ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

লন্ডনের চিঠি

ফুটবল ঈশ্বরের কাছে একটি প্রার্থনা

সাগর রহমান

প্রকাশিত: ২০:৫৭, ৩ ডিসেম্বর ২০২২

ফুটবল ঈশ্বরের কাছে একটি প্রার্থনা

সাগর রহমান

এর আগের বিশ্বকাপগুলোর অভিজ্ঞতায় মনে পড়ে। রাস্তার ধারের পাবগুলোতে সাধারণত ইংল্যান্ডের পতাকা টানানো দেখতে পেতাম। সেখানে যেহেতু বড় স্ক্রিনে খেলা দেখানোর ব্যবস্থা থাকে, পতাকা টানানো তাদের বিজ্ঞাপনেরও অংশ। এ বছর অনেক পাবে খেয়াল করে দেখলাম- পতাকা নেই। এমনিতেও ব্রিটেনের অনেক পাব হিউম্যান রাইটস ইস্যুতে প্রতিবাদ জানাতে ঘোষণা দিয়ে কাতার বিশ্বকাপ না দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ খেলছে। শুধু খেলছেই না, রীতিমতো কাপ জয়ের স্বপ্নও দেখছে।

কিন্তু জনসাধারণের মধ্যে সেই উদ্দীপনা কই? পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতা আগের মতোই আছে। ইংল্যান্ডের খেলার খবর থাকলে এবং সেটা বলার মতো কিছু হলে বড় জোর স্পোর্টস পাতার বাইরেও অন্য কোথাও হয়ত কোনো বিশেষ ফিচার আকারে ছাপা হয়। না হলে আর সব আগের মতোই আছে। অন্য দলের খেলার খবর যতটুকু জায়গা না দিলেই নয়, ততটুকুইÑ হয়ত ইঞ্চি কয়েক, কিংবা আধা কলাম। বেশিরভাগ দিন অন্য দলগুলোর কোনো খবরও থাকে না।

খেলাধুলা বিষয়ক পত্রিকাগুলো ছাড়া অন্যগুলোতে ‘বিশ্বকাপ স্পেশাল’ জাতীয় বিন্দুমাত্র আয়োজন নেই। এসব পত্রিকায় মেসি নেইমার রোনালদোদের নিয়ে স্পেশাল কোনো আয়োজন কিংবা ফিচার একেবারেই চোখে পড়েনি। আপনি যদি যথেষ্ট পরিমাণে উৎসাহী না হন, তবে দৈনন্দিনের পত্রিকাগুলো দেখে হয়ত বুঝতেই পারবেন না যে, কাতারে অত বড় ফুটবলের মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অথচ ইংল্যান্ড কিন্তু ফুটবল পাগল দেশ।

কোনো একসময় এখানকার কয়েকটি ফুটবল ক্লাবে স্টুয়ার্ড হিসেবে কাজ করেছি। খুব কাছ থেকে দেখেছি, এখানকার দর্শকরা কী পরিমাণ পাগলের মতো আচরণ করে নিজ দলের জয়-পরাজয়ে। রীতিমতো স্যুট-কোট পরা খান্দানি চেহারা ভদ্রলোকেরা যে পরিমাণ লম্ফ-জম্ফ করে, যে পরিমাণ চিৎকার চেঁচামেচি করে, তা অবিশ্বাস্য। ক্লাব ফুটবল নিয়ে এত হৈচৈ করা মানুষ বিশ্বকাপ নিয়ে এত নীরব কেন- কে বলবে!
শুধু ইংলিশদের কথাই বা বলি কেন। লন্ডনে ইংরেজ ছাড়াও নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বাস করে, যাদের মধ্যে অনেক দেশই ফুটবল বিশ্বকাপে খেলছে। সে বিবেচনাতেও কেন ওদের বাড়ি-ঘরে হলেও অন্তত নিজের দেশের পতাকা টানানোসহ কোনো রকম হৈচৈ চোখে পড়ছে না? কোনো কোনো রাস্তায় কদাচিৎ দুয়েকটা ঘরের জানালায় বাচ্চাদের আঁকা কিংবা বাজার থেকে কিনে আনা ছোট ছোট পতাকা সেঁটে রাখতে দেখা যায় বটে, তবে তা ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে যে বাংলাদেশের জ্বর দেখে দেখে বড় হওয়া আমরা, তাদের চোখে ‘ধুল-পরিমাণ’ মনে হতে বাধ্য। এ মুহূর্তে ফুটবল র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯২তম। অবস্থাদৃষ্টে ধারণা করা স্বাভাবিক যে, অন্তত এ শতাব্দীতে আমাদের বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণের ন্যূনতম সম্ভাবনা নেই।
আমার কর্মস্থলের একজন সহকর্মী ব্রাজিলিয়ান। নেইমার যে প্রথম ম্যাচের পরে পায়ে আঘাতজনিত কারণে আপাতত মাঠে নামতে পারছে না, সে তথ্যটি তার সঙ্গে শেয়ার করে বুঝলাম, কথাটা সে জানত না। বলল, তাই নাকি? আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন, তুমি জানো না। সে মাথা নাড়ল, না।

তারপর আমাকেই পাল্টা প্রশ্ন, তুমি জানলে কিভাবে? আমি ফোনে বাংলাদেশের পত্রিকা বের করে নেইমারের ছবি দেখালাম এবং বাংলা লেখাটার সারাংশ অনুবাদ করে খবরটির সোর্স তাকে জানালাম। খবরটাতে তাকে একেবারেই বিচলিত মনে হলো না। বসে বসে ফোনে কী যেন একটা গেম খেলছিল। তাই খেলতে লাগল সে। ফুটবলপাগল জাতি হিসেবে ব্রাজিলিয়ানদের পরিচিতি বিশ্বব্যাপী। মনে মনে ভাবলাম, এ নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম। কিন্তু না ঘাঁটিয়ে পারলাম না।

বললাম, তুমি কি জান, নিজেদের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে আর্জেন্টিনা হেরে গেছে বলে আমাদের দেশে একজন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন? আমার কথা শুনে এবারে সে নড়েচড়ে বসল। ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করে বলল, হোয়াট? আমি পুরো খবরটা তার কাছে খোলাসা করলাম। তারপর পত্রিকা ঘেঁটে ঘেঁটে ব্রাজিল আর্জেন্টিনাকে ঘিরে আমাদের দেশে এ মুহূর্তে যেসব কর্মকা- চলছে, তার কিছু ছবি দেখালাম।

কে কোন্ দেশের কত বড় পতাকা টাঙাবে - সেটা নিয়ে মারামারির খবর দিলাম, প্রিয় দলের জার্সি আর পতাকা হাতে আধ মাইল মোটর শোভাযাত্রার ভিডিও দেখালাম, পতাকা টানাতে গিয়ে একাধিক মৃত্যুর কথাটা বললাম, নিজের জায়গা জমি বৌয়ের গহনা বিক্রি করে প্রিয় দলের কয়েক কিলোমিটার লম্বা পতাকা টানানোর কথাটা বললাম, মাঝরাত পেরিয়ে যাওয়া ঢাকা শহরের নানান জায়গায় জড়ো হওয়া অসংখ্য জনতার জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখা এবং প্রিয় তারকাদের গোলের সঙ্গে উন্মাতাল উল্লাস করার ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করলাম।

বললাম, এ মুহূর্তে আমাদের দেশের সব পত্রিকা বলা যায় খেলাধুলার পত্রিকা হয়ে গেছে। তাদের লিড নিউজসহ মিনিটে মিনিটে যে সংবাদ আপডেট, তার বেশিরভাগই বিশ্বকাপ ফুটবল কেন্দ্রিক। শুধু বলেই ক্ষান্ত হলাম না। বাংলাদেশের প্রধান কয়েকটি পত্রিকা খুলে দেখিয়েও দিলাম।
এসব খবর এবং ছবি এবং ভিডিও দেখাতে দেখাতে আমি খুব মনোযোগ সহকারে ওর প্রতিক্রিয়া দেখতে লাগলাম। প্রথমত অবিশ্বাস, তারপর বিস্ময় এবং শেষ পর্যন্ত সেটা অদ্ভুত এক মায়ায় পাল্টে গেল। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, তোমরা ফুটবল খেল না? আমি তাকে বললাম, আমার শৈশবের একটি বিকেলও বাদ যায়নি ফুটবল ছাড়া। এখনকার বাচ্চারা নানা কারণে কিছুটা খেলাবিমুখ।

কিন্তু এ কথাটা মোটামুটি আমাদের দেশের প্রায় সব বাচ্চার জন্যই সত্য ছিল এই সেদিনও। সে জিজ্ঞেস করল, তাহলে তোমাদের দেশ বিশ্বকাপ খেলে না কেন? বাচ্চাদের মতো প্রশ্ন অবশ্যই, আমিও তাই বাচ্চাদের মতোই উত্তর দিলাম, কে বলল খেলে না, এই যে এতক্ষণ ছবি আর ভিডিও দেখালাম, সেগুলো কী? কাপটার নাম তো বিশ্বকাপ, তাই না! অংশগ্রহণ করতে হলে একমাত্র মাঠে নেমে অংশগ্রহণ করতে হবে, তা কে বলল? খেলে এবং দেখে- দুভাবেই তো অংশগ্রহণ করা যায়। তোমরা পা দিয়ে খেল, আমরা হৃদয় দিয়ে- এই যা পার্থক্য।
আমার উত্তর শুনে সে হাসতে হাসতে বলল, তা অবশ্যই। তা অবশ্যই। আমি অবশ্য হাসলাম না। ফাঁকিবাজি একটা উত্তর দিলাম, সেটা ও কতটা বুঝতে পারছে তা জানি না। তবে আমি নিজের কানেই নিজের ফাঁকিটা ধরতে পারছিলাম। মনটা হঠাৎ বিষণœ হয়ে গেল। ভেতরে ভেতরে একটা প্রার্থনা জেগে উঠল। ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে আমাদের এই যে এত উন্মাদনা, এত পাগলামো, বাফুফে যেহেতু কিছু করতে পারছে না, হে ফুটবল ঈশ্বর, আপনি কি কোথাও কলকাঠি নেড়ে আমাদের ১৭ কোটি মানুষের ভেতর থেকে বিশ্বকাপ খেলা উপযোগী বিশজোড়া ফুটবলার পা গজানোর বিষয়ে একটু সাহায্য করতে পারেন না!

লন্ডন, ১ ডিসেম্বর, ২০২২

লেখক : কথাসাহিত্যিক  
[email protected]

monarchmart
monarchmart