ্ভিদ নিয়ে গবেষণার বিষয়টি সামনে আসে। আদিম শস্য গবেষণা যুগে প্রবেশ এবং আদি শস্য আবিষ্কার- বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দুটোই নতুন ঘটনা ও আবিষ্কার। সেই সূত্র ধরে ড. মুস্তাফিজের সুযোগ্য ছাত্র বর্তমানে শিক্ষক ও গবেষক মিজানুর রহমান প্রথম শুরু করেন আর্কিওবোটানি তথা প্রত্নশস্য নিয়ে উচ্চতর গবেষণা।

২০১২ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন এবং ২০১৪ সালে ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজিতে উচ্চতর গবেষণা করেন। সেখানে তার গাইড ছিলেন বিশ্বখ্যাত প্রত্নউদ্ভিদ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডোরিয়ান ফুলার। বিদেশের উন্নত গবেষণাগারে স্ক্যানিং, ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে মাটিতে বিলুপ্তপ্রায় প্রতিটি বীজের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে তিনি প্রমাণ করেন যে, উয়ারী-বটেশ্বরে প্রাপ্ত ধানের বীজের বয়স ২ হাজার ৪০০ বছর থেকে ২ হাজার ৩৫৫ (ক্যালিব্রেটেড) বছর। অধ্যাপক ড. ফুলারও মনে করেন, ধানটি বাংলাদেশের আদি শস্য। এর মাধ্যমে আমরা আরও জানতে পারি যে, কিভাবে কৃষির ইতিহাস বিবর্তিত হয়েছে এবং এর সুফল কি।
মূলত এই সূত্র ধরেই বর্তমানে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারও সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে কৃষি গবেষণা কার্যক্রম জোরদারসহ সৃজনশীল উদ্ভাবনের ওপর। এরই অংশ হিসেবে ব্রি-র বিজ্ঞানীরা ধানের পাঁচটি নতুন জাত বা প্রজাতির উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন; যেগুলোর একর প্রতি ফলন ক্ষমতা বেশি, চাল সরু, সুগন্ধি ও উন্নতমানের। রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি, উচ্চফলনশীল। ব্রি-র বিজ্ঞানীরা এও বলেছেন, নতুন প্রজাতির ধান যে অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগী সেই এলাকার জাত দেওয়া কৃষককে চাষাবাদের জন্য। ব্রি-র বিজ্ঞানীদের পাইপলাইনে রয়েছে আরও কয়েকটি নতুন প্রজাতির ধান, যা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক দেশের কৃষির উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য। আর এভাবেই বিবর্তিত হয়ে থাকে কৃষি সভ্যতার ইতিহাস। 

×