ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৬ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১

আবেল মিরোপোলের কবিতা

ভূমিকা ও অনুবাদ : তূয়া নূর

প্রকাশিত: ২২:৫৩, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩

আবেল মিরোপোলের কবিতা

কৃষ্ণাঙ্গ জাজ শিল্পী

আজব ফল

আজব রকমের ফল ধরে দক্ষিণের সব গাছে
পাতায় ও শেকড়ে জমাট রক্ত লেগে আছে
কালো পেশল শরীরগুলো দক্ষিণ হাওয়ায় দুলে
পোরেশ গাছের ডালে ডালে কিমাকার ফল ঝুলে
বীর দক্ষিণের দৃশ্য আছে ছবির মতো ছেপে 
থেঁতলানো মুখ, চোখ দুটো তার আছে ফুলে ফেঁপে
আসে হীমচাঁপার ঘ্রাণ, মিষ্টি জীবন্ত বলে যাকে
হঠাৎ পোড়া মাংসের গন্ধ লাগে তখন নাকে
এখানের একটা ফল খায় কাকরা ঠোঁটে ছিঁড়ে
মেঘ জড়ো হয় বৃষ্টি ঝরে, বাতাস থাকে ঘিরে
সূর্য তাপে পেকে পচে ঝরে গাছের তলে
এখানে এক ভীষণ অদ্ভুত তেতো ফসল ফলে

কবি ফ্রাংক ও’হারার কবিতা ‘যে দিন লেডি মারা যায়’ কৃষ্ণাঙ্গ জাজ শিল্পী বিলি হলিডেকে নিয়ে লেখা। কবিতাটা পড়লাম অনেকবার। কবিতার অল্প পরিসরে ইতিহাস দিয়ে ঠাসা। বিলির মৃত্যুর দিনে লেখা কবিতাটা। বিলি মারা যায় ৪৪ বছর বয়সে হাসপাতালে লিভার সিরোসিসে বিনা চিকিৎসায়। খটকা লাগলো বিনা চিকিৎসায় কেন? শুনতে শুরু করলাম তার গান। একটা গানে এসে আটকে গেলাম। গানটার নাম  ‘স্ট্রেঞ্জ ফ্রুট’। অনেকবার শুনলাম। এই গানটা লিখেছিলেন রুশ বংশোদ্ভূত আবেল মিরোপোল। এটা প্রথমে কবিতা ছিলো। কবিতাটা কালো মানুষদের স্বপক্ষে ও দক্ষিণের রাজ্যগুলোর বর্ণবাদী সাদাদের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে লেখা। দুজন কালো মানুষকে একটা পপলার গাছে ঝুলিয়ে রাখার ছবি তার মনে দাগ কাটে। এই ছবি তাকে এই কবিতাটা লিখতে অনুপ্রাণিত করে। এই দুইজন হলো টমাস শিপ এবং আব্রাম স্মিথ নামে দুই কিশোর।

১৯৩০ সালের ৭ আগস্ট ইন্ডিয়ানার মেরিয়নে এক উন্মত্ত জনতা তাদের পিটিয়ে হত্যা করেছিলো। পুলিশ তিন কিশোরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ডাকাতি ও একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষকে হত্যা এবং একজন শ্বেতাঙ্গ নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ এনে আটক করেছিলো জেলে। সেই তপ্ত আগস্ট রাতে জেলখানার সামনে জড়ো হয় এক মারমুখী জনতা। তারা তিন বন্দিকে তাদের হাতে তুলে দিতে বলে। তিনটা কালো কিশোর জেলের সেলের ভেতর আতঙ্কিত হয়ে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে। হাজার হাজার মানুষ শেষে সেøজহ্যামার দিয়ে কারাগারের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
মারমুখী জনতা নির্মমভাবে নিরস্ত্র দুই কিশোরকে মারধর করে। তারা টমাস শিপকে জেল হাউসের জানালায় বেঁধে নির্যাতন করে এবং ফাঁসি দেয়। আর আব্রাম স্মিথ যখন তার শরীরকে টেনে তুলে পালানোর চেষ্টা করেছিল, তখন তার হাত ভেঙে দেয়। তারা আব্রামকে কোর্ট-হাউস চত্বরে টেনে নিয়ে যায়, তাকে ছুরিকাঘাত করে এবং ঝুলিয়ে দেয় আদালত চত্বরের একটা গাছে। জনতা তার দেহ ঝুলানোর আগে পিটিয়ে মেরে ফেলে। রক্তপিপাসু জনতা তখন টমাসের মৃতদেহ টেনে এনে আব্রামের পাশে ঝুলিয়ে দেয়। তৃতীয় কিশোর বেঁচে যায় অলৌকিক ভাবে। তার নাম জেমস ক্যামেরন। তাকেও নেয়া হচ্ছিলো লিঞ্চিংয়ের (গলায় দড়ি বেঁধে গাছে ঝুলানো)  জন্য। ভিড়ের ভেতর থেকে একজন মহিলা চিৎকার করে বলল, ওকে আনছো কেন? ও তো ছিলো না এসব কাজে। ক্যামেরনকে ছেড়ে দেয়। সে ছিলো কম বয়সী টমাস ও আব্রামের চেয়ে। 
লরেন্স বাটলার নামে একজন স্থানীয় ফটোগ্রাফার গাছে
ঝুলানো মৃতদেহের ছবি তুলেছিলো। সেই ছবি সে হাজার হাজার কপি বিক্রি করেছিলো। পুলিশ কাউকে সেদিন বাঁধা দেয়নি। কারুর বিরুদ্ধে মামলা করেনি। বলেছিলো, ছবি দেখে কাউকে শনাক্ত করতে পারছে না তারা। 
১৯৩১ সালে ক্যামেরন দোষী সাব্যস্ত হয়। তবে যে মহিলা
রেপড হয়েছিলো বলা হয়। সে আদালতে জানালো যে সে রেপড হয়নি। ক্যামেরন ছাড়া পায়। পড়াশোনা করে। ইঞ্জিনিয়ার হয়। অবসর গ্রহণের পর সমাজ কল্যাণমূলক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। তিনি ব্ল্যাক হোলোকস্ট মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করেন। 
১৮৬৫ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত ছয় হাজার কালো আমেরিকানদের বিনা বিচারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে
মারা হয় (Lynching). 
১৯৩৬ সালে আমেরিকান কবি আবেল মিরোপোল লরেন্স বাটলারের এই ছবিটা দেখে কবিতা লিখেন Bitter Fruit। তিনি তখন নিউ ইয়র্কের ব্রন্সের ডেভিড ক্লিন্টন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। কবিতাটা প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে The Nwe York Teacher পত্রিকায় ল্যুইস অ্যালান ছদ্মনামে। পরে প্রকাশিত হয় মার্ক্সবাদী পত্রিকা দি নিউ মাসেসে । 
আবেল মিরোপোল ছিলেন একজন শিক্ষক, কবি, গীতিকার এবং সুরকার। তার ইহুদি পিতামাতা রাশিয়া থেকে পালিয়ে এসে আমেরিকায় অভিবাসিত হয়। আবেল মিরোপোলের ব্রঙ্কসে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯২৫ সালে সিটি কলেজ থেকে স্নাতক হন, ১৯২৬ সালে হার্ভার্ড থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি ১৯২৭ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ব্রঙ্কসের ডিউইট ক্লিনটন হাই স্কুলে ইংরেজি পড়ান। মিরোপোল ও তার স্ত্রী কম্যুনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। তারা দেশব্যাপী গণঅধিকার আন্দোলনে অংশ নেন ও ইউরোপের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। 
মিরোপোল ছিলেন শৌখিন শিল্পী। তিনি তার কবিতাটাকে 
গণসংগীতে রূপ দিয়ে গাইতে শুরু করলেন কৃষ্ণাঙ্গদের 
সমাবেশে। একবার গেয়েছিলেন মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে। তবে এই গানটা জনপ্রিয় হয়ে উঠলো যখন গানটা গাইতে শুরু করলেন জাজ সংগীত শিল্পী বিলি হলিডে। রাজনৈতিক গানটা তিনি প্রথমে গাইতে চাননি। শ্রোতাদের অনুরোধে তিনি গাইলেন নিউ ইয়র্ক সিটির
ক্যাফে সোসাইটিতে। এই গান কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি
রেকর্ড করতে অস্বীকৃতি জানায়। 
বিলি হলিডে তার গানের অনুষ্ঠানে প্রতিদিন এই গানটা গাইতেন। গানটা পরিচিতি লাভ করে ঝঃৎধহমব ভৎঁরঃ নামে। এই গানটার জন্য তাকে কিছু মানুষের রোষানলে
পড়তে হয় ও লিভার সিরোসিসে বিনা চিকিৎসায় তাকে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করতে হয়। তবে এই গানটা তাকে দিয়েছে খ্যাতি ও সম্মান। বিলি হলিডেকে মরণোত্তর এমি অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। ১৯৯৯ সালে টাইম ম্যাগাজিন এই গানটাকে শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গান হিসাবে উল্লেখ করে। 
মিরোপোল অগণিত কবিতা এবং গান লিখেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা এবং জোশ হোয়াইট হিট, দ্য হাউস আই লিভ ইন। তিনি রবার্ট কুরকার অপেরা ‘দ্য গুড সোলজার শোইক’ এর কথা ও গান লিখেছেন যার মূল রচয়িতা চেক লেখক জারোশাভ হাসেক।
মিরোপোল দম্পতি দুটো শিশুকে দত্তক নিয়েছিলেন, যাদের বাবা-মা দুজনকে পারমাণবিক বোমার তথ্য রাশিয়ায় পাচারের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। 
কবি মিরোপোল কবিতার নাম ছিলো Bitter Fruit. বিলি হলিডে বলতেন Strange Fruit. আর এই নামটাই রয়ে যায়। এই কবিতায় আছে বারোটা পঙক্তি। কোনো যতিচিহ্ন নেই। জোড়া পঙ্ক্তির একটাতে আছে বিষণœতা, অন্যটাতে আশাবাদ। 

×