ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১

সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতা  ড. মো. আবু তাহের

প্রকাশিত: ২০:২৩, ২৬ মার্চ ২০২৩

সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতা  ড. মো. আবু তাহের

.

হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে আমরা বঙ্গবন্ধুর নেতেৃত্বে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। এটা সত্য, যে কোনো জাতিকে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে হয়। অপেক্ষা করতে হয় পরাধীনতার দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য একজন দূরদর্শী নেতার। বঙ্গবন্ধু ছিলেন জাতির ইতিহাস ধারাবাহিক সংগ্রামে এমন একজন নেতা যিনি আজীবন বাঙালি জাতিকে শুধু মুক্তির স্বপ্নই দেখাননি; মানুষকে সম্পৃক্ত করে সে রাষ্ট্রটির বাস্তবে রূপ দিয়ে গেছেন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে তেমন কেউ আর আসেনি। প্রসঙ্গে লন্ডন থেকে প্রকাশিত The Observer পত্রিকায় বিশিষ্ট সাংবাদিক Cyril Dunn  লিখেছেন In the thousand year history of Bengali, Sheikh Mujib is her only leader who has, in terms of blood, race, language, culture and birth been a full blooded Bengali. His physical stature was immense. His voice was redolent of thunder. His charisma worked magic on people. The courage and charm that flowed from him made him a unique superman in these times.

মূলত বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তিদাতা হিসেবে জন্মেছিলেন বলেই আমরা আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক। প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসভ্যতার সংকট প্রবন্ধের উপসংহারে ভবিষ্যৎ বাণী করে বলেছিলেনপরিত্রাণকর্তার জন্মদিন আসছে আমাদের দরিদ্র লাঞ্ছিত কুটিরের মধ্যে; অপেক্ষা করে থাকব, সভ্যতার দৈববাণী সে নিয়ে আসবে। মানুষকে চরম আশ^াসের বাণী শোনাবে এই পূর্ব দিগন্ত থেকেই। কবিগুরুর ভবিষ্যৎ বাণী সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছিল যখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বিশ্ব রাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনব্যাপী সাধনার ফল। পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই একমাত্র নেতা যিনি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রজ্বলন ঘটিয়ে অন্ধকারের শক্তি সাম্প্রদায়িকতাকে পরাস্ত করে সকলের ঐক্যবদ্ধতায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। এজন্য এই দেশ, এই জাতি আজীবন বঙ্গবন্ধুর কাছে ঋণী।

বস্তুত ব্রিটিশ শাসকরা অঞ্চলকে শাসন করার জন্য সাম্প্রদায়িকতাকে বিভিন্নরূপে ব্যবহার করা সত্ত্বেও উনিশ শতকের শেষার্ধে কংগ্রেস এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই মুসলিম লীগ প্রথমে মুসলমানদের ধারক-বাহক হয়ে উঠলেও পরে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান আন্দোলনের অগ্রদূত হয়ে ওঠে। দীর্ঘ ১৯০ বছর ব্রিটিশ শাসনামলের শেষের দিকে আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে পেলাম হিন্দু জাতীয়তাবাদ মুসলিম জাতীয়তাবাদ। রাজনীতির পরিণতিতে বাংলা ভাগ হয়েছে। মূলত দুই বঙ্গকে এক করার জন্য নয়; বরং পূর্ববঙ্গের বাঙালিকে পরিপূর্ণরূপে বাঙালি করার জন্য প্রয়োজন ছিল মুক্তিযুদ্ধের। ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি হওয়ার যে আকাক্সক্ষায়৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু হয় তা ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে উঠে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়। যেন মাতৃগর্ভে শিশুর বেড়ে ওঠা, জন্মালাভের উদ্দেশ্যে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, পাকিস্তানের ২৩ বছর শাসনামলে বাঙালিদের বিভিন্নভাবে নির্যাতিত চরম বৈষম্যের সম্মুখীন হতে হয়। অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে শোষণ-দমন-নিপীড়নের মাধ্যমে বাঙালিকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। ফলে বাঙালিদের মনে পাকিস্তানিদের অপশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঘনীভূত হতে থাকে। বাঙালির আন্দোলন সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বহুবার কারাবরণ অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি কখনো শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে আপোস করেননি। ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রামের একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে দফা ঘোষণা, ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান এবং মার্চ ১৯৭১ সালে রেসকোর্স ময়দানে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা নয়, দেশকে মার্চেই যেন স্বাধীন করে ফেলেন। প্রসঙ্গে ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের সাউথ এশিয়ান রিভিউ (ঝড়ঁঃয অংরধহ জবারব)ি জার্নালে উল্লেখ করা হয়- ‘বিচারকদের অনুসরণ করে পুলিশ সিভিল প্রশাসনের কর্মচারীরা যখন মুজিবের প্রতি সমর্থন জানায় তখনই বাংলাদেশের ভেতরে ক্ষমতা কার্যত হস্তান্তর হয়ে যায় এবং ইয়াহিয়ার সিদ্ধান্তের এক সপ্তাহের মধ্যে তা ঘটে। পরের তিন সপ্তাহে মুজিবের ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িটি কার্যত বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েটে পরিণত হয়।(When the police and servants joined judges in pledging support for Mujib, a defect transfer of power had taken place inside Bangladesh and it had happened with a week of Yahiya’s decision. During next three weeks, Mujibs house became in effect this secretariat of Bangladesh.) 

বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় কেবল ভারতের ইতিহাস ভৌগোলিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেননি; বরং তিনি নিজেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। দেখেছেন জন্মের পর থেকে দেশ ভাগ পর্যন্ত ব্রিটিশদের শোষণ; নেতৃত্ব দিয়েছেন ২৩ বছরের পাকিস্তানিদের শোষণ-শাসন নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং সর্বোপরি তাঁরই নেতৃত্বে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। 

স্বাধীনতার স্বপ্ন অনেকে দেখেছেন। কিন্তু সে স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও ছিলেন শঙ্কাহীন, অবিচল। তিনি বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন, সৃষ্টিতে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন। জাতির জন্য একটি স্বাধীন ভূখ- উপহার দিয়েছেন। বাংলায় যতদিন সূর্য উদয় হবে, যতদিন জনপদে পাখির কলরব থাকবে, নদীর কলতান থাকবে, সাগরের গর্জন থাকবে, বিশ^ মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে দেশ থাকবে, ততদিন বঙ্গবন্ধুও বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ের গভীরে। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ অনুসরণ করে তাঁরই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অর্থনৈতিক মুক্তি সংগ্রাম এখন দৃঢ় গতিতে এগিয়ে চলছে। দেশী-বিদেশী নানা ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টির পাঁয়তারা, শত বাধা-বিপত্তি, হত্যার হুমকিসহ নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের অপার বিস্ময়। কৃষি, শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান প্রযুক্তি, নতুন জ্ঞান গবেষণা, তথ্য গণমাধ্যম, সামাজিক নিরাপত্তা সর্বক্ষেত্রেই বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এজন্য প্রয়োজন সকলের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রতার সঙ্গে সম্পন্ন করে দেশকে এগিয়ে নেওয়া।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধু পরম্পরা। জাতির পরিচিতি নির্ধারণে বঙ্গবন্ধুর অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। প্রত্যাশা করছি, বাংলাদেশ অতিশীঘ্রই ক্ষুধা-দারিদ্র্য-নিরক্ষরতামুক্তসহ গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন, মানবিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, বায়ান্নর একুশ মহান মুক্তিযুদ্ধ চেতনায় আলোকিত এবং উদ্ভাসিত হবে। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দলমত-নির্বিশেষে সকলের সার্বিক সহযোগিতা, যা বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকলের কাছ থেকে প্রত্যাশা করছেন।

লেখক : অধ্যাপক সদস্য

বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন

×