ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই হজ ও ওমরাহ

প্রকাশিত: ২০:৪৭, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই হজ ও ওমরাহ

ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি হলো পবিত্র হজ সম্পাদন করা। ধর্মীয় ও আর্থিকভাবে পূর্ণতা আসার সঙ্গে সঙ্গে একজন মুসলমান জীবনের এ মহা মূল্যবান ইবাদত ও সফর সম্পন্ন করার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। পবিত্র হজের কথা আসার সঙ্গে সঙ্গে এসে পড়ে পবিত্র ওমরাহ পালনের কথাও। হজের সঙ্গে ওমরাহ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একবার হজে গেলে এমনিতেই একাধিক ওমরাহ করতে হয়। ওমরাহ পালন হজকে পূর্ণতা ও বিশুদ্ধতা দেয়। আবার হজের পাশাপাশি পবিত্র খানায়ে কাবা জিয়ারতকেন্দ্রিক ওমরাহ একটি আলাদা ও কাক্সিক্ষত ইবাদতও বটে। এ জন্য অনেক মুসলমানকে দেখা যায় সুযোগ পেলে নিজের জীবনের ফরজ হজ আদায়ের পূর্বে ওমরাহ করার জন্য আমাদের দেশ থেকে পশ্চিম দিকে যাত্রা করেন। পবিত্র হজের হৃদয়কাড়া অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার পর পবিত্র হারামাইন শরীফাইনের মনোরম সৌন্দর্য উপভোগ করার পর একজন হাজীকে পরবর্তীতে বারবার, প্রায় বছর ওমরাহতে গমন করতে দেখা যায়। সুযোগ ও তৌফিক থাকলে এ ধরনের হজ ও ওমরাহ জীবনে বার বার পালনের উৎসাহও রয়েছে হাদিসে। মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.) বলেছেন, তোমরা বার বার হজ ও ওমরাহ কর, কেননা এ দুটি গরীবী এবং গোনাহ দূর করে যেমনটি যাতা বা কামারের হাপর লোহা, স্বর্ণ ও রুপার ময়লা দূর করে দেয়।’-(বুখারী,মুসলিম)। আমাদের নবীজি (সা.) নিজেই চারবার ওমরাহ করেছেন। (তিরমিযী)। উল্লেখ্য, ওমরাহ মানে পবিত্র ইহরামের কাপড় পরিহিত অবস্থায় আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ করা এবং তৎপরবর্তী ছাফা ও মারওয়ায় সাঈ করে মাথা মুণ্ডন করা। আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ১৯৬নং আয়াতে ইরশাদ করেন : ওয়া’আতিম্মুল হাজ্বা ওয়াল উমরাতা লিল্লাহ’ অর্থাৎ তোমরা একান্ত আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির নিয়তে হজ এবং ওমরাহ আদায় কর।’ যেহেতু হজ এবং ওমরাহ শব্দ দুটি আয়াতে পাশাপাশি বর্ণিত হয়েছে তাই ইমাম মালিক ও শাফেয়ী (র.) প্রমুখ বলেছেন হজের মতো ওমরাহও ফরজ ইবাদত। তবে আমাদের ইমাম আবু হানিফা (রা.) বলেছেন, ওমরাহ ফরজ নয়। কেননা হাদিস শরীফে ওমরাহ ওয়াজিব কি না- এ প্রশ্ন একবার মহানবীর (সা.) কাছে করা হয়েছিল বলে উদ্ধৃত আছে। তখন মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘না’। বরং তিনি বলেছেন, ‘ওয়া ইন তা’তামারু হুয়া আফজাল’- যদি তোমরা ওমরাহ কর তা হবে একটি উত্তম কাজ।’ এ থেকে বোঝা যায় ওমরাহ সুন্নাত বা নফল ইবাদত। তবে তা কোন মুসলমানের ওপর ফরজ হিসেবে বর্তায় তখন যখন সে ওমরাহ পালন শুরু করে দেয় এবং নিয়ত করে। অবশ্য ওমরাহর অশেষ গুরুত্ব ও ফজিলতের কথা এ অবস্থা থেকে অনুমান করা যায় যে, ওমরাহকে হজের সঙ্গে কেয়ামত পর্যন্ত মিলিয়ে রাখা হয়েছে। হজ করতে হলেই সেই সফরে আগে ওমরাহ করতে হয়। (টীকা-তিরমিযী শরীফ, দৈ.জীবনে ইসলাম)। আমাদের দেশে হজে যাওয়ার সময় হাজী সাহেবগণ যেমন নানা বিভ্রান্তি বিড়ম্বনার শিকার হন তেমনি ওমরাহ পালন করতে যাওয়ার সময়ও নানা আশঙ্কায় ভুগতে থাকেন। এর কিছু সঙ্গত কারণও আছে। কোন কোন এজেন্সির হাতে হজযাত্রী কিংবা ওমরাহকারী বিড়ম্বনার শিকার হলে তা সমাজে দ্রæত প্রচার পেয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভাল এজেন্সিগুলোর সুনামও। অবশ্য এক্ষেত্রে একেবারে কোন ধরনের কষ্ট ও ঝক্কি ঝামেলাসহ হজ ও ওমরাহ পালন করার সৎ সাহস নিয়ে অগ্রসর হন এমন ব্যক্তিরও খুবই অভাব। দরদাম করে যত কম পয়সা দিয়ে সম্ভব হজ ও ওমরাহ করতে বের হন কোন কোন ব্যক্তি। যার কারণে বড়সড় এ আন্তর্জাতিক সফরে স্বাভাবিক কষ্টগুলোও তারা মেনে নিতে চান না। সুযোগ পেলে চাপিয়ে দেন এজেন্সির ওপর। এক শ্রেণীর লোকের কাছে যাদের সার্ভিসে হজ ও ওমরাহ করেছেন তা একটু নিম্নমানের মনে হয়। আর যার সঙ্গে হজ ও ওমরাহ করেননি ধারণা করেন তার সার্ভিসই বুঝি ভাল। এ ধরনের খণ্ডিত চিন্তায়ও বিভ্রান্ত হজ এবং ওমরাহ ব্যবস্থাপনা। সে যাই হোক, আমার ধারণা ও অভিজ্ঞতা, হজ ও ওমরাহর সময় যাত্রার তারিখ ও টিকেট নিয়ে এজেন্সিকে অতিরিক্ত বিরক্ত করা উচিত নয়। কারণ এসব ক্ষেত্রে দেশী-বিদেশী অনেক জটিলতা অতিক্রম করতে হয়, যা আপনার জানা না থাকতে পারে। মনে রাখবেন একজন প্যাসেঞ্জার থেকে একজন সত্যিকারের দায়িত্বশীলের এক্ষেত্রে মাথাব্যথা অনেক অনেক বেশি। এজেন্সির সুবিধা ও সামর্থ্যমতো বাংলাদেশ বিমান অথবা অন্য কোন কোম্পানির বিমানে সরাসরি কিংবা কানেকটিং/ থার্ড ক্যারিয়ার, জেদ্দা কিংবা মদিনা হয়ে আপনাকে আসা-যাওয়া করতে হবে। এক্ষেত্রে অন্যদের কথা ধরে অহেতুক তর্কে জড়ানো উচিত হবে না। হজ ওমরাহ করার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় তুলনামূলক বেশি পরীক্ষা দেয়া ও প্রতিক‚লতার সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এটাই নবী-রাসূল ও আউলিয়া কেরামের জীবন থেকে শিক্ষা। ওমরাহর সফরের জন্য অনেকটা হজের মতো প্রয়োজনীয় ওষুধ, একটি গলার ব্যাগ, একটি হাত ব্যাগ নিন, অন্তত ১০০০ রিয়াল, ২ সেট পোশাক, ১টি কোমরের বেল্ট, ১টি চুল কাটার কাঁচি, রেজার, ১টি গামছা, লুঙ্গি, ২ সেট ইহরাম, শুকনো খাবার, ১টি সাবান, টুথপেস্টসহ যৎসামান্য জিনিস ব্যাগে নিন। টাকা পয়সা সব সময় বুকের ব্যাগ, জামার পকেট অথবা কোমরের বেল্টে রাখুন। চোর ও পকেটমার হতে সাবধান। আসা-যাওয়ার পথে বিমান বন্দরে এমনকি হোটেলে পছন্দের খাবারের অভাব থাকে। এ জন্য মুড়ি, বিস্কুট, চিড়া, গুড় জাতীয় শুকনা খাবার প্রয়োজন ও রুচিমতো সঙ্গে রাখুন। বেøড, নেইলকাটার, কাঁচি, রেজার, ব্যাটারি ইত্যাদি বিমানে চড়ার সময় কখনও হাত ব্যাগে নেবেন না। যদি ১৪/১৫ দিনের ট্যুর হয় তবে ৮/৯ দিন মক্কায় থাকুন বাকি দিনগুলো মদিনা শরীফে কাটানোর মনস্থ করুন। গলায় ঝুলিয়ে রাখার জন্য ও ব্যাগের জন্য দেশের ও বিদেশের ঠিকানা সংবলিত কার্ড তৈরি করুন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পূর্বে প্রয়োজন মতো নখ, চুল, কেটে খুব ভালভাবে গোসল করে নিন। মক্কা শরীফের আগে মদিনা গমন করলে ইহরামের বিশেষ পোশাক পরতে হবে না। যদি প্রথমে মক্কা শরীফ গমনের ব্যবস্থা নেয়া হয় তবে সৌদি আরব যাত্রার আগে দেশের শেষ বিমানবন্দর আর কানেকটিং ফ্লাইট হলে সংশ্লিষ্ট দেশের বিমানবন্দর থেকে অন্যান্যের দেখাদেখি পুরুষগণ ইহরাম পরুন। মহিলাদের ইহরামের বিশেষ কোন পোশাক নেই। বিমানবন্দরে আপনার মতো দেশ-বিদেশের অনেক ওমরাহকারীকে দেখবেন। তবে দেশী ভাই-বোনদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলুন। কোন বিমানবন্দরে কাফেলার পেছনে পড়ে থাকবেন না। সর্বদা আগেভাগে থাকুন। ওমরাহর নিয়ত করার প্রারম্ভিক কাজ বিশেষ পোশাক পরা বা ইহরাম বাঁধা। ইহরামের ফরজ দুটি (১) নিয়ত করা ও (২) তালবিয়াহ পাঠ করা। (আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)। লেখক : অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতিব [email protected]
×