ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক

শাহীনুর রেজা

প্রকাশিত: ২২:২২, ২৩ মে ২০২৪

আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক

কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬খ্রি:)-এর সঙ্গে ২৫ এপ্রিল ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ ১২ বৈশাখ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ শুক্রবার বাদ জুমা কলকাতা ৬নং হাজী লেনে আশালতা সেনগুপ্তের শুভ পরিণয় সম্পন্ন হয়। এই বিয়ের প্রেক্ষাপট নিয়ে সাক্ষী খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন তাঁর ‘যুগ¯্রষ্টা নজরুল’ গ্রন্থে লিখেছেন-
‘বিয়ের আগে কথা উঠেছিল, কোন মতে বিয়ে হবে? হিন্দু মতে হতে পারে না। এক হতে পারে সিভিল ম্যারেজ। আর হতে পারে মুসলমানী মতে। সিভিল-ম্যারেজ আইন অনুযায়ী বর-কনে উভয়কে এক স্বীকৃতি এই বলে দিতে হয়ে যেÑ ‘আমি কোনো ধর্ম মানি না’। কবি এতে প্রবল আপত্তি জানালেন। বললেন, আমি মুসলমান মুসলমানী রক্ত আমার শিরায় শিরায় ধমনীতে ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে, এ আমি অস্বীকার করতে পারবো না’।...যাক! অনেক আলাপ-আলোচনায় স্থির হয়েছিল, মুসলমানি মতেই বিয়ে হবে।
 গিয়ে বললাম, ‘কনে কে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করতে বলা হোক।’ কবি এতে রাজি হলেন না। বললেন, কারুর কোন ধর্মমত সম্বন্ধে আমার কোন জোর নেই। ইচ্ছে করে তিনি মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করলে,পরেও করতে পারবেন।’
ইতিহাসের বহু নজির তিনি উপস্থিত করলেন। কবির মত মেনে নিয়ে আমাদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হলো-‘আহলে কেতাব’ দিগের সঙ্গে স্ব-স্ব ধর্ম বজায় রেখে বিয়ে হওয়া মুসলমানী আইন মতে অসিদ্ধ নয়। এখন কথা হচ্ছে এই যে, ‘হিন্দুগণ আহলে- কেতাব’ কিনা। এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গম্বর পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন বলে মুসলমানেরা বিশ্বাস করেন। এই সকল পয়গম্বর যুগে যুগে বিভিন্ন দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। ভারতবর্ষেও পয়গম্বরের আবির্ভার অসম্ভব নয়। অতএব এ-বিয়ে হওয়া সম্ভবত আইন মতে অন্যায় হবে না।’  বিয়ের পরে নজরুল তাঁর স্ত্রীর নাম রাখেন প্রমীলা নজরুল।
নজরুল প্রমীলার বিয়ের খবর সংবাদপত্র মারফত প্রচারিত হওয়ার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ব্রাহ্মসমাজের একটা অংশ খুশি হতে পারেনি। ব্রাহ্মদের এই নজরুল বিরোধিতার ইন্ধন জুগিয়েছিলেন এককালের পরম ব্রাহ্মবিরোধী নজরুল সুহৃদ মোহিতলাল মজুমদার। ‘ছোলতান’ ও ‘ইসলাম দর্শন’ পত্রিকা কড়া ভাষায় নজরুলের বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ আনে।
বিভিন্ন দিকে থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রমীলাকে ধর্মান্তরিত না করে বিবাহ নিয়ে নজরুলের যে অভিমত তা তাঁর অসাস্প্রদায়িক চেতনার বহির্প্রকাশ। এমনকি পরবর্তীতে তাঁর সন্তানদের নাম রেখেছিলেন দুই ধর্মের মিলিত ঐতিহ্যকে ধারণ করে। প্রথম সন্তানের নাম রেখেছিলেন- কৃষ্ণ মুহাম্মদ। পার্যায়ক্রমে অন্য তিন সন্তানের নাম ছিল অরিন্দম খালেদ বুলবুল, কাজী সব্যসাচী সানী ও কাজী অনিরুদ্ধ নিনি। আর ধর্মদ্রোহিতা! তিনি তাঁর রচনায় বলেছেন- ‘মানুষ এনেছে ধর্ম, ধর্ম আনেনি মানুষ কোনো।’
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘বিদ্রোহী’ পাঠ করলে আমরা এর পঙ্ক্তিতে-পঙ্ক্তিতে অসম্প্রদায়িকতার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। ১৪৬ পঙ্ক্তির এই দীর্ঘ কবিতায় বিভিন্ন ধর্মের ৭১টি পৌরাণিক শব্দের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে-
হিন্দু পুরাণ-৫৮টি
মুসলিম পুরাণ-৯টি
খ্রিস্ট পুরাণ-২টি
বৌদ্ধ পুরাণ-১টি
গ্রিক পুরাণ-১টি
শব্দগুলি-হিমাদ্রি, রুদ্র, নটরাজ, ভীম, ধূর্জটি,পুরোহিত, সন্ন্যাসী, ব্যোমকেশ, ইস্রাফিল, শিঙ্গা, দুর্বাসা, দেবশিশু, বোররাক, বাসুকি, বিষ্ণু, শ্যাম, অর্ফিয়াস, জটাজাল ইত্যাদি।
৬ জানুয়ারি ১৯২২Ñএ যেদিন বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ, শ্রেষ্ঠতম কবিতা ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হয় সেদিন যুবক নজরুলের বয়স ছিলো মাত্র ২২ বছর ৭ মাস ১১দিন। অথচ কবি খ্যাতির শীর্ষে- ভাবা যায়! বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস-ঐতিহ্যগত শব্দ ব্যবহার করে, সম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প উড়িয়ে দিয়ে অসাম্প্রদায়িকতার ঝা-া হিমালয়ের চূড়ায় পত্পত্ করে উড়েছে কেবল একবারÑ তা ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মাধ্যমে।
নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের দোহাই দিয়ে অন্য ধর্মের অনুসারীদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো আজ এক ধরনের অলিখিত প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নজরুল এদের নাম দিয়েছেন ধর্ম মাতাল। এরা সত্যের আলো পান করে নাই, শাস্ত্রের এলকোহল পান করেছে। এদের থেকে মুক্ত হতে আজীবন যিনি সংগ্রাম করেছেন তিনি হলেন মানবতার কবি, অসাম্প্রদায়িক কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
তিনি যে কতটা অসাম্প্রদায়িক  ছিলেন তা তাঁর ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধ পাঠ করলে আমাদের উপলদ্ধি হয়। তিনি লিখেছেনÑ ‘নদীর পাশ দিয়ে চলতে চলতে দেখি, একটা লোক ডুবে মরছে, মনের চিরন্তন মানুষটি তখন এ-প্রশ্ন করবার অবসর দেয় না যে, লোকটা হিন্দু না মুসলমান, বা মুসলমান যদি দেখে লোকটা হিন্দুÑ তার জন্য ত তার আত্মপ্রসাদ একটুকু ক্ষুণœ হয় না। তার মনে বলে, আমি একজন মানুষকে বাঁচিয়েছি- আমারই মত একজন মানুষকে।’
‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধেও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির নজির মেলে ‘মারো শালা যবনদের! মারো শালা কাফেরদের! আবার হিন্দু মুসলমানি কান্ড বাঁধিয়া গিয়াছে। প্রথমে কথা-কাটাকাটি, তারপর মাথা-ফাটাফাটি আরম্ভ হইয়া গেল আল্লার এবং মা কালীর ‘প্রেস্টিজ’ রক্ষার জন্য যাহারা এতক্ষণ মাতাল হইয়া চিৎকার করিতেছিল তাহারাই যখন মার খাইয়া পড়িয়া যাইতে লাগিল, দেখিলামÑ তখন আর তাহারা আল্লা মিয়া বা কালী  ঠাকুরানীর নাম লইতেছে না।

হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি পড়িয়া থাকিয়া এক ভাষার আর্তনাদ করিতেছেÑ বাবা গো, মা গো! মাতৃ-পরিত্যক্ত দুটি বিভিন্ন ধর্মের শিশু যেমন করিয়া এক স্বরে কাঁদিয়া  তাহাদের মাকে ডাকে!
দেখিলাম, হত-আহতদের ক্রন্দনে মসজিদ টলিল না, মন্দিরের পাষাণ দেবতা সারা দিল না। শুধু নির্বোধ মানুষের রক্তে আহদের বেদী চিরকলঙ্কিত হইয়া রইল।’
বাংলা সাহিত্যে ধর্মবৈষম্য, শ্রেণিবৈষ্যম্য, বর্ণবৈষম্য, জাতিবৈষম্যের আহ্বান নজরুলের রচনাতে বরাবর সোচ্চার। তিনি তার লেখনীতে যে সাম্যের ইঙ্গিত দিয়েছেন তা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবতাবাদ ও  সুবিচার-সুশাসনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সমস্ত ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে জাত-পাতের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানুষকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন-
সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই,
মানুষের মাঝে হে মানুষ তুমি
সত্যের দিও ঠাঁই।
কে কোন গোত্রের, কে কোন জাতের বা কার ধর্ম বড়, কার জাত ছোটÑ আজ এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে অস্থিরতা তা নিয়ে নজরুল আগেই বলেছেনÑ
সকল জাতই সৃষ্টি যে তার
    এ বিশ্ব-মায়ের বিশ্বঘর,
মায়ের ছেলে সবাই সমান
         তাঁর কাছে নেই আত্মপর।
এক ¯্রষ্টার একজন মানুষ অন্য আরেকজন মানুষকে ছুঁলে তার জাত যাবে, এমন ঘৃণার কথা নজরুল মানতে পারেননি। 
এমন চিন্তাধারার বজ্জাতদের তিনি বলেছেন-
জাতের নামে বজ্জাতি সব
জাত-জালিয়াৎ খেলছে ভুয়া,
ছুঁলেই তোর জাত যাবে
জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া।
গোটা বিশ্বব্যাপী নারীর সম-অধিকার নিয়ে আজ আন্দোলন হচ্ছে। অথচ দেড় হাজার বছর আগে মুহাম্মদ (সা.)-এর উপর প্রেরিত পবিত্র কোরআনে নারী অধিকার সমধিক গুরুত্ব পেয়েছে। তারই ধারায় আরেক মহা-মানুষ নজরুল শতবর্ষ আগে বলেছেন-
বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি ও
চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার দানিয়াছে নারী
অর্ধেক তার নর।
বাংলা সাহিত্য কোন ধর্মের মানুষের? হিন্দুদের? মুসলমানদের? এ প্রসঙ্গে নজরুল অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁর কাছে লিখিত পত্রে বলেন- ‘বাঙলা সাহিত্য হিন্দু-মুসলমানের উভয়ের সাহিত্য। এতে হিন্দু দেব-দেবীর নাম দেখলে মুসলমানের রাগ  করা যেমন অন্যায়, হিন্দুরাও তেমনি মুসলমানের  দৈনন্দিন জীবন যাপনের মধ্যে প্রচলিত মুসলমানী শব্দ তাদের লিখিত সাহিত্য দেখে ভুরু কোচকানো অন্যায়।

আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী।’ তিনি বলেন- ‘আমি হিন্দু-মুসলমান এর গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করে ঐক্য গড়ার চেষ্টা করেছি। কবির অসাস্প্রদায়িক চেতনা আরও স্পষ্ট হয়, যখন লেখেনÑ ‘আমি এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলে আমি কেবল এই দেশের এই সমাজের নই, আমি  সকল মানুষের।’
জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে ছিলেন ছিলেন তিনি। তাইতো তিনি গেয়েছেন-
গাহি সম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই
নহে কিছু মহিয়ান।
নজরুল উপলদ্ধি করেছিনে সর্বজনীন ভাবধারায় ধর্ম চর্চা করতে হবে। ধর্মের মধ্যে যে অসাম্প্রদায়িকতা থাকতে পারে, পরমসহিষ্ণুতা থাকতে পারে তা তার রচনার স্থান পেয়েছে। একদিকে তিনি যেমন ইসলামি ইতিহাস-ঐতিহ্য-চরিত্রগত শব্দ ব্যবহার করেছেন, অন্যদিকে হিন্দুয়ানি ইতিহাস-চরিত্রগত শব্দ ব্যবহার করে কবিতা-গান লিখেছেন। হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি বলিষ্ঠ করার জন্য তিনি লিখেছেন-

মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম
                  হিন্দুÑমুসলমান,
মুসলিম তার নয়নমনি
                  হিন্দু তাহার প্রাণ।

মানুষ ¯্রষ্টার সান্নিধ্য খুঁজতে মসজিদে যায়, মন্দিরে যায়, কাবায় যায়, তীর্থে যায়, কিন্তু হৃদয়ের কাছে যায় না। লালনের আরশি নগরে যায় না। অসস্প্রাদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ নজরুলের কণ্ঠে ‘মানুষ’ কবিতায় ধ্বনিত হয়-
মিথ্যা শুনিনি ভাই
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন
মন্দির কাবা নাই।
আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে নজরুল সকল ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। তা নয়, তিনি বিদ্রোহ করেছেন ধর্ম-ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। যারা শোষণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করেছেন। ভ- মোল্লা-মৌলভি, পুরোহিত-পাদ্রির বিরুদ্ধে তিনি সর্বদা সোচ্চার ছিলেন।
আজ গোটা বিশ্ব সাম্প্রদায়িকতা,  জাঙ্গিবাদ, ধর্মীয়, কুসংষ্কারে ছেয়ে গেছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের অসম্প্রদায়িক নজরুলের চর্চা বাড়াতে হবে। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনাই আমাদের কাছে অব্যাহতভাবে প্রাসঙ্গিক।

×