ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০১ মার্চ ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

জামিনদার

মোহাম্মদ কাজী মামুন

প্রকাশিত: ০১:১৯, ২৪ মার্চ ২০২৩

জামিনদার

‘আর হ্যাঁ, একজন গ্যারান্টরও লাগবে, আপনার থেকে আয় বেশি হলে ভালো

‘আর হ্যাঁ, একজন গ্যারান্টরও লাগবে, আপনার থেকে আয় বেশি হলে ভালো। আজকালের মধ্যে যদি একজন আর্থিকভাবে শক্তিশালী গ্যারান্টর অ্যারেঞ্জ করে দিতে পারেন, তাহলে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই হয়ে যাবে আশা করছি’ 
পেপারগুলো সই করার ফাঁকে অফিসারটির দিকে বিস্ময়মাখা চোখে তাকান তিনি। পরপর টানা এত্তগুলো সই! হাতের আঙুলগুলো রীতিমতো কাঁপছিল তার। সইগুলো বিকৃত হতে হতে এতটা অদ্ভুড়ে চেহারা নিচ্ছিল যে, তার নিজেরই বিশ্বাস করতে হচ্ছিল, এগুলো তারই! যেমন এখন বিশ্বাস হচ্ছে না অটবির সুশোভিত ডেস্কের ওপারে থাকা অফিসারের কথাগুলো! এও কি সম্ভব! মাত্র এক সপ্তাহেই হয়ে যাবে!
যখন আগাগোড়া গ্লাস ও গাছে মোড়া এই বিশাল ভবনের রিসেপশানে জিজ্ঞেস করেছিল লোন সেকশানটার কথা, তখন তার নিজেরই কেমন অপরাধবোধ হচ্ছিল! যেন বা এই প্রাসাদপুরীতে নিতান্তই অনর্থ বাঁধাতে তার আগমন! এরপর লিফট যতই উঠছিল উপরে, কেমন একটা অস্বস্তি পাঁক দিয়ে যাচ্ছিল তাকে ঘিরে!
সত্যি বলতে কী, খুঁতখুঁতানিটা শুরু হয়েছিল বাড়ি থেকেই। চিরকালই ঘরকুনো ছিল, আর ইদানীং তো ঘর হতে এক পাও ফেলতে মন চায় না। মনের সঙ্গে সঙ্গে শরীরটাও বিকট বাদ সাধে, অল্পতেই কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়! বলা যায়, স্ত্রীর চাপেই! অনেকটা হাতে-পায়ে ধরেই সে রাজি করিয়েছে তাকে। অফিসারটি তার স্ত্রীর এক কাজিনের বন্ধু, ব্যাংকের ঋণ সেকশানে রয়েছে তার বহুদিনের অভিজ্ঞতা।

তার কাছে গেলেই না কি কেল্লাফতে! কিন্তু এই দুনিয়ায় ঋণ পাওয়া এত সহজ! তাও তার মত দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পক্ষে! হেসে উড়িয়ে দিতে গিয়েছিলেন স্ত্রীর কথাগুলো, কিন্তু ততক্ষণে জলীয় বাষ্পে ছেয়ে গেছে রুবির চোখ-মুখ; যেন একটা সুইচ টেপার অপেক্ষা, তারপরেই অনর্গল শিখায়, অবিরল ধারায় পড়তে শুরু করবে!
একই রকম হয়েছিল মাসখানেক আগে যখন ডাক্তারের চেম্বার থেকে সোজা বাড়িতে ঢুকেছিলেন, আর রুবির স্থির চোখের সামনে নিজেকে এবং একই সঙ্গে হাতে ধরা রিপোর্টটি লুকোতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ড্রইয়িং এর ধবধবে আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল ক্রিয়েটিনিন স্কোরখানা, তারপরেও তার স্ত্রী কাগজটি থেকে চোখ সরাচ্ছিল না, কি জানি, ‘নাম- মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, বয়স- বিয়াল্লিশ’ এই শব্দগুলোতেই আটকে গিয়েছিল কিনা! তবে তার নিজেরও এমন হয়েছিল প্রথম দেখার পর; মনে হয়েছিল ভুল কারও রিপোর্ট তার নামে চলে এসেছে।

ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে এ রকম যে হয় না, তা তো নয়। এত হাই একটা স্কোর তার, লেভেল ফাইবের একটা সাইক্লোন ধেয়ে আসছে তার সাজানো জীবনটাকে তছনছ করে দিতে, অথচ একটুও কোনো পূর্বাভাস থাকবে না! খুব বাড়াবাড়ি নয় কি?
এই তো গেল বছরও একটা ফুল চেকাপ করিয়েছেন, কই স্কোরকার্ড তো বিপদসীমার অনেক নিচেই অবস্থান করছিল! করোনা মহামারির সময় তো মরতেই বসেছিলেন, কই তখনো তো ডাক্তারের কাছে এমন কোনো লক্ষণ ফুটে ওঠেনি যে তার দেহের শোধনাগার দুটো এঁটো জমে একদমই ভরাট হয়ে যাবে, নিষ্কাশনের আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকবে না!

অথচ আজ বছর না ঘুরতে, সেই ডাক্তারই এমন ভয়াল সুনামির খবর দিচ্ছেন যে, প্রস্তুতিটুকু নেওয়ার অবকাশ মিলছে না! দুইটা কিডনিই ড্যামেজ, তাও ৭০ শতাংশ – ডাক্তার নিজেও কিন্তু বিশ্বাস করতে পারেননি প্রথমে। ডায়ালিসিসেও যখন কাজ হবে না, তখন ট্রান্সপ্লান্টেশানই একমাত্র সমাধান, তাও দুর্বল- সে ডাক্তার মুখ ফুটে না বললেও কামরুজ্জামান ঠিকই বুঝতে পারলেন। ডোনর যদিও বা রেডি করা যায়, টাকার কি বন্দোবস্ত হবে? আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধবের কাছে হাত পেতে যা পাওয়া যাবে তাতে প্রি-টেস্টিংয়ের খরচও উঠে আসবে না!
মরতে কামরুজ্জামানের ভয় ছিল না। কিন্তু ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দুটো যে চোখের সামনেই খেলছিল, তাদের একদমই জানা নেই কি এক ভয়াল পরিণতি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য! আচ্ছা, তার বাচ্চাদের জন্য নিশ্চয়ই অনেক সাহায্য আসবে! অফিস না করুক, আরও অনেক সামাজিক সংগঠন আছে, কোথাও থেকে সাহায্য মিলবেই! কোনোমতে পড়াশোনোটা চালিয়ে যেতে পারলেই হলো- তার দুটো বাচ্চারই ব্রেন অনেক শার্প, লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করে নিতে পারবে! ওদের মাকে হয়ত বাচ্চা দুটোকে নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘুরতে হবে প্রথম কয়েকটা দিন! দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই বুকটা ভীষণ করে মোচড় দিয়ে উঠেছিল।
বাচ্চাদের সামনে সেদিন প্রতিরোধের দেওয়াল গড়ে তুলতে পারলেও অফিসে এসে পুরোই ভেঙে পড়েছিলেন তিনি; চোখ দিয়ে গলগল করে গড়িয়ে পড়েছিল জল, আর সে জলের অবশিষ্ট কয়েক ফোঁটা যখন মুখের ওপর বিলি কাটছিল, সহকর্মী রাব্বির চোখে পড়ে গিয়েছিল। যদিও উদ্ভূত পরিস্থিতিটা তার তৈরি নয়, কিন্তু কেন জানি, নিজেকেই সবসময় অপরাধী মনে হয়েছে কামরুজ্জামানের, আর অপরাধের চূড়ান্ত শাস্তির জন্য অপেক্ষা করাকেই কর্তব্য ভেবে নিয়েছে সে। সেজন্যই হয়ত অসুখটাকে দুনিয়াব্যাপী রাষ্ট্র করতে একেবারেই ইচ্ছে করেনি তার।
তবু এ হয়ত বিধাতারই লিখন ছিল- না হলে, কান্নাটা সয়ে এলে পর যখন ডেস্কে বসে টিস্যুর প্রলেপে তুলে ফেলছিলেন সব দাগ, সহকর্মী রাব্বির চোখেই ধরাটা পড়ে যেতে হবে কেন! বয়সে জুনিয়র হলেও রাব্বি তার ইনচার্জ হয়ে বসেছিল। আর এসব ক্ষেত্রে যা হয়, মানে, ধরাকে সরা জ্ঞান, রাব্বির ক্ষেত্রে না খাটলেও, রাব্বির চোখের বাঁকা হাসিটা ঠিকই ধরতে পেরেছিল কামরুজ্জামান। বিঁধত না তাকে, তা নয়। কিন্তু চিরকালই কামরুজ্জামান একজন যাকে বলে ‘আ সিনসিয়ার সার্ভিসম্যান’। আনুগত্য তার রক্তে, শিরায় শিরায়।

তাই তো সাধনা করে যাচ্ছিল তার তরুণ রাব্বির একান্ত অনুগত সেবক হতে। আশ্চর্য হল, এতে করে রাব্বির তাচ্ছিল্যের মাত্রাই কেবল বেড়ে গিয়েছিল। সেই রাব্বি যখন তাকে অফিসের সর্বোচ্চ অথরিটির কাছে নিয়ে গেল, আর তারপর বিপুল প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে ফান্ড কালেকশান শুরু করল, তখন কামরুজ্জামান কিছুই বুঝতে পারছিল না- কি হচ্ছে, বা, কেনই হচ্ছে; শুধু বিধাতার তৈরি মস্ত আকাশটার দিকে চেয়ে আরও এক দফা কেঁদে নিয়েছিল।
রাব্বি বিপুল বিক্রমে কাজ করে যাচ্ছিল। একের পর এক সভা-সমাবেশ আয়োজন করছিল তাকে পরিচিত করতে। অচিরেই কামরুজ্জামান স্টার বনে গেলেন, হয়ে দাঁড়ালেন আর্ত মানবতার প্রতীক! দিকে দিকে যখন তাকে নিয়ে আলোচনা হতো, তখন কিন্তু কামরুজ্জামান সবাইকে মনে করিয়ে দিতেন, ‘উপরে আল্লাহ, আর নিচে রাব্বি ভাই!’ একদিন তো স্বয়ং চেয়ারম্যান স্যার তার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে ফোন করে বসলেন। তখনো রাব্বি ভাইয়ের প্রশংসাতেই তার ডায়ালগের বেশিরভাগ আয়ু নিবেদিত হলো।

এদিকে কামরুজ্জামানের প্রার্থনাগুলোও রাব্বিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছিল। এই সময়টা তিনি দিনরাত প্রার্থনা করতেন বাসায় বসে। অফিস থেকে রাব্বিই এমডি স্যারকে বলে তার অনির্দিষ্টকালের ছুটির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তার কেবলি মনে হতো, বিধাতাকে ডাকতে হবে, যতটা বেশি সময় পাওয়া যায়, তাকে দিতে হবে! তিনিই তো তার সহকর্মী রাব্বিকে এনে দিলেন, তারই জন্য ছেলেটিকে খোলনলচে বদলেও দিলেন! যে হারে টাকা আসছে, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের দুপা সামনে এগিয়ে পেছনে সরে যাওয়া- চিরকাল যেমন হয়েছে- তেমনটা ঘটলেও ক্ষতি নেই।
যতই দিন যাচ্ছিল, সব কল্পনাকে হার মানিয়ে বন্যার স্রোতের মতো ছুটে আসতে লাগল সাহায্য, ভাসিয়ে দিতে লাগল তার ঘরদুয়ার। কিন্তু একদিন রাব্বি তার হাতে আরও কিছু টাকা দিয়ে যখন বলল, ‘আপাতত এ পর্যন্ত পরে সুযোগ থাকলে আবার হবে’ তখনো কামরুজ্জামানের ট্রান্সপ্লান্ট সার্জারির জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের অর্ধেক বাকি ছিল। কেন মাঝপথে এমন করে ছিপি এঁটে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে আকাশ থেকে পাতাল অবধি প্রশ্ন উঠল কামরুজ্জামানের চিন্তারাজ্যে।

কিন্তু রাব্বি যেহেতু বলছে, নিশ্চয়ই যুক্তিসংগত কোনো কারণ থাকবে; তাই যে কোনো প্রশ্ন থেকে বিরত থাকলেন তিনি, আর মাথাটা নিচু করে রাখলেন। রাব্বি অবশ্য আরও কিছু যুক্তি পেশ করেছিল তার প্রশ্ন বা উত্তরের অপেক্ষা না করেই; যেমন, বেশি টাকা তুললে বদনাম হতে পারে, কেলেঙ্কারি হতে পারে, বাজে মানুষের চোখ পড়তে পারে, একাউন্টটা ব্লক করে দরকার, আর বলে দেওয়ার দরকার টাকার প্রয়োজন ফুরিয়েছে।
আশা জেগে উঠে যখন মরে যায়, তখন ‘ধন্য আশা কুহকিনী’র ডাকে পাগলপারা হওয়া কামরুজ্জামানের বিধিতে ছিল না। তাই তিনি বাথরুমের বেসিনে বসে নীরবে চোখের জল ফেলতে লাগলেন রাব্বি বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার পরপরই। কিন্তু বিধির খাতায় মনে হয় অন্য কিছু লেখা ছিল! ঐদিনই তার কাজিন শ্যালক ভগ্নিপতিটিকে দেখতে এলেন, আর কথায় কথায় ঋণগ্রহণের বিষয়টা উঠে এলো।

শ্যালক তার ব্যাংকার বন্ধুকে সঙ্গে সঙ্গেই ফোন করলেন। আর তার পরদিনই ব্যাংকে দৌড়। আশ্চর্য হলো, ব্যাংকের অফিসার যখন গ্যারান্টরের শর্ত আরোপ করছিল, একটুর জন্যও চিন্তিত দেখায়নি কামরুজ্জামানকে! একজন গ্যারান্টর যেন আগে থেকেই লুকিয়ে ছিল তার অন্তরে। অফিসারের টেবিল থেকে উঠে দালানটাকে বিদায় জানানোর আগেই গ্যারান্টরকে বের করে এনেছিলেন তিনি।
তার সহকর্মী রাব্বি তার চেয়ে শুধু দুই পয়সা বেশি ইনকাম করে না, তাকে খুব ভালো বাসে। যেভাবে ফান্ড কালেকশান করে দিল, তা মায়ের পেটের আপন ভাইও করত কিনা সন্দেহ! তার অসুখটা জানার পর থেকে যত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে রাব্বির, হাতটি নিজের মুঠোয় ধরে বলেছে, ‘আমার ভাইটির জন্য কিছু করেন। এমন মানুষ হয় না। ‘রাব্বির মধ্যে এক সহজাত আবেদন ছিল, তাকে উপেক্ষা করাও ছিল কষ্ট।
সেই রাব্বিকে জামিনদার হওয়ার কথাটা বলতে কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল। তারপর অনেকটা সময় নিয়ে জানাল যে, বাসায় আলোচনা করে সিদ্ধান্তটা জানাবে। কথাটা শুনে কামরুজ্জামানের খুবই ভালো লাগল, আর রাব্বির প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল। কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে স্ত্রী ও পরিবারের সঙ্গে আলাপ করা তো ইমানদারের লক্ষণ। তবে দুদিন পার হয়ে গেলেও সাড়াশব্দ মিলছিল না রাব্বির তরফে। এও যৌক্তিক মনে হলো কামরুজ্জামানের। একটু সময় তো নেবেই, ঝোঁকের মাথায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ তিনিও পছন্দ করেন না।
সপ্তাহখানেক বাদে অবশ্য ফোন এলো রাব্বির। তবে কামরুজ্জামান যেমনটা আশা করেছিলেন, মানে, রাব্বি বলবে, ‘কই দিন পেপারটা, কোথায় সাইন করতে হবে বলুন’, সে রকম কিছু ঘটল না। বরং তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হলো। রাব্বির গ্যারান্টি ছাড়া ঋণ হবে না কেন? কামরুজ্জামানের স্যালারি পজিশান কি যথেষ্ট না? কি উত্তর দেবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না দেখে চুপই ছিলেন তিনি।

হঠাৎ ফোনের অপর প্রান্তটা যেন কড়মড় করে উঠল, ‘আচ্ছা, আপনার যে দুইটা কিডনিই এক্সট্রিম লেভেলে ড্যামেজড, তা আবার জানান নাই তো ওদেরকে? কিডনি রোগীকে কিন্তু ওরা ডেডম্যান বলেই ধরে নেয়! ট্রান্সপ্লান্টে কিউর-টিউর হয়, এসব ওরা বিশ্বাস করে না! ওদের কাছে আপনার লেভেলের পেশেন্ট একটা জীবন্ত কংকাল ছাড়া কিছুই না!’ কামরুজ্জামান ব্যাংক অফিসারটিকে তার অসুখের বিষয়ে কিছুই বলেনি; তারপরও রাব্বির কথাটা কেন যেন তার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত বইয়ে দিল! রাব্বির স্বরে কোথাও থেকে একটা রোষ এসে জড়ো করেছিল- কি কারণে কে জানে! এ অবস্থায় নিশ্চুপ থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে করে উত্তর দান থেকে বিরত থাকলেন তিনি!
এরপর সপ্তাহখানেক আর রাব্বিকে পেলেনই না তিনি; ফোন, অফিস, বাসা- সব জায়গাতেই সে সুইচড অফ। কতেক সময় ফোন ঢুকে না। আবার ফোন ভাগ্যক্রমে ঢুকে গেলেও ওপ্রান্ত থেকে সাড়া আসে না। আবার কখনো সাড়া এলেও ‘ভালো আছেন তো, দেখা হচ্ছে শিগগিরই।’ ইত্যাদি সেরেই একতরফা ভাবেই কলটার মৃত্যু ঘটানো হয়। কামরুজ্জামানের স্ত্রী তো একবার কি যেন বলে উঠেছিল; ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছেন কামরুজ্জামান; যে মানুষটা দিন নেই, রাত নেই, এতটা খাটাখাটুনি করল তার জন্য, তাকে নিয়ে সন্দেহ!
একদিন অবশ্য নিজে থেকেই দেখা দেয় রাব্বি। আর যে খবরটা প্রকাশ করে, তার সারসংক্ষেপ হলো, এতদিন সে মুখ ফুটে বলতে পারেনি, তার আর একজনকে গ্যারান্টি দেওয়া আছে; এই অবস্থায় দ্বিতীয় কাউকে গ্যারান্টি দেওয়া যাবে না। কামরুজ্জামান বুঝলেন, আর নিজের ভাগ্যের চাকা পাংচার হয়ে যাওয়ার ঘটনাটা তাকে যতটা কষ্ট দিল, তার থেকেও বেশি লজ্জিত করল তাকে কেন্দ্র করে রাব্বির মতো এক মহৎপ্রাণ মানুষের পেরেশানিতে পড়াটা।

এজন্য রাব্বির কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে তিনি ছুটে গেলেন ব্যাংক অফিসারটইর কাছে- জামিনদার যোগাড়ে তার ব্যর্থতার কথা জানাতে। সবটা শুনে অবশ্য হেসে উঠলেন লোন অফিসার, ‘আরে কোনো সমস্যা নেই। একজন লোক একের অধিক জনকে গ্যারান্টি দিতে পারে। আপনি নিয়ে আসুন তো তাকে। আমি বুঝিয়ে বলব নে।’
আবার ছুট লাগালেন কামরুজ্জমান ঘেমে নেয়ে, এবার রাব্বির দিকে। অসুখটা হওয়ার পরই কি না, অল্পতেই ঘেমে উঠেন, আর হাঁপাতে থাকেন সমানে। অবশ্য একটানা বসে থাকারও কোনো সুযোগ নেই তার, ডাক্তার বারণ করে দিয়েছেন। রাব্বি কামরুজ্জামানের কাঁপতে থাকা মূর্তিটার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল অনেকক্ষণ। তারপর খুব ধীরে ধীরে একটা শীতল স্বর বেরিয়ে এলো তার মধ্য থেকে, ‘ভাই, মনে হয়, আমার কথাটা বুঝতে ভুল করেছেন। 
আমি যার গ্যারান্টিপত্রে সই করেছিলাম, সেখানে লেখা ছিল আর কারও গ্যারান্টর হওয়া যাবে না। আপনি চাইলে ওই গ্যারান্টিপত্রটা দেখাতে’ ‘না, না, স্যরি, স্যরি’ বলে থামিয়ে দেন কামরুজ্জমান। লোকটা অনেক কষ্ট করেছে তার জন্য। এতটা বিব্রত হওয়া তার প্রাপ্য নয়। তারই দোষ, আসলে জামিনদার বিষয়টা যতটা ভেবেছিলেন তত সহজ নয়, অনেক জটিল আর আঁকাবাঁকা গলি-ঘুপচি লুকিয়ে রয়েছে এর মধ্যে! এজন্যই কি না, এই ঘটনাটার পর থেকে জামিনদার খোঁজার কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকেন কামরুজ্জামান। অনেক দেরিতে হলেও তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, মৃত মানুষের কোনো জামিনদার হয় না! 

×