ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

বিশ্বাসের গোলাপ বাগান

আতাতুর্ক কামাল পাশা

প্রকাশিত: ২২:৪০, ৩০ মে ২০২৪

বিশ্বাসের গোলাপ বাগান

বিশ্বাসের গোলাপ বাগান

শেখ নজরুলকে রোমান্টিক কবি এবং নাগরিক কবি অভিধায় তীর বিদ্ধ করলে খুব একটা ত্রুটিযুক্ত বিচার হয় না। সেই প্রথম দিককার মেঘ সম্পাদনা, পাঁজরের মানচিত্রে অনেক নদী, কষ্টের অনুবাদ, মলাট বন্দি চেতনার কফিন পড়লে সেখানে যে নাগরিক জীবনের যন্ত্রণা আর গ্রামের প্রকৃতি দেখা যায়, আজও তিনি সেই অভিধানে হেঁটে চলছেন।

তবে রবীন্দ্রনাথ তার লেখা শেষ কবিতাটিতে অস্ত্রপচারের আগে শেষ দুটো চরণ ‘অনায়ানে যে পেরেছে ছলনা সহিতে/সে পায় তোমার হাতের শান্তির অক্ষয় অধিকার।’ সংযোগ করতে বলেছিলেন, অনেকটা সেরকমই সাম্প্রতিক আরও দুই একজন বয়েসী কবিদের কবিতায় দেখতে পাচ্ছি এক প্রচ্ছন্ন মৃত্যুচিন্তা। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার, এই মৃত্যুচিন্তার আবহটি ভীষণ আশাবাদী (Optimistic)।

আর এই সুন্দরবোধনটি কবি পরের প্রজন্মের কবি বা রোমান্টিক পাঠক-পাঠিকাদের মাঝে গুঞ্জরিত হতে দেখতে চাইছেন। সে প্রত্যাশা নিয়েই বিদায়ের অন্তরালে চলে যেতে চাইছেন। শেষ কাব্যগ্রন্থটি (বইমেলা ২০২৪-এ প্রকাশিত) ‘যে গোলাপ সাক্ষ্য দেয়’ পড়লে তাঁর কাব্যের ধারাবাহিক পাঠকের কাছে বিষয়টি সহজতর হয়। 
শেখ নজরুল তাঁর সাম্প্রতিক কবিতাগুলোয় আগের নদী, আগের নগর, আগের মানুষই নিয়ে লিখছেন, তবে তা উচ্চারণ করছেন অত্যন্ত মোলায়েম করে, অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, ‘মানুষ খুব খারাপ/তাকে জড়ায় শুধু/পাপ আর পরিতাপ/মানুষ খুব খারাপ/মানুষ তিনটি বর্ণের/প্রাচীন অভিশাপ।’ (প্রাচীন অভিশাপ : পৃ-১৯)। 
‘প্রেমিক না হলে’ কবিতায় শেখ নজরুল প্রকৃতি প্রেমিকই থেকে গেছেন। ‘সাগর আনন্দে নীল/আমি তার গাঙচিল/সকালে যাই তার কাছে/বিকেলে সে ঘরে আসে . . . সাগর আমার অনুভব/আমি তার কলরব/গোধূলিতে দেখা হয়/রাতে সে একা হয়/বুকের ভেতর অবিরাম হাওয়া/ প্রেমিক না হলে যায় না পাওয়া।’ (প্রেমিক না হলে-পৃ : ৬৬)।

‘কাটাকাটি কখন যে শূন্য হবে/ জানি, কেউ হয় না আপন ভবে/নিজেই তো নেই নিজের ভাগে/ভাবলে ঠিকই মায়া-মায়া লাগে!’ এভাবে কবি পৃথিবীকে অর্থহীন মনে করা সত্ত্বেও এক মোহনীয় ভালোবাসার অবস্থানিক মায়ায় জড়িয়ে যান। এ মননটিই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে।

ইতোমধ্যে কবি শেখ নজরুলের কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৪০টিরও বেশি ছাড়িয়ে গেছে। কবি পথ চলতে চলতে আর বেশি আলোকিত হন। আর বেশি সহজ, সত্য এবং ঋজু হয়েছেন। এ কারণে এ কাব্য সংহিতায় তিনি আগের কবিতাগুলোর তুলনায়, আর বেশি স্বল্পবাক, আর সরাসরি কাব্য করে গেছেন, বক্তব্য রেখে গেছেন। ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি/হতে পার তুমি অন্য কার/তুমি হয়তো জানবে না/কোনো এক বসন্তে/একটা কোকিল/শুধু তোমার জন্য/গান গেয়েছিল।’ (কোনো এক জোছনার রাত-পৃ : ৩০)। 
দীর্ঘ ১৪৮ পৃষ্ঠার বইয়ের কবিতাগুলো পড়লে মনে হয় কবি শেখ নজরুল নতুন করে জন্ম নিচ্ছেন, নতুনভাবে কবিতা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করছেন, নতুনভাবে কবিতাকে বিশ্বাস করতে চাইছেন। আর তার এ বিশ্বাসগুলোরই সাক্ষ্য দেবে একটি গোলাপ।

×