ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১

সুনয়নী দেবীর শিল্পভুবন ও দুটি দুষ্প্রাপ্য রচনা

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

প্রকাশিত: ২২:৫৮, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩

সুনয়নী দেবীর শিল্পভুবন ও দুটি দুষ্প্রাপ্য রচনা

সচেতনভাবে বাঙালি নারীদের চিত্রকলা চর্চার ইতিহাস সুদীর্ঘ নয়

সচেতনভাবে বাঙালি নারীদের চিত্রকলা চর্চার ইতিহাস সুদীর্ঘ নয়। তৎকালে নারীরা সহজাত প্রবৃত্তি থেকে আপন মনে ছবি আঁকতেন। ছবি আঁকার কাঠামোবদ্ধ নিয়ম-কানুন তারা জানতেন না, যেহেতু তাঁদের জন্যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চিত্রকলা শেখার দ্বার অবারিত ছিল না। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে বাড়ির লোক কিংবা শুভাকাক্সক্ষীরা ছবি আঁকায় তাদের উৎসাহ দিতেন ও সহযোগিতা করতেন। 
১৮৭৯ সালে প্রথমবারের মতো কলকাতার একটি প্রদর্শনীতে ২৫ জন নারী চিত্রশিল্পীর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়। তারও পাঁচ দশক পর, ১৯৩৯ সালে ক্যালকাটা গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে প্রথম ছাত্রীরা ভর্তি হওয়ার সুযোগ লাভ করে। ওই বছর ১৭ জন নারী ভর্তি হয়েছিলেন। প্রথমদিকের বাঙালি নারী চিত্রশিল্পীদের মধ্যে অগ্রগণ্য গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী (১৮৫৮Ñ১৯২৪)। ‘ভারতী’, ‘মানসী’ ও ‘মর্মবাণী’ পত্রিকায় তাঁর ছবি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হতো। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার এক চিত্রপ্রদর্শনীতেও তাঁর চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছিলো। 
বাঙালি নারীদের চিত্রকলা চর্চার ইতিহাসে সুনয়নী দেবীর নামটি উল্লেখযোগ্য। তাঁর জন্ম ১৮৭৫ সালের ১৮ জুন, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে। বাবা গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মা সৌদামিনী দেবী। শিল্পাচার্য গগণেন্দ্রনাথ ও শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ তাঁর ভাই। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  ভ্রাতুষ্পুত্রী। মাত্র বারো বছর বয়সে রাজা রামমোহন রায়ের নাতি রজনীমোহন রায়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
পথিকৃৎ শিল্পী সুনয়নী দেবী চিত্রকলা চর্চায় ব্রতী হন সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই। শিখে-পড়ে তিনি ছবি আঁকতেন না। অবলীলায় তা স্বীকার করে বলেছেন, ‘কারো কাছে কোনো দিন আঁকা শিখিনি। শিখতে ইচ্ছেও করেনি। আমি যা এঁকেছি সবই নিজের চেষ্টায়।’ ছবি আঁকার পূর্বে শিল্পীরা পেন্সিল দিয়ে খসড়া এঁকে নেয়। সুনয়নী খসড়া করতেন না, সরাসরি রঙ-তুলিতে আঁকতেন। এ কারণে তাঁর ছবিগুলো কৃত্রিমতা স্পর্শ করতে পারেনি।
শৈশব থেকে তিনি কিছু ছবি এঁকেছেন। সেগুলো ছিল খেলার ছলে আঁকা। তবে সচেতনভাবে যখন ছবি আঁকতে শুরু করেন তখন তাঁর বয়স ত্রিশ। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘ত্রিশ-বত্রিশ বছর বয়সে আমার ছবি আঁকার শুরু।’ তাঁর আঁকা ছবি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২১-২২ সালে। তাঁর তখনকার ছবিগুলোতে বিশেষত্ব খুঁজে পান বিখ্যাত শিল্প-ইতিহাসবিদ স্টেলা ক্রামরিশ (১৮৯৬-১৯৯৩)। তিনি সুনয়নী দেবীর চিত্রকর্মের প্রশংসা করে একটি প্রবন্ধ লিখেন। এ প্রবন্ধটি সুনয়নী দেবীকে শিল্পরসিকদের কাছে পরিচয় করে দেয়। ১৯২৫ সালেও স্টেলা ক্রামরিশ তাঁকে নিয়ে আরেকটি প্রবন্ধ লিখেন। স্টেলা ক্রামরিচ মনে করেন, সুনয়নী দেবী প্রথম আধুনিক ভারতীয় নারী চিত্রশিল্পী। তিনিই প্রথম ভারতীয় নারী, যিনি তাঁর চিত্রকর্মে প্রথম সাক্ষর করেছেন।
সুনয়নী দেবী বলতেন, তিনি স্বপ্নে ছবির মিছিল দেখতেন। দেখতেন তাঁর চোখের সামনে অসংখ্য ছবি এসে ভিড় করে আছে। সেই ছবিগুলোই বাস্তবে তিনি ক্যানভাসে আঁকতেন। তিনি তাঁর নাতির কাছে বলেছেন, ‘আমার বেশিরভাগ ছবি আগে স্বপ্নে দেখেছি। পরে সেগুলোকে এঁকেছি।’ সুনয়নী দেবী নিয়ম করে ছবি আঁকতেন। সকাল আটটা থেকে দুপর পর্যন্ত এবং তিনটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত ছিলো তাঁর ছবি আঁকার সময়।
‘সুনয়নী দেবীর কাজের ধরন কেমন? পূর্বেই বলেছি তিনি আপন মনে আঁকতেন। তাঁর চিত্রকর্মের বিশেষত্ব সম্পর্কে চিত্রা দেবের অভিমত উল্লেখ করা মতো। তাঁর মতে, সুনয়নী দেবীর তুলির টানে কোনো দুর্বলতা বা সংশয় নেই। চিত্রকর্মে তাঁর আঁকা চোখগুলো ভীষণ বাস্তব, সুন্দর ও স্বপ্ন রঙিন। সুনয়নীর চিত্রকর্ম সম্পূর্ণ বিদেশী প্রভাবমুক্ত। শিল্পের জগতে তিনি নিজের তৈরিকৃত পথে হাঁটতেন। এই স্বকীয়তার কারণে জীবদ্দশাতেই সুনয়নী দেবীর কাজ দেশে-বিদেশে মূল্যায়িত হয়েছে। বরেণ্য মানুষরা তাঁর কাজের প্রশংসা করেছেন।

এমনকি বরেণ্য ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর চিত্রকর্ম নিয়ে লিখেছেন। তাঁর মতে, সুনয়নী দেবীর চিত্রকর্মে বাঙালির ঘরোয়া ভাব বজায় থাকে। তার ছবিতে কালীঘাটের পটুয়াদের ‘সবল ও সুকুমার রেখাপাত’ এবং বাস্তবকে সুন্দর করে দেখার প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। সুনীতিকুমার লিখেছেন, তিনি হইতেছেন মুখম-লের শিল্পী, নানা ভাবে দেবতাদের এবং মানুষের বিশেষতঃ হিন্দু ঘরের মেয়ের মুখের ছবি আঁকিয়া, তাঁহার বক্তব্য অতি সুন্দর এবং চিত্তগ্রাহী ভাবে ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। তাহার অঙ্কিত কয়েকটী রাধাকৃষ্ণ মূর্ত্তি-রাধাকৃষ্ণের মুখ-একেবারে নূতন জিনিস।’

১৯২৭ সালের ১ অক্টোবর লন্ডনের উইমেন ইন্টারন্যাশনাল আর্ট ক্লাব থেকে সুনয়নী দেবীর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়। এখানে প্রদর্শিত ছবিগুলো দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন অস্ট্রীয়ান রাজদূতের কন্যা, লেখক ও সমালোচক নোরা পুরসার উইডেনব্র্যাক। তিনি ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে জার্মান ভাষায় একটি প্রবন্ধ লেখেন। এ প্রবন্ধটির বাংলা অনুবাদ উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত মাসিক বিচিত্রা পত্রিকার ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের চৈত্র সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। নোরা পুরসার উইডেনব্র্যাকের মতে, সুনয়নী দেবীর চিত্রদর্শনে মনের ভেতর ‘অতৃপ্ত আকাক্সক্ষার বেদনা’ জেগে ওঠে। তাঁর চিত্রাবলি ‘ছন্দের গতিতে রচিত’। অন্দরমহলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জিনিসও তাঁর চিত্রকর্মে উজ্জ্বল। সুনয়নী দেবীর বেশিরভাগ চিত্রকর্ম অপার্থিব অনুষঙ্গে রচিত হলেও তাঁর শিল্পকর্মে দেবতা ও মানুষের মধ্যে খুব সামান্যই প্রভেদ রয়েছে।
উইডেনব্র্যাক দূরদেশের মানুষ, তাদের সংস্কৃতি ও চিন্তার জগতের সঙ্গে বাংলার পার্থক্য অনেক। তবু সুনয়নীর চিত্রকর্ম নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন যথার্থ। চিত্রকর্মগুলোর অন্তর্গত রূপ তিনি হৃদয়াঙ্গম করতে পেরেছেন। অবশ্য তিনিই বলেছেন, সুনয়নী দেবীর চিত্রকর্মের যে সুর তা অজানা কানেও চিরকাল বাজতে থাকে। ফলে দেশ-কাল, সমাজ ও সাংস্কৃতিক বিশাল পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সুনয়নীর চিত্রকর্মের ভাব ও ভাষা বুঝতে উইডেনব্র্যাকের অসুবিধা হয়নি। এভাবেই সুনয়নী দেবীর চিত্রকর্ম বিশ^মানবের হয়ে ওঠে। 
সুনয়নী দেবীর চিত্রকর্মের সর্বশেষ প্রদর্শনী হয় ১৯৩৫ সালে। সুহৃদরা তাঁর বাড়িতেই এ প্রদর্শনীর আয়োজন করে। তাঁর চিত্রকর্মের মধ্যে অর্ধনারীশ^র, বাঁশুরিয়া, নীল অঞ্জনা, বলরাম, গৌরীশঙ্কর, প্রসাধন, মা ও ছেলে, বংশীবাদন শ্রীকৃষ্ণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সুনয়নী কবিতা-গান লিখতেন। সেতার বাজাতে জানতেন। ছিলেন আত্মমুখী স্বভাবের। এই গুণী শিল্পী ১৯৬২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার রাতে প্রয়াত হন। পরদিন শনিবার সকালে কেওড়াতলায় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় তাঁর মৃত্যুসংবাদে বলা হয়, ‘সুনয়নী দেবীর শিল্পখ্যাতি ক্রমেই সারাদেশে পরিব্যপ্ত হয়। শিল্পী মহলে একটি বিশেষ শ্রদ্ধা ও সম্মান তাঁহার অধিকারভুক্ত হয়। মহিলা চিত্রশিল্পীদের মধ্যে ইনি নেত্রীস্বরূপা ছিলেন।’  
সুনয়নী দেবীকে নিয়ে লেখা দুটি দুষ্প্রাপ্য রচনা
[১৯৩৪ সালের ডিসেম্বরে সুধাংশু কুমার রায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ত্রৈমাসিক ‘রসশ্রী’র তৃতীয় সংখ্যা। এ সংখ্যায় চিত্রশিল্পী সুনয়নী দেবী (১৮৭৫Ñ১৯৬২)-এর চিত্রকর্ম নিয়ে লিখেন বরেণ্য ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। ওই সময়ে হাতেগোনা অল্পসংখ্যক নারী চিত্রকলা চর্চা করতেন। সেই চর্চাকে সুনীতিকুমারের মতো বিদগ্ধজন গুরুত্ব সহকারে দেখেছেন। সুনয়নী দেবী এবং সুনীতিকুমার দুজনের কারণেই এ লেখাটির গুরুত্ব অনেক বেশি। স্বল্প পরিসরের এ গদ্যটি সুখপাঠ্য।
দ্বিতীয় গদ্যটি লিখেছেন অস্ট্রীয়ান রাজদূতের কন্যা, লেখক ও সমালোচক নোরা পুরসার উইডেনব্র্যাক। জার্মান ভাষায় লিখিত প্রবন্ধটির বাংলা অনুবাদ মাসিক বিচিত্রা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের চৈত্র সংখ্যায়। উইডেনব্র্যাক নিজেও চিত্রকর ছিলেন। তাঁর ছবি মিউনিক, ভিয়েনা এবং ফ্লরেন্সে প্রদর্শিত হয়েছে। তিনি কবিতা, নাটক ও উপন্যাস লিখতেন। সংগ্রহ ও ভূমিকা : মুহাম্মদ ফরিদ হাসান।]

সুনয়নী দেবীর চিত্রাবলি
শ্রী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এম, এ, ডি, লিট

স্বদেশে ও বিদেশে যাঁহারা আধুনিক কালে বাঙ্গালাদেশে পুনরুজ্জীবিত ভারতীয় শিল্পের খবর রাখেন এবং এই শিল্প ধারার শ্রেষ্ঠ রচনাগুলির আদর করেন তাঁহারা সকলেই শ্রীযুক্তা সুনয়নী দেবীর অঙ্কিত চিত্রগুলির সহিত পরিচিত, এবং সকলেই ইহার চিত্রগুলির আকর্ষণী শক্তি স্বীকার করেন। শিল্পাচার্য্য অবনীন্দ্রনাথ ও তৎশিষ্য সিদ্ধশিল্পী নন্দলাল বঙ্গদেশে তথা ভারতবর্ষে এক অভিনব শিল্প রচনার ধারা ও শিল্পের সমীক্ষা প্রবর্তিত করিয়াছেন, শ্রীযুক্তা সুনয়নী দেবী সেই ধারা ও সমীক্ষার অন্তর্ভুক্ত হইলেও তাঁহার বিশেষ লক্ষণীয় স্বাতন্ত্র আছে।

তাঁহার শিল্পের অনুপ্রাণনায় ভারতের সুপ্রাচীন যুগের অজন্তা প্রভৃতির তথা ভারতের মধ্যযুগের রাজপুত ও মোগল শিল্পের প্রভাব পাই না; তিনি জাপানি, চীনা প্রভৃতি বিদেশী শিল্পের নিকটেও ঋণী নহেন। বাঙ্গালী ঘরের মেয়ে তিনি, তাঁহার রেখার আঁচড়ে ও তুলির টানে বাঙ্গালীর ঘরোয়া ভাবটুকু বেশ বজায় আছে। ছবি দেখিয়াই মনে হয়, কালীঘাট প্রভৃতি বাঙ্গালার পল্লীশিল্পের আধারের উপরেই তাঁহার চিত্রাঙ্কনের ভঙ্গীটুকু অবস্থিত। কালীঘাটের পটুয়াদের সেই সরল সবল ও সুকুমার রেখাপাত তাহাদের আত্মভোলা ভাব, তাহাদের নিষ্কপটতা,-ভাণ না করিয়া বাস্তবকে সুন্দর করিয়া দেখিবার সহজ ও সুব্যক্ত প্রকৃতি ও চেষ্টা।
শ্রীযুক্তা সুনয়নী দেবী চিত্রাঙ্কনের বিভিন্ন যুগ বা দেশের পদ্ধতি অবলম্বন করেন নাই, তাঁহার শিল্প-বীণার তন্ত্রী বহু নহে, তার কয়েকটী মাত্র, কিন্তু তিনি সেই গুলিকেই অবলম্বন করিয়া ভারতীয় শিল্পে নূতন করিয়া পুরাতন রাগ শুনাইয়াছেন। মুখ্যতার তিনি হইতেছেন মুখম-লের শিল্পী, নানা ভাবে দেবতাদের এবং মানুষের বিশেষতঃ হিন্দু ঘরের মেয়ের মুখের ছবি আঁকিয়া, তাঁহার বক্তব্য অতি সুন্দর এবং চিত্তগ্রাহী ভাবে ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। তাহার অঙ্কিত কয়েকটী রাধাকৃষ্ণ মূর্ত্তি- রাধাকৃষ্ণের মুখ- একেবারে নূতন জিনিস; বিশেষ করিয়া ত্রিপুরার মহারাজা বাহাদুর কর্ত্তৃক কলিকাতার একটী শিল্প প্রদর্শনী হইতে ক্রীত রাধাকৃষ্ণ চিত্রের কথা আমার মনে পড়িতেছে।

অন্য মূর্ত্তিগুলিতে নানাভাবে গৃহকর্ম্মে ও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে নিযুক্ত মেয়েদের মুখ দেখা যায়- কোথাও মাতা ও শিশু (বা যশোদা গোপাল) কোথাও পদ্ম হস্তে কন্যা, কোথাও সখী সরিবৃতা বিবাহের বধূ, কোথাও কৃষ্ণ বা রাধা, কোথাও শিব ও উমা, এবং দুই চারিটী অন্য দেবতার মূর্ত্তি যথা- যীশু খ্রীষ্ট। তাঁহার আলোচ্যের বিষয় বস্তু অল্প; এবং তাঁহার আঁকা মুখের অনেকটা অর্দ্ধ-নির্মীলিত ভাবের ডাগর চোখে একটী শিশুচিত সারল্য ও কোমলতা যেন ধরা যায়। একটা বিশেষ ধাঁজের মুখের সমস্ত বৈশিষ্ট্য ও সমস্ত শোভা তাঁহার তুলিতেই ধরা দিয়াছে; এই মুখকে আমরা বিশেষ করিয়া তাহার নামের সহিত জড়িত করিতে পারি। যেমন বিরাট শিল্পে আমরা “গ্রীক মুখ”, “বর্ত্তিচেল্লির মুখ”, “র্ব্যন্ জোন্সের মুখ” “গ্র্যজের মুখ” বলিলেই, মুখের আদলটী বুঝিতে পারি। মোটের উপরে, একথা বলা যায় যে তিনি একটী নির্দ্দিষ্ট গ-ীর মধ্যে বাঙ্গালা তথা ভারতের শিল্পে একটী সম্পর্ণরূপে নিজস্ব রীতি বা চাল আনিয়েছেন, এবং এই রীতি আর কেহ আয়ত্ত করিতে পারে নাই, ইহাতে তিনি একক, উচ্চ গৌরবে সমাসীনা।
তাঁহার ছবি দেখিয়া মনে হয় তাঁহার স্বত উৎসারিত শিল্প-প্রেরণাকে বাহির হইতে কিছুই গ্রহণ করিতে হয় নাই। আমরা বাঙ্গালী মেয়েদের কাছে যেভাবে বাঙ্গালী ঘরের কথা চিত্রিত দেখিতে পাইলে আনন্দিত হই, দেবতার চরিত্রে ও শুভ অনুষ্ঠানে যে শ্রী, শান্তি ও কল্যাণ আমাদের সকলের কাম্য,- তাহা যেন শ্রীযুক্তা সুনয়নী দেবীর অঙ্কিত সরলরেখা ভঙ্গীতে ও তাঁহার তুলিকার ¯িœগ্ধ বর্ণের আভায় মূর্ত্তিমন্ত হইয়া রহিয়াছে।

শিল্পী শ্রীমতী সুনয়নী দেবী
শ্রীমতী নোরা পুরসার উইডেনব্র্যাক রচিত

বহুদূরের এক প্রান্তর থেকে সুনয়নী দেবীর এই চিত্রগুলি আমাদের নিকট উপস্থিত। নানাদিক হ’তে বিভিন্নভাবে আমাদের এই ছবিগুলিতে মন মুগ্ধ করেছে। চিত্রদর্শনে এক অতৃপ্ত আকাক্সক্ষার বেদনা মনে জেগে থাকে। ইচ্ছা হয় চ’লে যাই সেই পরীর দেশে যেখানে ঐ শ্যামকান্তি, শান্তশ্রী, পদ্মআঁখি দেবতারা বাস করেন। এই ধ্যানমগ্ন দেবতারাই তাদের নিজেদের রূপ দিয়ে জগতের বিচিত্র রূপের প্রলয়ের মধ্য থেকে সৃষ্টির আসলরূপটি ফুটিয়ে তুলছেন। তাই সীমাহীন ক্ষীণ রেখাটুকুর মধ্যেও সেই দেবতাদের প্রশান্ত স্তব্ধ কল্পমূর্ত্তি ধরা দিয়েছে।
শুধু একমাত্র ছন্দের গতিতে রচিত এই চিত্রগুলির মৃদু রেখা কম্পনে আর সীমাহীন অনন্ত মায়ারূপ সৃষ্টিতে বর্ত্তমান যুগের চিত্রাঙ্কন পদ্ধতির খানিকটা মিল দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু কেবল সাদা আর কালোর সমস্ত রং ছাপিয়ে এই ছবিগুলিতে যে অপূর্ব রং ফুটে উঠেছে, সে ভোলবার নয়। মনে হয় যেন এইগুলি সেই পুরাকালের জল ঝড়ে জর্জ্জরিত দেয়ালের গায়ে আঁকা প্রাচীন চিত্রাবলী। মাঝে মাঝে হঠাৎ ভাগ্যলক্ষ্মীর অযাচিত দানের মতন কখনও কখনও স্নিগ্ধ লাল রং গভীর নীল রং-এর মাঝ দিয়ে শোভা পাচ্ছে। আর তারি মধ্যে দেবতাদের প্রশান্ত চোখের চাহনি আর বিচিত্র অলঙ্কারের জ্যোতি জ্বলজ্বল করছে।
এই ছবিগুলি আকারে ছোট হলেও ভাবগৌরবে যেন সমস্ত দেওয়াল জুড়ে আছে। বহু যুগ আগেকার নিঃশ্বাস ইহাদের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছে। যেন এক অপার্থিব গৌরবের বৃষ্টিধারা ছবিগুলি থেকে ঝরে পড়েছে। নানা রকমের রচনার ভিতর থেকে একটি অখ- ভাব এই চিত্রগুলিতে অপ্রতিহতভাবে প্রকাশ। সেই ভাবটি হচ্ছে বিশ্বের উপরে আসীন একমাত্র পরম দেবতার উপর ঐকান্তিক নিষ্ঠা। নূতন কিছু করবার বৃথা প্রয়াস বা সাধারণ প্রচলিত ধারা থেকে জোর ক’রে বিচ্ছিন্ন হবার চেষ্টা সুনয়নী দেবীর শিল্পে একেবারেই নাই।
সুনয়নী দেবী রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী এবং আধুনিক বাংলা শিল্প-পদ্ধতির প্রবর্তক শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভগিনী। সম্ভ্রান্ত বংশে তাঁহার জন্ম। শান্তিময় অন্তঃপুরই তাঁহার কর্ম্মস্থল। এই অন্তঃপুরের প্রত্যেকটি ছোটখাট জিনিষও সম্পূত ধর্ম্মভাবে উজ্জ্বল; সব মিলে যেন একটি সুরের ধারা বইছে। এই সুর যখন মৃদুগতি থেকে উচ্চগ্রামে ওঠে, কণ্ঠস্বর যখন মূর্ছনায় কাঁপে তখন সুপ্ত অন্তরাত্মা এক আকুল আবেগে চঞ্চল হয়ে ওঠে। অজানা কানেও সেই অপরিচিত সুর চিরকাল বাজতে থাকে।
সুনয়নী দেবীর ছবিগুলিতেও এই সুরেরই গভীর অনুভূতির প্রকাশ। বংশীবাদন শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর পাশে বিকশিত পুষ্পের মতন বলরামের প্রতিমূর্তিতে এই সুরেরই তাল বাজছে। গৌরাশঙ্কর নামে অর্দ্ধনারীশ্বর মূর্ত্তিতে এই সুরের ছন্দের সমাবেশ অতিশয় দুরূহ কাজ- কিন্তু তাহাও এই চিত্রে সম্পূর্ণ সফল হয়েছে। ছবিগুলির মধ্যে কেবল একটিমাত্র চিত্র পার্থিব ব্যাপার নিয়ে রচিত। শিল্পী ইহার নাম দিয়াছেন ‘প্রসাধন’। কিন্তু এই কিশোরী কন্যার নয়নকোণের কাজলরেখা এবং রহস্যময় ক্ষীণ হাসিটুকু এ জগতের নয়- কোনো এক মায়া জগতের ছায়া মাত্র। সুনয়নী দেবীর শিল্পে দেবতায় মানুষে প্রভেদ সামান্যই। মনের আবেগ যেমন পরপারের সঙ্গীতে ক্ষণিকে মিলিয়ে যায়, চকিতে যেমন মৃদুুহাসি মুখে ফুটে ওঠে- প্রভেদ সেই রকমই অল্পমাত্রার ।

×