ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

সমেস মণ্ডলের সমস্যা

মনজুর হাবীব

প্রকাশিত: ০০:৪৯, ২৯ মার্চ ২০২৪

সমেস মণ্ডলের সমস্যা

সমেস মণ্ডল

বোচন সাহার দোকানে লুঙ্গি কিনতে গিয়েছিল সমেস মণ্ডল। বেশ বিনয়ের সঙ্গেই বলেছিল ১নং একটা হাতি মার্কা লালপিন লুঙ্গি দেখাতে। 
একটু উল্টে-পাল্টে দেখার পর সামনের মাসে দামটা পরিশোধ করবে বলায় একনম্বর দূরে থাক, দুই বা তিন, কোনো নম্বরের লুঙ্গিই দেওয়া হয়নি তাকে। উল্টো বাকির কথায় মহাখাপ্পা হয়ে উঠেছিলেন বোচন সাহা। 
লুঙ্গিটা সরিয়ে নিতে নিতে মুখ বাঁকা করে বলেছিলেন ‘টাকা নাই, আবার ১নং হাতি মার্কা মারাইছিস্? যা, ভাগ।’
এতদিনের পরিচয়! অথচ আড়াই টাকা দামের লুঙ্গিটা হাত থেকে কেড়ে নিলো কেমন রাগ দেখিয়ে! তারপর সোজাসুজি বলে দিলেন, কোনো লুঙ্গিই বেচবেন না তার কাছে! গজরাতে গজরাতে লালপিন লুঙ্গিটা আবার তুলেও রাখলেন দোকানের তাকের ওপর! 
এটা কি কম অপমান!
অপমানের এই কথাটা খুব মনে আছে। মনে রেখেছে সমেস ম-ল ভালো করেই। 
দেবেন প্রামাণিকেরও একই কেস। 
শনিবারের হাটে এক পোয়া কেরোসিন আর এক ছটাক সরষের তেলের জন্য গিয়েছিল তার মনোহারি দোকানে।
গলায় সুতলিবাঁধা ছোট-বড় বোতল দুটো হাতে নিয়েই প্রামাণিকের বেটা শুধালেন তাকে, ‘পয়সা আন্ছিস তো?’ 
তখন লুঙ্গির কোচর হাতিয়ে পয়সা না খুঁজে না পেয়ে কেবল বলেছিল, ‘আস্তার মধ্যে বুঝি পড়ি গেইছে বাবু! সামনের হাটোৎ দেমো আলা।’
এ কথা শুনেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন মুদিদোকানি দেবেন প্রামাণিক। তিনিও মুখ বাঁকিয়ে বলেছিলেন, ‘ইদিক ম্যালা মারি খাইছিস্। আর হওয়ার নয়। এ্যাখন ভাগ্ এ্যাটে থাকি।’
বলা চলে একরকম কুকুর তাড়ানোর মতো করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল তাকে দোকান থেকে। 
এটাও মনে ভীষণ দাগ কেটে আছে সমেস ম-লের।
খড়িয়াবাঁধা হাটের উত্তর-পূর্ব কোনের তামাকপাতা, বিড়ি-দড়ি, তাবিজ-কবজ মায় কবিরাজি ওষুধ থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের বেনেতি সদাইর দোকান মনি সেনের। এখানেও তার ওঠাবসা মেলা দিনের। দোকানের সামনে দাঁড়ালে হুকার তামাক আর বিড়ির সুগন্ধেই একরকম নেশা হয়ে যায় তার। সুযোগ পেলেই সে এখানে আসে। 
দোকানের সামনে ঝাড়ু দেওয়া, ইঁদারা থেকে বালতি ভরে পানি এনে দেওয়া, কতদিন এমন কত ধরনের কাজই না করে দিয়েছে সে মনি সেনের। 
সেই মনি সেনও কিনা সেদিন ভরা হাটের মধ্যে তাকে বলে বসলেন, ‘এ্যাকনা সরি খাড়া হ’তো বাহে। কিছুই কিনিস্ না। পত্তি-পত্তি খালি ভিড় করিস। দেখিস না কত গাহাক্?’
এতেও বিরাট সম্মানের হানি হয়েছে তার। এটাও খুব করে মনে রেখেছে তাই সমেস ম-ল।
আসলে মনে আছে কথাটা ঠিক নয়। অপমানের এতসব কথা এখন নতুন করে উঁকি দিতে শুরু করেছে তার মনে। 
ক’দিন থেকেই মান-সম্মান বোধটা একটু একটু করে বাড়তে শুরু করেছে তার। কিছুক্ষণ পরপরই তা চাগাড় দিয়ে উঠছে তার মনে। 
ইন্ডিয়ার দালাল শেখ সাহেবের কথায় নৌকায় ভোট দিয়ে বাবুরা মনে করেছিল দেশটা বুঝি ওদের বাপের! হিন্দুদের সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের মুসলমান শালারাও যে কি বুঝে হেরিকেন আর দাঁড়িপাল্লা মার্কা ছেড়ে একচেটিয়া সবাই ভোট দিল নৌকায়? 
ভোট দিল সবাই, আর ভাব বাড়লো মালাউনগুলার! এই নৌকার পাওয়ারেই বহুৎ খারাপ ব্যবহার করেছে তার সঙ্গে এতদিন এরা। 
আর বেকায়দায় পড়ে সহ্যও করতে হয়েছে তাকে এসব অপমান। দুটো পয়সার জন্য এতোদিন মালাউনের বাচ্চাদের বাবু-বাবু বলে সম্মানও দেখিয়েছে সে মেলা। 
তবে আর নয়। এবার ক্ষমতার পালা বদল হতে শুরু হয়েছে। 
চেয়ারম্যান কালামজিদ সাহেব শান্তি কমিটির বিরাট এক দায়িত্ব দিয়ে ফেলেছেন তাকে। 
এই সমেস ম-ল আর সেই সমেস ম-ল নাই। এখন সে ইসলাম আর দেশের শান্তি রক্ষার বিরাট সৈনিক। 
এবার সবাইকে দেখিয়ে দিতে হবে- নতুন দিনের নতুন মানুষ সমেস ম-ল এখন সরকারি ক্ষমতার অংশীদার।
কালামজিদ চেয়ারম্যান তাকে সঙ্গে নিয়ে মাদ্রাসা আর চিনিরকলে বসানো পাকফৌজের ক্যাম্পে যাওয়ার পর  থেকেই বেশ সম্মানী মানুষ বনে গেছে সমেস ম-ল। সাচ্চা পাকিস্তানি হিসেবে তাগড়া মেজর সাহেবের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তার। ঘাড়ে হাত দিয়ে মেজর সাহেব তাকে ডেকেছেন ‘সমেস সাহাব’ বলে! 
সেদিনের পর থেকেই আর মাটিতে পা পড়ছে না যেন সমেশ ম-লের। 
ক্ষমতার সূচনাটাও তার সেদিন থেকেই। 
শান্তি কমিটির সদস্যের ডান্টিকার্ডটা হাতে পাওয়ার পর তো আর কথাই নাই। শরীরে যেন দুনো বল ভর করেছে সেদিন থেকে। গায়ের পোশাক, চলাফেরা আর ব্যবহারে ব্যাপক পরিবর্তন এখন তার। 
ডান্টিকার্ডটা যেদিন হাতে এলো, সেদিন প্রায় সারারাত না ঘুমিয়ে পরদিনের কর্মপরিকল্পনা স্থির করে ফেললো সমেস ম-ল।
প্রথম কাজ হিন্দু বাবুদের আর মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া পরিবারগুলোর বাড়িঘর লুটপাট করা। তারপর বাড়ি আর দোকানগুলো দখলে নেওয়া। লুঙ্গি, তেল বাকি না দিয়ে আর দোকানের সামনে থেকে খেদিয়ে দিয়ে করা অপমানের প্রতিশোধ নিতে এটা তার ন্যায্য অধিকার! অতএব পরদিন সকালেই অ্যাকশন শুরু সমেস ম-লের।
দোকান-বাড়ি ফেলে যমুনা পাড়ি দিয়ে মানকারচর হয়ে ইন্ডিয়ায় চলে গেছে খড়িয়াবাঁধা বাজারের হিন্দুরা আগেই। অবশ্য তাদের বাড়ি-ঘরের মালামালও লুট হয়ে গিয়েছিল তখনই। বড়-বড় হিন্দুবাড়ি আর দোকানগুলো এখন চেয়ারম্যান আর মেম্বার সাহেবদের দখলে। তুলনামূলক ছোট আকারের কয়েকটি ধন-সম্পদ লুট হওয়া খালি বাড়ি আর দোকানঘর ছাড়া এখন আর তেমন কিছুই অবশিষ্ট নাই সেখানে। 
কিন্তু প্রতিশোধ যে নিতেই হবে!
চেয়ারম্যান কালামজিদ সাহেবকে বুঝিয়ে বলে অ্যাকশনে নেমে পড়লেন তাই তিনি। 
তাকে অপমান করা তিন মালাউনের শূন্য বাড়ি তিনটা একে-একে দখলে এলো সমেস ম-লের। এগুলোর দখলদারিত্ব বজায় রাখতে প্রতিদিন সকাল হলেই শুরু হলো তার নতুন ডিউটি । 
সকাল বেলা এসে বাড়ি তিনটির সামনে পালাক্রমে কিছু সময় করে বসে থাকাও শুরু হলো এরপর থেকে। ধীরে ধীরে সবাই জানতে লাগলো গনিমতের মাল হিসেবে পাওয়া বাড়িগুলো এখন সমেস ম-লের। তিন বাড়ির সবগুলো ঘরের চাবির একটি গোছা আঙুলের ডগায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবাইকে দেখানোও একটা নিয়মিত কাজ তার।  
সমেস ম-লের হাতে এখন অসীম ক্ষমতা! 
আড়াই টাকার লালপিন লুঙ্গির দিন শেষ! দিন শুরু এখন দামি প্লেকার্ড লুঙ্গি আর পাজামা-পাঞ্জাবির!  
লালপিন লুঙ্গি আর ছেঁড়া-ময়লা জামার বদলে দামি প্লেকার্ড লুঙ্গি বা পাজামার সঙ্গে পাঞ্জাবি আর টুপি পরে কেতাদুরস্ত চলাচল এখন তার। গায়ে আতর, চোখে সুরমা আর মাথায় হাঁস মার্কা গন্ধরাজ তেল মাখা সমেস ম-লকে সমীহ করে আপনি-আপনি করে ডাকাও শুরু করে দিয়েছে অনেকে।
নিয়ম করে এখন প্রতিদিন সকালে আর্মি ক্যাম্প ঘুরে এসেই তিনি বসেন একেকটি বাড়ির সামনে। তারপর হাতের আঙুলের ডগায় চাবির গোছাটা ঘোরাতে ঘোরাতে পথচলতি মানুষজনকে ডেকে ডেকে বলেন, ‘কওতো বাহে কি সমস্যা! একটামাত্র ব্যাটা মোর, কিন্তু আল্লায় বাড়ি দিছে মোক তিনটা! এতোগুলা বাড়ি এ্যালা মুই কি করিম্?’
এলাকার লোকজন, বাজারের দোকানি বা হাটুরেদের সবার কান ঝালাপালা প্রত্যেক দিন একই কথা শুনে শুনে। সামনে পড়লে অনিচ্ছা নিয়েই হয়েই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতে বাধ্য হয় তারা।  
তবে সুখের কাল বেশিদিন স্থায়ী হলো না সমেস ম-লের। 
মাত্র মাসতিনেক আগে দখল নেওয়া বাড়ি তিনটার মালিকানা পাকাপোক্ত হওয়ার আগেই এলো নতুন বিপদ।
পুরোপুরি শীত শুরুর আগেই মাদ্রাসা আর চিনিরকল ক্যাম্পের মিলিটারিরা হঠাৎ উধাও একদিন। 
রাজাকারদের পাহারায় রেখে কোথায় যেন চলে গেলো তারা অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের এক রাতের আঁধারে। রাজাকাররা অবশ্য তখনো বেশ দাপটের সঙ্গেই চষে বেড়াচ্ছে এলাকার হাট-বাজার আর মহিমাগঞ্জ রেলস্টেশন। 
দিকে দিকে খবরও জানান দিচ্ছে তারা, দুয়েক দিনের মধ্যেই নাকি কাটাখালী সেতুর ক্যাম্প থেকে আবার চলে আসবে নতুন আরেকদল আর্মি। 
কালামজিদ চেয়ারম্যান বলেছেন, পাকিস্তানের আর্মি হলো পৃথিবী সেরা আর্মি। তাদের কাছে লেংটিপরা মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো হিসাব আছে? তাছাড়া পেয়ারের পাকিস্তানের সঙ্গে আর্মি ছাড়াও ফেরেশতারা আছেন। সুতরাং ভয়ের কিছু নাই।
সমেস ম-লের নিজেরও দৃঢ় বিশ্বাস এ কথায়। বেশ বড়-গলায় সবখানে এই কথা এতোদিন নিজেও বলে বেরিয়েছেন তিনি। 
কিন্তু ক’দিন থেকে কিছুটা ভয়ের সঞ্চার হয়েছে তার মনে। বোঝা যায় একই শঙ্কায় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের চোখে-মুখেও ভয়ের ছাপ। 
বিভিন্ন দিক থেকে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা অপারেশনের খবর আসছে এখন মাঝে-মধ্যেই।  
প্রতিদিনের মতো সেদিন সকালে মাদ্রাসার ক্যাম্প থেকে খবরাখবর নিয়ে বাজারে ফিরে এলেন সমেস ম-ল। বোচন সাহার বাড়ির সামনে পেতে রাখা পুরনো কাঠের চেয়ারটাতে প্লেকার্ড লুঙ্গি আর গায়ের পাঞ্জাবি গুছিয়ে বসেও পড়লেন। 
এরপর অভ্যাস মতো আঙুলের ডগায় চাবির গোছাটা ঘোরানো শুরু করেছেন কেবলই। এখন কাউকে সামনে পেলেই বলা শুরু করবেন, একটি মাত্র ছেলের জন্য তিন-তিনটি বাড়ি নিয়ে তার সমস্যাটার কথাটা। 
ঠিক সেই সময়ই এক নতুন সমস্যা এসে তার পুরনো সমস্যাটাকে ঢেকে ফেললো একরকম কালো মেঘের মতো। 
যুদ্ধের কারণে বাজার প্রায় ফাঁকাই থাকে সবসময়। লোকজন তেমন থাকে না বললেই চলে। 
হঠাৎ উত্তর দিকের বড় রাস্তা থেকে একজন মানুষ এদিকে আসছে দেখে কিছুটা আশার সঞ্চার হলো সমেস ম-লের মনে। 
লোক বুঝি পাওয়া গেল একজন! কাছে এলে একেই বলতে হবে একটা মাত্র ছেলের জন্য তিন-তিনটি বাড়ি নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার নিয়মিত সংলাপটি।  
লোকটা এলো ঠিকই, তবে একা নয়।
যেন আড়াই মণ ওজনের একবস্তা সমস্যা ঘাড়ে নিয়ে এসে পড়লো তার সামনে। 
আজকের এ সমস্যা তার এতদিনের লালিত সমস্যার চেয়ে যে মেলা বড় তাও বোঝা গেল একটু পরেই।   
দেখা গেল হেঁটে নয়, লোকটা আসছে দৌড়ে। আরও দেখা গেল, বারবার পেছন ফিরে তাকানো ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া লোকটির পরনের লুঙ্গিটা খুলে গেছে। ইজ্জত রক্ষায় খুলে যাওয়া লুঙ্গিটাকে কোনোমতে এক হাতে ধরে রেখেছে সে। দৌড় থামিয়ে না পারছে সেটা পড়ে নিতে, না পারছে একবারে ছেড়ে দিতে।
আরেকটু কাছে আসতেই চেনা গেল লোকটাকে। 
এক হাতে লুঙ্গি, আরেক হাতে ফিতার বদলে দড়ি দিয়ে বাঁধা ভাঙ্গা রাইফেলটাকে লটকে নিয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ছুটে আসা লোকটা তার খুবই চেনা।  
লোকটা তারই পাড়াসম্পর্কের ভাইপো মালেক। নতুন রিক্রুট মালেক রাজাকার। 
সমেস ম-লের সুপারিশেই রাজাকারের চাকরিটা হয়েছে তার ক’দিন আগেই। 
এমন অভূতপূর্ব দৃশ্য তৈরি করে মালেক রাজাকারের দুই মাইল জমি-জলা-জঙ্গল ডিঙিয়ে পড়িমরি দৌড়ে খড়িয়াবাঁধা বাজারে ঢোকারও কারণ ঘটে গেছে একটু আগেই।
সেদিন সকালের সূর্যোদয়ের পরপরই দেওয়ানতলা রেলসেতুর রাজাকার ক্যাম্পটা হঠাৎ ঘিরে ফেলে একদল গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা। শত্রুকে গুলি করতে রাইফেল উঠানোর বদলে শূন্য দুই হাত মাথার ওপর উঠিয়ে সারেন্ডার করে তারা। বাঁচার আকুতি নিয়ে কেঁদেকেটে একাকার অবস্থা তখন তাদের। 
গেরিলা কমান্ডার দুলু একই এলাকার মানুষ। রাজাকাররা সবাই তার পরিচিত। তাই ‘ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ’ করার দরকার নাই বলে ছেড়ে দিয়েছেন তাদের। 
গালে দু’য়েকটা চড়-থাপ্পড় আর পশ্চাদ্দেশে একটা করে লাথি কষিয়ে কুকুর তাড়ানোর মতো করে তাড়িয়ে দিয়েছেন তাদের তখনই। তারপর বোমা মেরে সেতুটির একাংশ ভেঙ্গে রংপুর-বগুড়ার রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে চলেও গেছে গেরিলারা তখনই। 
দেওয়ানতলা রেলসেতু থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভিন্ন দিকে প্রাণ নিয়ে পালানো রাজাকারদের একজন এই মালেক। 
খড়িয়াবাঁধা বাজারে ঢুকে পড়ে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য আর পড়িমড়ি করে ছোটা বিধ্বস্ত মালেকের দিশাহারা চোখ তখনও ভয়ে ইতিউতি চাইছিল কেবল।
প্রাণের ভয়ে পালানোর এই ক্রান্তিকালে ভোম্বল হয়ে যাওয়া মাথাটা তুলতেই হঠাৎ তার নজর আটকে গেল মালেকের। 
এভাবে দৌড়ের কারণ জিজ্ঞাসার জন্য তখন হাত তুলে তার সামনে দাঁড়ানো তারই পরম শুভাকাঙ্খী, অভিভাবক আর চাকরির সুপারিশকারী পাড়াতো জ্যাঠা সমেস ম-ল।
পরনের খুলে যাওয়া লুঙ্গি আর ভাঙা রাইফেলের দড়ি হাতে পেচিয়ে ধরে বাজার পেরিয়ে দক্ষিণ দিকে দৌড়ানো মালেক  গতিটা কেবল কমালো একটু ছুটে চলার। 
তারপর চাকরির প্রতিদান হিসেবেই হয়তো চিরকৃতজ্ঞ মালেক সমেশ ম-লকে লক্ষ্য করে শুধু একটা কথাই বলতে পারলো ‘দৌড়াও বাহে জ্যাঠো, মুক্তি আইলো!’।
‘দৌড়’ আর ‘মুক্তি’ শব্দ দু’টো কানে ঢুকতেই আঙুলের ডগায় ঘোরানো চাবির গোছাটা কোথায় ছিটকে গেল!
তারপর একমুহূর্তও নষ্ট না করে নিজের দামি প্লেকার্ড লুঙ্গিটা কোমরে কষে বাঁধতে-বাঁধতেই মালেকের সঙ্গে ছুটতে শুরু করলেন চতুর সমেস ম-লও।
জীবনপুরের মাঠ পেরিয়ে দক্ষিণ দিকের সাতবিলার দিকে সোজা দৌড়াতে লাগলেন তিনি। তারপর একটু পরেই মালেককে ডিঙিয়ে তিনি চলে গেলেন সবার দৃষ্টিসীমার বাইরে। 
জনশূন্য খড়িয়াবাঁধা বাজারে তখন পড়ে রইলো কেবল দখল করা তিন হিন্দুবাড়ি, চাবির গোছাটা আর সমেস ম-লের ‘একটামাত্র ছেলের জন্য তিন-তিনটে বাড়ি’ নিয়ে নিত্যদিনের সেই সমস্যার গল্পটা।

×